গণভোটের রায় না মানলে সংকট বাড়বে: শফিকুর রহমান
রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬ ১:৪৩ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না করে সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার চেষ্টা করলে দেশের মানুষ তা মেনে নেবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এমপি। তিনি বলেছেন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণের যে আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে, সরকারকে তা বাস্তবায়ন করতেই হবে। অন্যথায় ঢাকার মহাসমাবেশ থেকে সরকারকে তা মানতে বাধ্য করা হবে।
শনিবার (১৮ জুলাই) বিকেলে বরিশাল নগরীর বান্দ রোডের হেমায়েত উদ্দিন কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের বরিশাল বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণভোট ব্যর্থ হলে সরকারকেও জনগণ ব্যর্থ করে দেবে। সরকার যদি গণরায় উপেক্ষা করে, তাহলে রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হবে। জনগণের সঙ্গে আর কোনো ছলচাতুরি বা প্রতারণা মেনে নেওয়া হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, ঢাকা থেকে সড়কপথে ভাঙা পর্যন্ত আসার পর ভাঙা থেকে বরিশালের পথে গিয়ে দেখা গেছে, সেখান থেকেই ভাঙাচোরা রাস্তার শুরু। একটি বিভাগীয় মহাসড়কের দুই লেনের রাস্তার অবস্থা বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ের মতো। ভাঙা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার দাবি জানান তিনি।
জামায়াতের আমির বলেন, ভোলা বাংলাদেশের অংশ হলেও যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। কেন ভোলা-বরিশাল সেতু হবে না, কেন বরিশালে রেললাইন হবে না—এসব প্রশ্নের জবাব সরকারকে দিতে হবে। বরিশালবাসী দীর্ঘদিন ধরে রেললাইনের গল্প শুনলেও বাস্তবে তা দেখতে পাননি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি ইঞ্চি মাটি তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, দক্ষিণাঞ্চলকে বঞ্চিত রেখে কোনো ধরনের সুষম উন্নয়ন সম্ভব নয়।
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, জনগণের সঙ্গে আর প্রতারণা না করে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। যারা গণরায় মানে না, তারা গণতন্ত্রের শত্রু।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, সবকিছুর দাম বাড়িয়ে দিয়ে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে আড়াই হাজার টাকা সহায়তা দিলে তা দিয়ে মানুষের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব নয়। কারণ দাম বাড়ানো হয়েছে এর চেয়ে অনেক বেশি।
তিনি আরও বলেন, বিএনপির উচিত দেশকে সংঘাতের দিকে না নিয়ে সংসদে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকা, শপথ গ্রহণ করা এবং জুলাই সনদের আইনি ভিত্তির জন্য অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় কার্যকর করা। গণভোটের রায় মেনে সংবিধান সংস্কার করা হলে সংকটের সমাধান সম্ভব।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে। জুলাই আন্দোলন হয়েছিল বৈষম্য দূর করার জন্য। ২০১৬ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশের মানুষ রক্ত দিয়েছে, জীবন দিয়েছে, নির্যাতন সহ্য করেছে, কিন্তু ফ্যাসিবাদের কাছে মাথা নত করেনি। একই পথে হাঁটলে জনগণ তা মেনে নেবে না।
তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে রায় এলে তা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর সেই বিষয়ে টালবাহানা শুরু হয়েছে।
সমাবেশে জামায়াতের আমির ছাড়াও বক্তারা দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক সংস্কারের বিষয়ে বক্তব্য দেন।
এলডিপির চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন, আওয়ামী লীগ স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছে এবং দলটি আর বাংলাদেশে ফিরে আসবে না। তিনি বলেন, ১১ দল কোনো একটি দলে যোগ দেয়নি; বরং দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও সন্ত্রাস বন্ধের লক্ষ্যেই একত্রিত হয়েছে।
তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, মন্ত্রীরা যেন নিজেদের দায়িত্বের মধ্যে থাকেন। ত্রাণ বিতরণ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাজ, মন্ত্রীদের নয়। বিরোধী দল সরকারকে শত্রু মনে করে না, বরং সহযোগী হিসেবে কাজ করতে চায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এমপি বলেন, সরকার গণভোটের রায়ের আলোকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে গণআন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের পথে যেতে বাধ্য হবে।
তিনি বলেন, এখনো হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি দেওয়া হয়নি। তবে প্রয়োজন হলে এমন কর্মসূচির জন্য প্রস্তুতি রয়েছে। তার অভিযোগ, সরকার পরিস্থিতিকে ধীরে ধীরে সেই দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী গণভোটের পক্ষে কথা বললেও এখন জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করছেন না। জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে। তিনি বিএনপির সমালোচনা করে বলেন, ক্ষমতায় আসার পর তারা সংবিধান সংস্কার ও ৩১ দফার বিষয় থেকে সরে গেছে।
তিনি আরও বলেন, বিএনপি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়নি। বরং চাঁদাবাজির সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) মহাসচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের কোনো চেষ্টা সরকারের জন্য ক্ষতিকর হবে।
তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিচার, শহীদ ও আহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ এবং বরিশাল বিভাগের উন্নয়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।
ফুয়াদ বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনা দেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি শেখ হাসিনার উদ্দেশে বলেন, বাংলাদেশে ফিরলে তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে।
তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৭ বছরে বিরোধী দলের বক্তব্য প্রচারে বাধা দেওয়া হয়েছে এবং গণমাধ্যমে ভারসাম্য ছিল না। বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে বলেও তিনি দাবি করেন।
শনিবার দুপুর সোয়া ১২টায় জামায়াতের জেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি সৈয়দ আহমেদের সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে সমাবেশ শুরু হয়।
বৈরী আবহাওয়া ও বৃষ্টির মধ্যেও বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে সমাবেশে যোগ দেন। আয়োজকদের দাবি, ছয় জেলা থেকে কয়েক লাখ মানুষ এতে অংশ নেন।
সমাবেশে ঢাকা-বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীতকরণ, ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মাণ, বরিশালে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দক্ষিণাঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়নের দাবিতে গুরুত্বারোপ করা হয়।
সমাবেশে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও বরিশাল অঞ্চলের পরিচালক অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন হেলাল সভাপতিত্ব করেন। এছাড়া ১১ দলীয় ঐক্যের বিভিন্ন দলের কেন্দ্রীয়, জেলা ও মহানগর পর্যায়ের নেতারা বক্তব্য দেন।
১১৫ বার পড়া হয়েছে