মহাকালের রাজপথে গণতন্ত্রের প্রদীপ্ত মশাল: বেগম খালেদা জিয়া
সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬ ৭:৩৩ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
ইতিহাসের মানচিত্রে কিছু নাম কেবল অক্ষরের সমষ্টি হয়ে থাকে না, তারা হয়ে ওঠে একটি পুরো যুগের অনুরণন, কোনো এক ঝোড়ো দিগন্তের অবিনাশী মহাকাব্য। বাংলাদেশের রাজনীতির উত্তাল রক্তিম ক্যানভাসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এমনই এক সুদীর্ঘ ইতিহাস, যা একদিকে যেমন মাতৃত্বের মমতা আর নিভৃত গৃহকোণের স্নিগ্ধতা বহন করে, অন্যদিকে তেমনি বহন করে রাজপথের অনমনীয় আর আপসহীন দৃঢ়তা। ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্টের এক সোনালী প্রভাতে, তৎকালীন দিনাজপুর জেলার এক স্নিগ্ধ প্রহরে যাঁর ধরণীতে আগমন, তিনি হয়তো সেদিন ভাবেননি যে, ইতিহাস তাঁকে একদিন নিয়ে দাঁড় করাবে এক বিশাল জাতির গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে।
আর্দ্র মাটির ঘ্রাণ আর মধ্যবিত্ত জীবনের শান্ত পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা এক সাধারণ তরুণী হিসেবেই শুরু হয়েছিল তাঁর জীবনগল্প। ১৯৬০ সালে প্রদীপ্ত তরুণ সেনা কর্মকর্তা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সাথে যখন তাঁর পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হওয়া, তখন তাঁর স্বপ্ন বলতে ছিল কেবল একটি সুবিন্যস্ত সংসার, সন্তানকে ঘিরে শান্ত এক ভবিষ্যতের বয়ন। ঘরণী হয়ে এক সেনানিবাস থেকে অন্য সেনানিবাসে হেঁটে চলা তাঁর জীবন ছিল নিভৃত, আড়ম্বরহীন ও সংসারের সুতোর বন্ধনে বাঁধা। কিন্তু সময়ের নির্মম হাত মানুষকে প্রায়শই তাঁর নির্ধারিত গণ্ডি থেকে উপড়ে এনে দাঁড় করিয়ে দেয় মহাকালের কঠিনতম পরীক্ষার মুখোমুখি।
১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চে যখন পুরো বাংলাদেশ স্বাধীনতা সংগ্রামে গর্জে উঠেছিল, তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান যখন চট্টগ্রাম থেকে স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা করে সম্মুখসমরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তখন সেই চরম সংকটাপন্ন দিনে বেগম খালেদা জিয়ার সামনে হাজির হয় জীবনের প্রথম রক্তিম পরীক্ষা। দুই অবুঝ শিশু সন্তান তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোকে কোলে নিয়ে, এক অজানা অনিশ্চয়তা ও শঙ্কার সাগরে ভাসতে ভাসতে তিনি বন্দি হন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর নির্মম প্রকোষ্ঠে। গুলির শব্দ, মৃত্যুর গর্জন আর স্বামীর জীবন-মৃত্যুর অজানা সংবাদের মাঝে বন্দিদশার সেই সুদীর্ঘ দিনগুলো তাঁর ভেতরে এক অনমনীয় মনস্তাত্ত্বিক শক্তিবলয় তৈরি করে দিয়েছিল। কষ্টের সেই উত্তপ্ত আগুনে পুড়েই রচিত হচ্ছিল তাঁর ভেতরের এক ইস্পাতকঠিন রূপান্তর, যা পরবর্তী জীবনে তাঁকে পরিণত করেছিল এক পরাক্রান্ত কাণ্ডারীতে।
