ধুলোমাটির মহাকাব্য: নজরুলের গদ্যবিশ্ব ও সাম্যবাদী নন্দনতত্ত্বের অন্তর্বয়নধুলোমাটির মহাকাব্য: নজরুলের গদ্যবিশ্ব ও সাম্যবাদী নন্দনতত্ত্বের অন্তর্বয়ন
বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬ ৭:০০ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
কাজী নজরুল ইসলামের গদ্য কেবল বিদ্রোহের ভাষ্য নয়; এর গভীরে রয়েছে মানুষের মুক্তি, সাম্য, প্রেম, ক্ষুধা, বঞ্চনা ও অস্তিত্বসংকটের এক শক্তিশালী নন্দনতত্ত্ব। ‘বাঁধন হারা’, ‘মৃত্যুক্ষুধা’, ‘কুহেলিকা’, ‘যুগবাণী’ ও ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’র আলোকে তাঁর গদ্যবিশ্বে সাম্যবাদী চেতনা ও মানবমুক্তির অন্তর্লীন সুর বিশ্লেষণ করেছেন গাউসুর রহমান।
বাংলা সাহিত্যের দিগন্তে কাজী নজরুল ইসলাম যখন ধূমকেতুর মতো উদিত হলেন, তখন চারদিকে এক থমথমে নিস্তব্ধতা। সেই নিস্তব্ধতাকে চুরমার করে দিয়ে তিনি যে কেবল কবিতার ছন্দে ঝংকার তুলেছিলেন তা নয়, তাঁর গদ্যের শরীর থেকেও ঠিকরে বেরিয়েছিল এক অপ্রতিরোধ্য আলোর ঝিলিক। নজরুলকে আমরা বড় বেশি ‘বিদ্রোহী কবি’র ছাঁচে বেঁধে ফেলেছি। অথচ তাঁর গদ্যের গভীরে যে কত বড় এক দার্শনিক প্রান্তর ধুধু করছে, কত নিবিড় মমতায় তিনি মানুষের জীবনের অলিগলি ছুঁয়ে গেছেন, তা কি আমরা যথেষ্ট মনোযোগ দিয়ে দেখেছি? তাঁর গদ্য কেবল শব্দের পিঠে শব্দ সাজানো নয়; তা যেন এক লহমায় অগ্নিগিরির উত্তপ্ত লাভা, আবার পরক্ষণেই শ্রাবণের মেঘমুক্ত আকাশের স্নিগ্ধতা।
নজরুলের গদ্যসত্তাকে বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই সময়ে, যখন পরাধীনতার গ্লানি আর সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে বাংলার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। নজরুল তাঁর গদ্যে কেবল বিপ্লবের মন্ত্র আওড়াননি, তিনি নির্মাণ করেছিলেন এক নতুন নন্দনতত্ত্ব যা মাটির খুব কাছ থেকে উঠে আসা মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর স্বপ্নের কথা বলে। এটি কোনো কৃত্রিম তাত্ত্বিক কাঠামো নয়, বরং রক্ত-মাংসের মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম থেকে উঠে আসা এক সত্যের দলিল।
নজরুলের প্রথমদিকের গদ্যের দিকে তাকালে দেখা যায় এক অদ্ভুত অস্থিরতা। ‘বাঁধন হারা’ উপন্যাসের সেই পত্রাবলি কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, তা যেন এক শিকল ছেঁড়ার আর্তি। নূরু যখন অজানার টানে ঘর ছাড়ে, তখন তার সেই যাযাবর বৃত্তির মাঝে আমরা খুঁজে পাই এক আধুনিক মানুষের অস্তিত্ব সংকটের ছায়া। অনেকে হয়তো এখানে জঁ-পল সার্ত্র বা আলবেয়ার কামুর অস্তিত্ববাদের ছোঁয়া পাবেন, কিন্তু নজরুলের এই মুক্তিপিপাসা ছিল অনেক বেশি আদিম এবং বাংলার মাটির সাথে সম্পৃক্ত।
