গরম, লোডশেডিং ও অসুস্থতার চাপ: বৈশ্বিক জলবায়ু অস্থিরতায় বাংলাদেশে নতুন স্বাস্থ্যসতর্কতা
রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৭:৪৬ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার অস্বাভাবিকতা এখন আর শুধু তাপমাত্রার ওঠানামার খবর নয়; এটি ক্রমেই জনস্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, পানি, খাদ্য এবং দৈনন্দিন জীবনের সংকটে রূপ নিচ্ছে। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে কখনও অতিবৃষ্টি, কখনও খরা, অস্বাভাবিক ঠান্ডা বা তীব্র গরম দেখা যাচ্ছে। একই সময়ে বাংলাদেশে অস্বস্তিকর তাপ, উচ্চ আর্দ্রতা, অঞ্চলভেদে ভারী বৃষ্টি, জ্বর-কাশি-শরীর ব্যথার মতো অসুস্থতার বিস্তার এবং ভয়াবহ লোডশেডিং—সব মিলিয়ে একটি বহুমাত্রিক স্বাস্থ্যঝুঁকির চিত্র তৈরি হয়েছে।
এই পরিবর্তনের বড় প্রেক্ষাপট হলো প্রশান্ত মহাসাগরে দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো এবং মানুষের তৈরি দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণতা। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাসে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর সময়ে এল নিনোর আরও শক্তিশালী হওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে; মডেলগুলোর গড় হিসাবে নিনো ৩.৪ অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার অস্বাভাবিকতা প্রায় ৩ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠতে পারে। এল নিনো ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থায়ী থাকার সম্ভাবনাও প্রায় ১০০ শতাংশ বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
এর অর্থ বিশ্বের সব দেশে একই ধরনের আবহাওয়া নয়। উত্তর আমেরিকার একাংশে জেট স্ট্রিমের গতিপথ বদলে ঠান্ডা বায়ু, ঝড় বা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টির দফা দেখা দিতে পারে। দক্ষিণ আমেরিকার কিছু এলাকায় ভারী বৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে, আবার মহাদেশটির উত্তরাংশ, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে তুলনামূলক শুষ্কতার আশঙ্কা রয়েছে। ডব্লিউএমও বলছে, সেপ্টেম্বর-নভেম্বর সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল ও দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাংশে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে; বিপরীতে দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হতে পারে। বিশ্বের বড় অংশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রার আশঙ্কাও রয়েছে।
বাংলাদেশে এই বৈশ্বিক অস্থিরতা প্রকাশ পাচ্ছে বৈপরীত্যের মাধ্যমে। দেশের এক অংশে গরম ও ভ্যাপসা আর্দ্রতা, অন্য অংশে ভারী বৃষ্টি কিংবা জলাবদ্ধতা—এমন পরিস্থিতি শরীরের ওপর তীব্র চাপ তৈরি করে। অতিরিক্ত গরমে পানিশূন্যতা, মাথাব্যথা, ঘুমের ব্যাঘাত, শরীর ভেঙে যাওয়া ও কর্মক্ষমতা কমে যেতে পারে। আবার বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও আর্দ্রতা বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন এবং রোগ নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তোলে। জ্বর, কাশি, সর্দি, গলাব্যথা ও শরীর ব্যথায় অনেক মানুষ একই সময়ে আক্রান্ত হওয়ার খবর তাই শুধু মৌসুমি অসুস্থতা বলে অবহেলা করা যায় না।
তবে সতর্কতার সঙ্গে মনে রাখতে হবে, এল নিনো বা গরম নিজে কোনো ভাইরাস সৃষ্টি করে না। সংক্রামক রোগ জীবাণুর মাধ্যমে ছড়ায়। কিন্তু অতিরিক্ত তাপ, ঘুমের অভাব, পানির সংকট, বায়ুদূষণ, ভিড়, বন্ধ ঘর এবং দুর্বল স্বাস্থ্যসেবা সংক্রমণ ছড়ানোর পরিবেশকে অনুকূল করে। বাংলাদেশে হামের চলমান প্রাদুর্ভাবের মতো পরিস্থিতিতে জ্বর-কাশি, চোখ লাল হওয়া বা শরীরে র্যাশ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা ও পরীক্ষা জরুরি। একইভাবে তীব্র জ্বর, বমি, পেটব্যথা, রক্তপাত বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা থাকলে ডেঙ্গুসহ অন্যান্য রোগের পরীক্ষা প্রয়োজন। রোগ নির্ণয় ছাড়া সব অসুস্থতাকে একটি “নতুন ভাইরাস” হিসেবে প্রচার করা দায়িত্বশীল হবে না।
এই সংকটকে আরও কঠিন করে তুলছে বিদ্যুৎ ঘাটতি ও দীর্ঘ লোডশেডিং। তাপ ও আর্দ্রতার মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকলে ফ্যান, শীতলীকরণ, পানির পাম্প, খাবার সংরক্ষণ এবং রাতের ঘুম—সবই ব্যাহত হয়। ফলে শিশু, বয়স্ক, অন্তঃসত্ত্বা নারী, দীর্ঘমেয়াদি রোগী, খোলা জায়গায় কর্মরত শ্রমজীবী এবং নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েন। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ ঘাটতি ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে; একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি ত্রুটির পর সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশজুড়ে লোডশেডিং আরও বেড়েছে।
লোডশেডিং সরাসরি জ্বর-কাশি ছড়ায় না, কিন্তু গরমে মানুষের শারীরিক প্রতিরোধ ও আরামদায়ক পরিবেশ ভেঙে দেয়। বিদ্যুৎহীন রাতের ঘুমের ঘাটতি, অতিরিক্ত ঘাম, পানিশূন্যতা ও খাদ্য সংরক্ষণের সমস্যা অসুস্থতাকে দীর্ঘায়িত করতে পারে। হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, টিকা সংরক্ষণ ও জরুরি সেবাও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল—তাই শক্তি সংকট জনস্বাস্থ্য সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
সামনের মাসগুলোতে বাংলাদেশের প্রস্তুতি হওয়া উচিত সমন্বিত। আবহাওয়া পূর্বাভাস, তাপপ্রবাহ সতর্কতা, স্থানীয়ভাবে জ্বর-কাশির ক্লাস্টার নজরদারি, হাসপাতালের বিদ্যুৎ ব্যাকআপ, বিশুদ্ধ পানি, বায়ুচলাচল, মশা নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্যুৎ সরবরাহে অগ্রাধিকার—সবগুলোকে একই পরিকল্পনায় আনতে হবে। কারণ গরম, রোগ ও লোডশেডিং এখন আলাদা তিনটি ঘটনা নয়; বদলে যাওয়া জলবায়ুর বাস্তবতায় এগুলো পরস্পরকে শক্তিশালী করে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হয়ে উঠছে।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।
১১৮ বার পড়া হয়েছে