স্বাধীনতার পর শান্ত সংসারের নিভৃত নীড়ে তিনি পুনরায় ফিরে গিয়েছিলেন বটে, কিন্তু নিয়তির ইচ্ছা ছিল অন্যরকম। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শহীদ হবার পর এক মুহূর্তে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় তাঁর সুখের সংসার; অন্ধকার নেমে আসে পুরো জাতির কপালেও। এছাড়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) পতিত হয় এক গভীর সাংগঠনিক সংকট ও দিশাহীন বিভ্রান্তির অতল গহ্বরে। ভাঙনের সুর, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আর ক্ষমতাশালীদের শকুনি দৃষ্টিতে যখন দলটি চূর্ণবিচূর্ণ হতে বসেছিল, ঠিক তখনই রাজনীতির নতুন ইতিহাস লিখতে গৃহকোণের পর্দা সরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন এক শোকাতুর কিন্তু আত্মপ্রত্যয়ী নারী।
শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে ১৯৮২ সালে রাজপথে পা রাখা সেই সাধারণ গৃহবধূ রাজনীতির অনভিজ্ঞতা দূরে ঠেলে এক অভাবনীয় নেতৃত্বের দ্যুতি ছড়িয়ে দিলেন। কর্মী-সমর্থকদের আকুল আহ্বান আর দেশের গণতান্ত্রিক শূন্যতার মুখে ১৯৮৪ সালে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। সংসারধর্মের শান্ত প্রাঙ্গণ থেকে একলাফে রাজপথের ধূলোবালিতে নেমে আসা এই নারীর চোখে তখন কেবল একটিই স্বপ্ন স্বৈরাচারী সামরিক শাসনের শৃঙ্খল থেকে প্রিয় মাতৃভূমিকে মুক্ত করা।
১৯৮০-এর দশকে যখন সামরিক শাসক হোসেন মোহাম্মদ এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনের নাগপাশে দেশ বন্দি, একের পর এক রাজনীতিবিদ যখন সুবিধা আর ক্ষমতার লোভে আপসের টেবিলে বসছিলেন, তখন এই একক নারী হয়ে উঠেছিলেন এক অনমনীয় প্রাচীর। রাজপথের রক্তচক্ষু, সামরিক জান্তার ভয়ভীতি, বারবার গৃহবন্দিত্ব কিংবা রাজপথের টিয়ারগ্যাস কোনো কিছুই তাঁর পায়ের গতি স্তব্ধ করতে পারেনি। প্রলোভন কিংবা চাপের মুখে তিনি এক চুল পরিমাণও অন্যায়ের সাথে আপস করেননি। তাঁর এই একনিষ্ঠ ও অনমনীয় অবস্থানের কারণেই বাঙালি জাতি তাঁকে ভালোবেসে উপাধি দেয় 'আপসহীন নেত্রী'। নয় বছরের দীর্ঘ ও রক্তাক্ত গণআন্দোলনের পথ বেয়ে, ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে যখন ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের জোয়ারে স্বৈরাচারের পতন ঘটে, তখন প্রমাণিত হয় যে রাজপথের এই নিঃসঙ্গ পদাতিকের সিদ্ধান্তই ছিল ইতিহাসের সঠিক মোড়।
স্বৈরাচারের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ঐতিহাসিক পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। জনমানুষের বিপুল ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে এবং বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম ও মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাস রচনা করেন। নিভৃত গৃহকোণ থেকে বঙ্গভবনের সর্বোচ্চ শাসনদণ্ডে তাঁর এই উত্তরণ কেবল এক রাজনৈতিক ইতিহাস ছিল না, বরং তা ছিল নারী ক্ষমতায়নের এক নতুন প্রভাত।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম মেয়াদটি ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের এক সোনালী অধ্যায়। তাঁর হাত ধরেই ১২তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম ঘটে। রাষ্ট্রযন্ত্রকে জনমুখী করা এবং সামাজিক রূপান্তরের লক্ষ্যে তাঁর গৃহীত পদক্ষেপগুলো ছিল যুগান্তকারী। বিশেষ করে, গ্রামীণ সমাজের অন্ধকার ভেদ করে বালিকাদের শিক্ষামুখী করতে তিনি যে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষা ও 'ছাত্রী উপবৃত্তি' কার্যক্রম চালু করেছিলেন, তা বাংলা ও বিশ্বজুড়ে এক নীরব বিপ্লব সাধন করেছিল। একসময় যে নারী কেবল গৃহকোণে বন্দি থাকত, তাঁরই পলিসিগত সিদ্ধান্তের সুবাদে লাখ লাখ বালিকা সাইকেল চালিয়ে কিংবা বইয়ের ব্যাগ কাঁধে তুলে বিদ্যালয়ের পথে পা বাড়াল।