এখানে প্রশ্ন জাগতে পারে, কেন একজন মানুষ সব কিছু ছেড়ে নিরুদ্দেশের পথে পা বাড়ায়? নজরুল তাঁর গদ্যে দেখিয়েছেন, এই পালানোটা কাপুরুষতা নয়, বরং নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক নিরন্তর সাধনা। সমাজের জরাজীর্ণ প্রথা যখন মানুষের শ্বাসরোধ করে ধরে, তখন মুক্ত বাতাস পেতে গেলে ঘরের দেয়াল ভাঙতেই হয়। ‘বাঁধন হারা’র ভাষার দিকে তাকালে বোঝা যায়, নজরুল তখন গদ্যের প্রচলিত ব্যাকরণকে থোড়াই কেয়ার করছেন। তাঁর বাক্যগুলো ছোট, তীক্ষ্ণ এবং প্রাণের আবেগে ভরপুর। সেখানে কোনো মেদ নেই, আছে কেবল এক দুর্নিবার গতি।
নজরুলের গদ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী দিকটি সম্ভবত তাঁর সামাজিক বাস্তববাদ। ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসের কথা ভাবলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে কৃষ্ণনগরের সেই মেথরপট্টি, অভাবী মানুষের হাহাকার আর ক্ষুধার এক আদিম রূপ। ক্ষুধা মানুষকে কেবল শারীরিক কষ্ট দেয় না, তা মানুষের মনুষ্যত্বকেও এক কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করায়। এই উপন্যাসে নজরুল যে দারিদ্র্যের ছবি এঁকেছেন, তা কোনো দূর থেকে দেখা করুণা নয়; বরং তিনি নিজে সেই আগুনের পাশে বসে তার উত্তাপ নিয়েছেন।
অনেকে একে মার্ক্সীয় বাস্তববাদ বলতে পারেন, কিন্তু নজরুলের এই সাম্যবাদ কোনো পুঁথিগত বিদ্যা থেকে আসেনি। তিনি দেখেছিলেন, একদিকে ধর্মের নামে ভণ্ডামি আর অন্যদিকে ক্ষুধার জ্বালায় কুঁকড়ে যাওয়া মানুষ। তাঁর গদ্যে যখন ক্ষুধার সেই রূঢ় বর্ণনা উঠে আসে, তখন পাঠক শিউরে ওঠেন। অথচ এর মাঝেই তিনি বুনে দেন প্রেমের এক সূক্ষ্ম সুতো। ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় হলেও, সেই গদ্যের ভেতরেই নজরুল খুঁজে পান সুন্দরের বীজ। ‘মৃত্যুক্ষুধা’র মেজবউ চরিত্রটি যেন বাংলার সেই চিরন্তন নারী, যে অভাবের তাড়নায় নিজেকে বিকিয়ে দিলেও অন্তরের মমতাটুকু হারায় না। নজরুলের গদ্যে এই যে পরস্পরবিরোধী অনুভূতির সহাবস্থান ক্ষুধা আর প্রেম, বিদ্রোহ আর করুণা এটাই তাঁর নন্দনতত্ত্বের মূল কথা।
বিপ্লব কি কেবল বন্দুকের নল থেকে আসে? নজরুল তাঁর ‘কুহেলিকা’ উপন্যাসে এই প্রশ্নটিকেই যেন এক নিবিড় তাত্ত্বিক জিজ্ঞাসায় রূপান্তরিত করেছেন। সশস্ত্র বিপ্লবের আড়ালে যে একাকিত্ব, যে মানসিক দ্বন্দ্ব কাজ করে, নজরুল তা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। জাহাঙ্গীর চরিত্রের মধ্য দিয়ে তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে, একজন বিপ্লবীও দিনশেষে একজন রক্ত-মাংসের মানুষ। তাঁরও হৃদয়ে প্রেম জাগে, বিরহ আসে।
