শেখ হাসিনার প্রত্যার্পণ: দিল্লি হাইকোর্ট দেখাচ্ছে ভারত
রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬ ১২:১৭ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
শেখ হাসিনার প্রত্যার্পণ ইস্যুতে বাংলাদেশের অনড় অবস্থানের বিপরীতে কূটনৈতিকভাবে ভিন্ন কৌশল নিচ্ছে ভারত। দিল্লি সরাসরি প্রত্যার্পণে সম্মতি না দিয়ে বিষয়টিকে আদালতি প্রক্রিয়ার দিকে ঠেলে দেওয়ার বার্তা দিচ্ছে। ফলে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে শেখ হাসিনার প্রত্যার্পণ এখন নতুন এক কূটনৈতিক ও আইনি সমীকরণের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
ভারতে আশ্রয় নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবিতে ঢাকার অনড় অবস্থানের মধ্যেই নতুন কূটনৈতিক মোড় নিয়েছে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক। ভারতীয় গণমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও অন্যান্য সূত্রের খবরে প্রকাশ, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, প্রত্যার্পণের বিষয়টি ভারতের আদালতি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হবে।
বাংলাদেশ সরকার বারবার শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানালেও ভারতের জবাব ছিল পরিষ্কার: এই ধরনের অনুরোধ ভারতের বিচার বিভাগের সামনে উপস্থাপন করতে হবে এবং সিদ্ধান্ত নিতে হবে আদালতকেই। তবে প্রশ্ন উঠছে, বিষয়টি আদালতে নিয়ে যাবেন কে? ভারত সরকার নাকি বাংলাদেশ সরকার?
ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেছেন, "আমরা ঢাকার সাথে নিবিড়ভাবে আলোচনা করছি, যাতে তারা এই ম্যাক্সিমালিস্ট পজিশন থেকে সরে আসে।" অর্থাৎ, ভারত চায় বাংলাদেশ যেন শেখ হাসিনাকে ফেরত দিতেই হবে—এই ধরনের অনড় অবস্থান থেকে সরে আসে।
২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত ও ২০১৬ সালে কার্যকর হওয়া ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যার্পণ চুক্তি অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে অপরাধী প্রত্যার্পণের আইনি কাঠামো রয়েছে। চুক্তির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রকৃতির অপরাধের ক্ষেত্রে প্রত্যার্পণ করা যাবে না। তবে একই অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, হত্যা, অপহরণ, ম্যানস্লটার, অ্যাসল্ট বা অস্ত্র ব্যবহারের মতো অপরাধকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে না।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) ২০২৫ সালের নভেম্বরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন। এই অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে হত্যা ও সহিংসতার মতো গুরুতর অপরাধ, যা প্রত্যার্পণ চুক্তির আওতায় পড়ে।
তবে ভারতের অবস্থান হলো, বিষয়টি পুরোপুরি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হবে। ভারতের সংবিধানে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া বা না দেওয়া মূলত নির্বাহী সিদ্ধান্তের বিষয়। ১৯৫৯ সালে তিব্বতের ধর্মগুরু দালাই লামাকে ভারত যেভাবে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছিল, শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও সেটি একই ধরনের নির্বাহী সিদ্ধান্ত।
ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, ভারত সরকার বাংলাদেশের অনুরোধ "পরীক্ষাধীন" (being examined) বলে জানিয়েছে সংসদীয় কমিটিকে। জুলাই ও আগস্ট ২০২৬-এ ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে, প্রত্যার্পণ অনুরোধ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা করছে।
এদিকে শেখ হাসিনা নিজে গত ৫ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেন, তিনি ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরে আসবেন। তবে এই ঘোষণার পর বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের শর্ত হিসেবে ঢাকা শেখ হাসিনার প্রত্যার্পণকে "রেড লাইন" ঘোষণা করেছে।
ভারতের কূটনৈতিক মহল মনে করছে, হুট করে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় না ঢাকা। আবার বাংলাদেশের বর্তমান বিএনপি সরকারের সাথেও সম্পর্ক ভালো রাখতে চায় ভারত। সেজন্য সরাসরি "না" না বলে আদালতি প্রক্রিয়ার কথা বলা হচ্ছে।
প্রত্যার্পণ চুক্তির ৮ নম্বর অনুচ্ছেদে আরও বলা হয়েছে, যদি কোনো অনুরোধ "good faith" বা "justice"-এর স্বার্থে না হয়, তবে প্রত্যার্পণ প্রত্যাখ্যান করা যাবে। এই বিধানটি ভারতের জন্য কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বাংলাদেশের কোনো গণমাধ্যমে এখন পর্যন্ত ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই "intense discussions" বা "নিবিড় আলোচনার" কথাটি সামনে আসেনি। অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। কারণ রাজনীতিতে এমন অনেক কথাই হয়, যার সাথে বাস্তবতার পুরোপুরি মিল নাও থাকতে পারে।
তবে একটা বিষয় পরিষ্কার: ভারত সরাসরি শেখ হাসিনাকে ফেরত দিতে রাজি নয়। তারা চায় বাংলাদেশ এই অনুরোধ থেকে সরে আসুক অথবা আদালতি প্রক্রিয়ার ফলাফলের অপেক্ষা করুক। আর সেই প্রক্রিয়াটি কতদিন চলবে, তা অনিশ্চিত।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
১৩৯ বার পড়া হয়েছে