২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মেয়াদে চারদলীয় জোট সরকারের নেতৃত্বে থাকাকালে মুক্তবাজার অর্থনীতির বিকাশ, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং গ্রামীণ অবকাঠামোর অভূতপূর্ব উন্নয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু ক্ষমতার এই দীর্ঘ পথপরিক্রমা কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না; রাজনৈতিক ক্ষমতার মসনদ তাঁর জন্য রেখেছিল একের পর এক কাঁটা বিছানো পথ।
২০০৭ সালের জরুরি অবস্থার কালো মেঘ যখন দেশের রাজনৈতিক আকাশকে আচ্ছন্ন করেছিল, তখনও তাঁকে আবারও কারাবরণ করতে হয়। কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে করুণ ও নির্মম ট্র্যাজেডির অধ্যায় রচিত হয় পরবর্তী সময়ে। একের পর এক মিথ্যা রাজনৈতিক মামলা, ২০১৮ সালে প্রদত্ত কারাদণ্ড এবং প্রিয় বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ সব মিলিয়ে তাঁর জীবন পরিণত হয়েছিল এক নিরবচ্ছিন্ন বন্দিদশায়। কেবল শারীরিক নির্যাতন বা বন্দিত্বই নয়, মানসিক কষ্টের চূড়ান্ত পরীক্ষা তাঁকে দিতে হয়েছে পুত্রে বিচ্ছেদ ও ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর অকাল প্রয়াণের মধ্য দিয়ে। সুদূর প্রবাসে পুত্রের চিরবিদায়ের খবর যখন এক বন্দিনী মায়ের কাছে পৌঁছাল, সেদিন সমগ্র দেশ দেখেছিল এক মাতৃত্বের নিঃশব্দ রোদন।
দীর্ঘ শারীরিক অসুস্থতা, লিভার সিরোসিস, হৃদরোগ আর বার্ধক্যের নানা জটিলতায় ভুগলেও দেশের মানুষের ভোটাধিকার আর বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রশ্নে তিনি কখনো নিজের নীতি থেকে বিচ্যুত হননি। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর যখন তিনি সমস্ত মিথ্যা মামলা থেকে নিঃশর্ত মুক্তি পান, তখন তিনি শারীরিকভাব অনেকটাই ভঙ্গুর, কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক মর্যাদা ছিল আকাশের মতো উচ্চতায়।
অবশেষে ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বরের এক শীতের সকালে, দীর্ঘ অসুস্থতার অবসান ঘটিয়ে এই মহান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে কেঁদেছিল পুরো বাংলাদেশ; লাখ লাখ মানুষের ঢল নেমেছিল তাঁর শেষ বিদায়ের জানাজায়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই তিনি লাভ করেন চিরন্তন বিশ্রাম।
বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংগ্রামের এক ধ্রুবতারা। সাধারণ গৃহবধূ থেকে উঠে এসে রাজপথের উত্তাল জনসমুদ্রকে নেতৃত্ব দেওয়া, স্বৈরাচারের সামনে মাথানত না করা এবং সারা জীবন গণতন্ত্রের পাহারাদার হিসেবে নিজেকে উৎসর্গ করা এসবের মধ্য দিয়েই তিনি বেঁচে থাকবেন চিরকাল। ক্ষণস্থায়ী এই ধূলির ধরণী ছেড়ে তিনি বিদায় নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাস, বহুদলীয় গণতন্ত্রের চেতনা এবং নারী জাগরণের প্রতিটি নতুন ভোরে বেগম খালেদা জিয়া থাকবেন এক অমর ও অবিনাশী সুর হিসেবে।
লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট এবং
সহযোগী অধ্যাপক (বাংলা): এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, আশুলিয়া, ঢাকা।
১২০ বার পড়া হয়েছে