নজরুলের গদ্য এখানে অনেক বেশি গম্ভীর ও মরমী। তিনি বিপ্লবকে কেবল রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হিসেবে দেখেননি, একে দেখেছেন মানুষের আত্মার মুক্তি হিসেবে। শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো মানে কেবল ক্ষমতার বদল নয়, বরং নিজের ভেতরের কাপুরুষতাকে জয় করা। ‘কুহেলিকা’র গদ্যে যে গাম্ভীর্য আর মিস্টিক আবহের ছোঁয়া পাওয়া যায়, তা নজরুলের চিন্তাশক্তির এক অনন্য উত্তরণকে নির্দেশ করে। তিনি যেন বলতে চান, প্রেমের উত্তাপ ছাড়া কোনো প্রকৃত বিপ্লব সম্ভব নয়। যে মানুষ ভালোবাসতে জানে না, সে মানুষের জন্য প্রাণ দিতেও পারে না।
অন্যদিকে নজরুলের প্রবন্ধগুলো হলো একেকটি শাণিত তলোয়ার। ‘যুগবাণী’, ‘রুদ্র-মঙ্গল’ কিংবা ‘দুর্দিনের যাত্রী’র পাতা ওল্টালে মনে হয় যেন এক প্রলয়ংকরী ঝড় বয়ে যাচ্ছে। তিনি যখন ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’তে নিজেকে ‘সত্যের সারথী’ হিসেবে ঘোষণা করেন, তখন তা কেবল ব্রিটিশ আদালতের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ থাকে না, তা হয়ে ওঠে শাশ্বত অন্যায়ের বিরুদ্ধে চিরন্তন মানুষের প্রতিবাদ।
তাঁর প্রবন্ধের ভাষা ছিল অদ্ভুতভাবে মিশ্রিত। সেখানে সংস্কৃতের ওজস্বিতা যেমন ছিল, তেমনি ছিল আরবি-ফারসি শব্দের সজীবতা। এই ভাষাতাত্ত্বিক সংকরায়ণ নজরুলের গদ্যকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, ভাষা কেবল পণ্ডিতদের ড্রয়িংরুমের আসবাব নয়, তা হওয়া উচিত খেটে খাওয়া মানুষের মুখের বোল। তাঁর প্রবন্ধে যখন তিনি বলেন “আমার হাতের ধূমকেতু এবার ভগবান সারথীর রথচক্রের তলায় পিষ্ট হইয়া মরুক, তবু যেন তাহার সেই মরণ-ঝলক সত্যের পথরেখাটি উজ্জ্বল করিয়া দিয়া যায়” তখন আমাদের বুঝতে বাকি থাকে না যে, নজরুল সত্যের জন্য আত্মাহুতি দিতেও দ্বিধাবোধ করেন না। এই আপসহীন মানসিকতাই তাঁর গদ্যকে এক নৈতিক দৃঢ়তা দান করেছে।
বিদ্রোহের পাশে পাশেই নজরুলের গদ্যে প্রবাহিত হয়েছে এক বিরহের ফল্গুধারা। তাঁর ছোটগল্পের সংকলন ‘ব্যথার দান’ বা ‘রিক্তের বেদন’ পড়লে এক গভীর বিষাদ আমাদের ঘিরে ধরে। নজরুলের এই বিরহ কেবল ব্যক্তি-মানুষের বিচ্ছেদ নয়, এটি যেন এক অপূর্ণতার হাহাকার। সুফিবাদী দর্শনে যেমন ‘ইশক’ বা প্রেমের মাধ্যমে পরম সত্তাকে পাওয়ার আর্তি থাকে, নজরুলের গদ্যেও ঠিক সেই সুরটি খুঁজে পাওয়া যায়।
তাঁর গল্পের ভাষা অনেক বেশি কাব্যিক। প্রকৃতি সেখানে মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হয়ে ওঠে। কোনো কোনো মুহূর্তে মনে হয়, নজরুল যেন গদ্য লিখছেন না, বরং শব্দের তুলিতে এক বিষাদময় ছবি আঁকছেন। তাঁর গল্পের চরিত্রগুলো প্রায়শই সমাজ দ্বারা প্রত্যাখ্যাত বা অবহেলিত। কিন্তু তাদের অন্তরে যে প্রেমের প্রদীপ জ্বলে, তা পার্থিব অভাবের চেয়ে অনেক বেশি উজ্জ্বল। নজরুলের গদ্য আমাদের শেখায় যে, দুঃখ কেবল কাঁদায় না, দুঃখ মানুষকে ভেতর থেকে শুদ্ধ করে তোলে।
