শুরু কোথায়? শেষই বা কোথায়? কোথায় তবে মুক্তি?
সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৭:২৩ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
অপ্রতিমের মৃত্যু কি শুধু একটি হত্যাকাণ্ড, নাকি আমাদের কিশোর সমাজের গভীর সংকটের আয়না?
একটা ফোনের দাম কি তেরো বছরের একটি প্রাণের চেয়েও বেশি?
অপ্রতিম, তোমার কাছে আমরা বুঝি ঋণী হয়ে রইলাম !
কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের জঙ্গলে তেরো বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধারের পর এই প্রশ্নটি শুধু একটি পরিবারের নয়—এটি আমাদের পুরো সমাজের কন্ঠস্বর ।
অপ্রতিম সেদিন মায়ের আইফোনটি নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে বেরিয়েছিল। আর বাড়ি ফেরেনি। প্রায় এক দিন পর তাকে পাওয়া গেল নিথর, রক্তাক্ত অবস্থায়। যে সন্তানকে বাবা-মা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে বড় করছিলেন, এক মুহূর্তে সেই স্বপ্ন পরিণত হলো এক অসহনীয় শূন্যতায়।
ঘটনার তদন্ত চলছে। পুলিশ কয়েকজনকে আটক ও গ্রেপ্তার করেছে এবং একটি আইফোন উদ্ধারের কথা জানিয়েছে। তদন্তকারীদের প্রাথমিক বক্তব্যে ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে অপ্রতিমকে হত্যার কথা এসেছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে বা আদালতের রায় হওয়ার আগে কাউকে চূড়ান্তভাবে অপরাধী বলা যায় না।
কিন্তু আইনের তদন্তের পাশাপাশি সমাজেরও একটি তদন্ত প্রয়োজন।
শুরু কোথায়? শেষ কোথায়? মুক্তি কোথায়?
অপ্রতিমকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও বাইক, কোথাও টিকটক, কোথাও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর দৃশ্য। এসব ছবি বা ভিডিওর সত্যতা, সময় ও প্রেক্ষাপট যাচাই না করে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো দায়িত্বশীল হবে না। এসবের সঙ্গে অপ্রতিমের মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়।
অপ্রতিমকে কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। বরং এসব দৃশ্য আমাদের নিজেদের দিকে তাকানোর একটি সুযোগ তৈরি করে।
আমাদের কিশোররা আজ কোথায় বড় হচ্ছে?
একসময় একটি শিশুর পৃথিবী ছিল মাঠ, স্কুল, বই, বন্ধু, পাড়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর পরিবারের উঠোন। এখন সেই পৃথিবীর বড় একটি অংশ চলে গেছে মোবাইলের পর্দায়। ভার্চুয়াল বন্ধুত্ব, অসংখ্য ভিডিও, দ্রুত জনপ্রিয় হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, অনলাইন স্বীকৃতির নেশা।
সব মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে এক নতুন জগৎ।
প্রযুক্তি নিজে শত্রু নয়। মোবাইল শিক্ষা দিতে পারে, যোগাযোগ তৈরি করতে পারে, প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ দিতে পারে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন ভার্চুয়াল পৃথিবী বাস্তব পৃথিবীর বিকল্প হয়ে ওঠে।
আর তখন প্রশ্ন আসে, আমরা কি তাদের জন্য যথেষ্ট বাস্তব পৃথিবী তৈরি করেছি?
দিয়েছি কি পর্যাপ্ত মাঠ? নিরাপদ আড্ডার জায়গা? পাঠাগার? খেলাধুলার সুযোগ? সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ? এমন একজন শিক্ষক, যার কাছে তারা ভয় না পেয়ে নিজেদের কথা বলতে পারে? এমন একটি পরিবার, যেখানে ভুল করলে সন্তান শাস্তির ভয়ে নয়, বিশ্বাসের জায়গা থেকে কথা বলতে পারে?
আমরা যখন এসব জায়গা সংকুচিত করেছি, তখন মোবাইলের পর্দা স্বাভাবিকভাবেই বড় হয়ে উঠেছে।
আর এখানেই আমাদের সবচেয়ে বড় সতর্কতার প্রয়োজন।
কারণ একটি কিশোর যখন স্কুল থেকে ঝরে পড়ে, তখন তার শিক্ষাজীবনের একটি অধ্যায় শেষ হয় মাত্র। তার জীবন কিন্তু থেমে যায় না।
এরপর তার সামনে কী থাকে, এই প্রশ্নের উত্তর কি আমরা প্রস্তুত রেখেছি?
অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় আলোচনায় আসা এক তরুণের শিক্ষাজীবন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, সে একাদশ শ্রেণিতে ব্যর্থ হয়ে ২০২৫ সালে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। কিন্তু একটি কথা পরিষ্কার হওয়া দরকার। পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া কোনো মানুষকে অপরাধী বানায় না।
বরং প্রশ্ন হলো, একজন তরুণ যখন শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে চলে যায়, তখন তাকে আমরা কোথায় নিয়ে যাই?
কারিগরি শিক্ষা? কর্মমুখী প্রশিক্ষণ? খেলাধুলা? সংস্কৃতি? নাকি তাকে ছেড়ে দিই এমন এক জগতের হাতে, যেখানে সময় কাটানোর জন্য তার হাতে শুধু একটি মোবাইল থাকে?
এখানেই তৈরি হয় ঝুঁকি। কেউ ভুল বন্ধুত্বে জড়িয়ে যেতে পারে। কেউ মাদকের দিকে যেতে পারে। কেউ অপরাধী চক্রের প্রলোভনে পড়তে পারে। আবার অনেকে কোনো অপরাধে না জড়িয়েও শুধু দিশাহীনতায় হারিয়ে যেতে পারে।
তাই প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে শুধু “অপরাধী কে?” এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। আরেকটি প্রশ্ন করতেই হবে, “অপরাধের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আগেই আমরা কোথায় ছিলাম?”
