কুড়িগ্রামে পানি কমলেও তীব্র নদীভাঙন, ৩৬ পয়েন্টে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি
বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬ ৯:৫৩ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
কুড়িগ্রামে প্রধান নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে নেমে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও নতুন করে ভয়াবহ আকার নিয়েছে নদীভাঙন। জেলার বিভিন্ন নদীতীরে ৩৬টি পয়েন্টে প্রতিদিনই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি ও বিভিন্ন স্থাপনা। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো দ্রুত স্থায়ী নদীশাসন, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছে।
কুড়িগ্রামে বন্যার পানি কমতে শুরু করায় সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে ধরলা, দুধকুমার, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরজুড়ে ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। জেলার বিভিন্ন নদীতীরের ৩৬টি পয়েন্টে অব্যাহত ভাঙনে প্রতিদিনই নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও বিভিন্ন স্থাপনা। এতে অনেক পরিবার গৃহহীন ও ভূমিহীন হয়ে পড়ছে।
বুধবার (১ জুলাই) সকাল ৯টার তথ্য অনুযায়ী, ধরলা নদীর কুড়িগ্রাম সেতু পয়েন্টে পানির স্তর বিপৎসীমার ৭৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। দুধকুমার নদীর পাটেশ্বরী পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ২৭ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে এবং কমতির ধারায় আছে। ব্রহ্মপুত্র নদীর চিলমারী পয়েন্টে পানির স্তর বিপৎসীমার ৭৬ সেন্টিমিটার নিচে নেমেছে। অন্যদিকে তিস্তা নদীর কাউনিয়া পয়েন্টে পানি সামান্য বাড়লেও তা এখনও বিপৎসীমার ৩১ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে। ফলে জেলার চারটি প্রধান নদীর পানি বর্তমানে বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি ভাঙনের শিকার হয়েছে ভূরুঙ্গামারী উপজেলার আন্ধারীঝাড় ইউনিয়নের ধাউরারকুটি, পাইকেরছড়া ইউনিয়নের পাইকডাঙ্গা, নাগেশ্বরীর বামনডাঙ্গা, চিলমারীর কড়াই বরিশাল, রাজারহাটের রামহরি এবং সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের বানিয়াপাড়া ও সরকারপাড়া এলাকা।
ভূরুঙ্গামারীর ধাউরারকুটি গ্রামের বাসিন্দা ফারুক হোসেন বলেন, কয়েক দফা আবেদন করার পরও নদীভাঙন ঠেকাতে জিও ব্যাগ ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তাঁর দাবি, গত পাঁচ দিনে তাঁদের গ্রামের ৩০ থেকে ৩৫টি বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। প্রতিবছর ভাঙন প্রতিরোধে বরাদ্দের কথা শোনা গেলেও বাস্তবে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের সরকারপাড়া গ্রামের রিপন মিয়া বলেন, প্রায় ছয় মাস ধরে ভাঙন ঠেকাতে আবেদন ও মানববন্ধন করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাঁর ভাষ্য, সরকারপাড়া ও বানিয়াপাড়ার প্রায় ৩০০ পরিবার ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কুড়িগ্রাম জেলা উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এবং জেলা চর উন্নয়ন কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক সাইয়েদ আহমেদ বাবু বলেন, বর্ষার শুরুতেই নদীভাঙনের ভয়াবহতা উদ্বেগজনক। তাঁর মতে, সাময়িকভাবে জিও ব্যাগ ফেলে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নদীশাসনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য দ্রুত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা প্রয়োজন।
এদিকে জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বন্যার পানিতে জেলার নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের ৪৯৯ হেক্টর জমির পাট, চীনাবাদাম, আউশ ধান, আমনের বীজতলা ও মরিচের ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে কৃষকদের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান বলেন, উজানে ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের কারণে আবারও নদ-নদীর পানি বাড়তে পারে। এ কারণে নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি ভাঙন মোকাবিলায় অতিরিক্ত জিও ব্যাগ প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা বেনজির আহমেদ জানান, সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ২৮৫ মেট্রিক টন জিআর চাল, ১ লাখ ৬২ হাজার টাকা এবং ৮০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
১১৭ বার পড়া হয়েছে