নজরুলকে কেন ‘সাবঅল্টার্ন’ বা নিম্নবর্গের কথাকার বলা হয়? কারণ তিনি বাংলা গদ্যের আভিজাত্যের খোলস ভেঙে তাকে ধুলোমাটির মানুষের পাশে এনে দাঁড় করিয়েছিলেন। বঙ্কিম বা রবীন্দ্রনাথের গদ্যে যে এক ধরণের ধ্রুপদী গাম্ভীর্য ছিল, নজরুল সেখানে নিয়ে এলেন এক ধরণের ‘রাফ অ্যান্ড টাফ’ বা মেঠো সুর। তাঁর গদ্যে মুটে, মজুর, জেলে আর কৃষকদের ঘামের গন্ধ পাওয়া যায়।
তিনি যখন ‘লাঙল’ বা ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় সম্পাদকীয় লিখতেন, তখন তাঁর কলম থেকে আগুনের ফুলকি ঝরতো। তাঁর বাক্যগঠন ছিল প্রথাবিরোধী। তিনি প্রচলিত ‘সাধু-চলিত’র দ্বন্দ্ব ছাপিয়ে এক ধরণের নিজস্ব ‘নজরুলীয় শৈলী’ তৈরি করেছিলেন। সেখানে শব্দের অভাব নেই, নেই কোনো সঙ্কীর্ণতা। তিনি জানতেন কখন বজ্রের মতো গর্জন করতে হয় আর কখন শিশিরের মতো স্নিগ্ধ হতে হয়। এই বৈচিত্র্যই তাঁকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অদ্বিতীয় গদ্যকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
নজরুলের চিঠিপত্রগুলো তাঁর গদ্য প্রতিভার এক অনন্য দিক উন্মোচন করে। এখানে আমরা এক একাকী ও সংবেদনশীল মানুষকে খুঁজে পাই। বাইরের সেই রণক্লান্ত বিদ্রোহী বীরের অন্তরালে যে এক মরমী সত্তা লুকিয়ে ছিল, তা তাঁর চিঠিপত্রগুলোতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বন্ধুদের কাছে লেখা তাঁর চিঠিতে যেমন দারিদ্র্যের করুণ আর্তি আছে, তেমনি আছে জীবনের প্রতি এক গভীর অনুরাগ।
তাঁর ভাষা এখানে অনেক বেশি ব্যক্তিগত ও কোমল। তিনি যখন তাঁর রোগশয্যার কথা লেখেন বা তাঁর সন্তান হারানোর শোক প্রকাশ করেন, তখন পাঠকের হৃদয়ে এক অব্যক্ত ব্যথার সৃষ্টি হয়। নজরুল তাঁর গদ্যে নিজেকে কখনও আড়াল করেননি। তিনি তাঁর সবটুকু আবেগ, সবটুকু দুর্বলতা নিয়ে পাঠকের সামনে দাঁড়িয়েছেন। এই যে অকৃত্রিম সত্যভাষণ, এটিই তাঁর গদ্যের আসল অলঙ্কার।
তাত্ত্বিকভাবে দেখলে নজরুলের গদ্যে আমরা এক ধরণের ‘ডিকলোনাইজড’ বা বিউপনিবেশিত মনস্তত্ত্ব খুঁজে পাই। তিনি ব্রিটিশদের দেওয়া শিক্ষাব্যবস্থা বা আইন ব্যবস্থাকে কেবল রাজনৈতিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও অস্বীকার করেছিলেন। তিনি বলতে চেয়েছিলেন যে, আমাদের নিজেদের এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আছে, আমাদের নিজস্ব এক সত্য আছে।