আমরা কি সন্তানের পাশে ছিলাম? শুধু তার হাতে দামি ফোন তুলে দিয়েছি, নাকি ফোনের ওপারের পৃথিবী নিয়েও তার সঙ্গে কথা বলেছি? তার বন্ধুদের চিনেছি? তার ভয় শুনেছি? তার মন খারাপ বুঝেছি? তার ব্যর্থতার পর তাকে আবার দাঁড়ানোর সুযোগ দিয়েছি?
একটি মাঠ হয়তো একজন কিশোরকে কয়েক ঘণ্টা স্ক্রিন থেকে দূরে রাখতে পারে। একটি বই হয়তো তাকে একটি নতুন পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে। একজন ভালো শিক্ষক হয়তো তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। একজন দায়িত্বশীল প্রতিবেশী হয়তো একটি বিপদ আগেই দেখতে পারেন। একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন হয়তো তাকে অন্যরকম স্বপ্ন দেখাতে পারে। আর একটি পরিবার হয়তো তাকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে।
একজন কিশোরকে বাঁচাতে সবসময় বড় কোনো প্রকল্প লাগে না। কখনো কখনো লাগে একজন মানুষের সময়, মনোযোগ এবং বিশ্বাস।
রাষ্ট্রের দায়িত্বও তাই শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর আইন প্রয়োগে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিশু-কিশোরদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা, খেলাধুলার অবকাঠামো, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং নিরাপদ জনপরিসর—এসব কোনো বিলাসিতা নয়। এগুলো একটি সুস্থ সমাজ নির্মাণের প্রয়োজনীয় উপাদান।
কারণ একটি সমাজ তার ভবিষ্যৎকে শুধু পরীক্ষার ফল দিয়ে তৈরি করে না। তৈরি করে তার পরিবেশ দিয়ে।
অপ্রতিমের মৃত্যু আমাদের বুকের ভেতর একটি গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। সেই ক্ষত যেন শুধু কয়েক দিনের শোক হয়ে না থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি পোস্ট লিখে, কিছুদিন ক্ষোভ প্রকাশ করে, তারপর সব ভুলে গেলে চলবে না।
অপ্রতিম আর ফিরবে না। তার মায়ের কোলে সে আর মাথা রাখবে না। বাবার সঙ্গে আর কোনো সাধারণ দুপুর ভাগ করে নেবে না। বন্ধুরা হয়তো আর কোনোদিন তাকে নিয়ে ছবি তুলবে না।
কিন্তু অপ্রতিমের মতো আরও অসংখ্য কিশোর আমাদের চারপাশে আছে। কেউ হয়তো একা। কেউ হয়তো ভুল বন্ধুত্বের দিকে এগোচ্ছে। কেউ হয়তো পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। কেউ হয়তো সারাদিন মোবাইলের পর্দায় ডুবে আছে। কেউ হয়তো পরিবারের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। কেউ হয়তো শুধু একজন মানুষের অপেক্ষায় আছে যে তাকে বলবে, “তুমি একা নও।”
আমরা যদি সেই মানুষটি হতে না পারি, তাহলে কোনো এক সন্ধ্যায় আবার হয়তো কোনো মায়ের ফোনে আসবে একটি অচেনা কল। আবার কোনো বাবা ছুটবেন থানায়, হাসপাতালে, রাস্তায়। আবার কোনো পরিবার খুঁজবে তার সন্তানকে। আর আমরা আবার প্রশ্ন করব, “এমন হলো কেন?”
এই ‘কেন’-এর উত্তর খুঁজতে হলে আজ থেকেই শুরু করতে হবে।
শুরু কোথায়? স্ক্রিনে? একাকীত্বে? ভুল সঙ্গের কাছে? শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ায়? নাকি আমাদের উদাসীনতায়?
শেষ কোথায়? একটি লাশের পাশে? একটি মায়ের আর্তনাদে? একটি বাবার শূন্য চোখে?
আর মুক্তি কোথায়?
মুক্তি শুধু একজন অপরাধীকে গ্রেপ্তারে নয়। বিচার অবশ্যই হতে হবে। অপরাধের যথাযথ তদন্ত ও আইনগত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু তার পাশাপাশি বদলাতে হবে সেই পরিবেশ, যেখানে একজন কিশোর ধীরে ধীরে পরিবার, শিক্ষা, সমাজ ও বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।
অপ্রতিমের মৃত্যুর জন্য দায় কার ? তার উত্তর তদন্ত ও আদালত দেবে। কিন্তু অপ্রতিমদের আমরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছি। এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের সবাইকে দিতে হবে।
কারণ আজ অপ্রতিম। আগামীকাল কে?
একজন সন্তান হারানোর পর কান্না করার চেয়ে, তার আগে একজন সন্তানকে ধরে রাখা অনেক বেশি জরুরি।
আমরা কি সেই হাতটি বাড়িয়ে দেব?
নাকি আরেকজন অপ্রতিম হারিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকব?
প্রশ্নগুলো আজ আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
শুরু কোথায়, শেষই বা কোথায় ? কোথায় মুক্তি?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হবে।
কারণ অপ্রতিম শুধু একটি নাম নয়।
সে আমাদের ভবিষ্যৎ।
আর সেই ভবিষ্যৎকে আমরা কোন বাংলাদেশ দেব। সিদ্ধান্তটা আজ থেকে আমাদেরই নিতে হবে ।
লেখক: আইনজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
১২২ বার পড়া হয়েছে