তাঁর গদ্যে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যে বিদ্রূপ আর শ্লেষ ফুটে ওঠে, তা অত্যন্ত উঁচু দরের। তিনি শোষকদের মুখোশ খুলে দিতে দ্বিধা করতেন না। তাঁর ‘যুগবাণী’ যখন বাজেয়াপ্ত হয়, তখন প্রমাণিত হয় যে নজরুলের কলম ব্রিটিশ কামানের চেয়েও বেশি শক্তিশালী ছিল। তিনি তাঁর গদ্যের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে এই শিক্ষাই দিয়েছিলেন যে, মুক্তির জন্য কারোর দয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না; মুক্তি আসে মানুষের ভেতরের সাহসের হাত ধরে।
নজরুলের গদ্যের নন্দনতত্ত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘মানুষ’। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিল্প কেবল নন্দনতাত্ত্বিক আনন্দের জন্য নয়, বরং তা হতে হবে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার। তাঁর কাছে সুন্দর মানে কেবল ফুলের হাসি বা জোছনার আলো নয়; সুন্দর হলো সেই পৃথিবী যেখানে কোনো শিশু না খেয়ে থাকবে না, যেখানে কোনো মানুষকে অবমাননা করা হবে না।
এই সাম্যবাদী চেতনা তাঁর গদ্যে কোনো শুষ্ক শ্লোগান হয়ে আসেনি, বরং তা এসেছে এক গভীর মানবিক বোধ থেকে। তিনি বুঝেছিলেন, মানুষের পেটে যদি ভাত না থাকে, তবে তার কাছে বড় বড় দার্শনিক কথা অর্থহীন। তাই তাঁর গদ্যে ক্ষুধার কথা যেমন এসেছে, তেমনি এসেছে সেই ক্ষুধাকে জয় করার স্বপ্নের কথা। নজরুলের গদ্য তাই একাধারে বাস্তববাদী এবং স্বপ্নদর্শী।
কাজী নজরুল ইসলামের গদ্য নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শেষ পর্যন্ত এক অপার্থিব অনুভূতির সামনে এসে দাঁড়াতে হয়। তাঁর গদ্য পড়তে পড়তে মনে হয়, আমরা কেবল একজন সাহিত্যিকের কথা শুনছি না, বরং শুনছি আমাদের নিজেদেরই অবদমিত আত্মার চিৎকার। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতে হয়।
নজরুলের গদ্য আজ বহু বছর পরেও ম্লান হয়নি। বরং বর্তমান বিশ্বের অসহিষ্ণুতা আর বৈষম্যের প্রেক্ষাপটে তাঁর কথাগুলো আরও বেশি উজ্জ্বল হয়ে ধরা দিচ্ছে। তাঁর গদ্যের সেই ‘লিবারেটিং পাওয়ার’ বা মুক্তির শক্তি আজও আমাদের প্রেরণা দেয়। তিনি ছিলেন এক চিরন্তন যাযাবর, এক অগ্নিবীণার সারথী যাঁর গদ্যের প্রতিটি শব্দ আজও আমাদের রক্তে শিহরণ জাগায়।
নজরুল হয়তো আজ নেই, কিন্তু তাঁর সেই ‘রুদ্র-মঙ্গল’ বা ‘দুর্দিনের যাত্রী’র পদধ্বনি আমরা শুনতে পাই। তাঁর গদ্য সাহিত্য কেবল পড়ার বিষয় নয়, তা হলো এক জীবনদর্শন। সেই দর্শনের মূল কথা হলো মানুষই শ্রেষ্ঠ। আর এই শ্রেষ্ঠত্বকে রক্ষা করার জন্যই প্রয়োজন বিদ্রোহ, প্রয়োজন প্রেম এবং প্রয়োজন এক অখণ্ড সাম্যবাদ। নজরুলের গদ্যের এই যে মহাজাগতিক ধারা, তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অক্ষয় প্রদীপ হয়ে জ্বলবে অনন্তকাল।
১৩৬ বার পড়া হয়েছে