রক্তাক্ত শৈশব এবং জাতির বিবেকের মহাবিপর্যয়
শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬ ৬:৫৪ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
আজকের ভোরটাও অন্যদিনের মতোই হতে পারত। পাখি ডাকত, সূর্য উঠত, আর ছোট ছোট পা ফেলে একদল শিশু স্কুলের দিকে রওনা হতো। কিন্তু আজ বাতাসে এক ভারী সুবাস, মাটির বুক চিরে বের হওয়া এক বুকচাপা কান্না। এই কান্না কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের নয়, এই কান্না মানুষের তৈরি এক নরকের। গত চার মাসের ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টালে আমাদের চোখ আটকে যায় রক্তের দাগে। ১১৮টি নিষ্পাপ ফুল প্রস্ফুটিত হওয়ার আগেই ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে, ১৭টি তাজা প্রাণকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললে মনে হয়, আমরা কোনো সভ্য দেশে বাস করছি না, বরং এক আদিম হিংস্রতার কানাগলিতে হারিয়ে গেছি।
আমাদের পূর্বপুরুষেরা যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা ছিল এক নিরাপদ উদ্যান, যেখানে প্রতিটি শিশু নির্ভয়ে হাসবে, খেলবে আর বুক ভরে শ্বাস নেবে।
কিন্তু আজ যখন চারপাশের মানুষ এই নির্মমতাকে কেবল 'আরেকটি খবর' হিসেবে দেখে এড়িয়ে যায়; তখন বুঝতে হবে শুধু অপরাধীর নয়, পচন ধরেছে পুরো সমাজব্যবস্থায়।
গল্পের মতো করে যদি ভাবি, তবে এই প্রতিটি শিশুর জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো কেমন ছিল? সেই আতঙ্কিত চোখ, সেই দুর্বল কণ্ঠের আকুতি—"আমাকে ছেড়ে দাও!" কিন্তু সেই পৈশাচিক উল্লাসের সামনে কোনো মিনতি টেকেনি।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই জঘন্যতম অপরাধগুলো ঘটার পরও আমরা এক অদ্ভুত নীরবতা দেখতে পাই। কোথাও যেন কোনো জোরালো প্রতিকার নেই।
ইতিহাস সাক্ষী, যখন কোনো সমাজে অপরাধের তাৎক্ষণিক এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না, তখন অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। আজ বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি আমাদের বিচার ব্যবস্থার ওপর এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। আইনের ফাঁকফোকর আর দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তখন নিহত শিশুদের আত্মারা কবরে বসে ছটফট করে! এই কলঙ্ক কোনো একক ব্যক্তির নয়, এই কলঙ্ক পুরো জাতির। এই নির্মমতার মূলে রয়েছে সমাজের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক পচন। পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা, মাদকের বিস্তার; তরুণ ও যুবসমাজের একাংশকে মানসিকভাবে বিকৃত করে তুলছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ক্ষমতার দাপট এবং অপরাধকে ধামাচাপা দেওয়ার নোংরা রাজনীতি। যখন অপরাধীরা দেখে— টাকার জোরে বা রাজনৈতিক আশ্রয়ে পার পাওয়া সম্ভব; তখন তাদের আইনের প্রতি কোনো ভয় থাকে না। এই নৈতিক অবক্ষয় রোধ করতে না পারলে কেবল সমাজ পরিবর্তন সম্ভব নয়।
এই চরম অন্ধকার ও অরাজকতা থেকে মুক্তি পেতে হলে এখন আর সাধারণ আইন বা পুরোনো নিয়মের ধীরগতির বিচার দিয়ে চলবে না। এটি একটি জাতীয় জরুরি অবস্থা। এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী স্থান অর্থাৎ জাতীয় সংসদে জরুরি ভিত্তিতে নতুন এবং কঠোর আইন পাস করতে হবে।
শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও খুনের মতো জঘন্যতম অপরাধের ক্ষেত্রে বিচারপ্রক্রিয়াকে আমূল বদলে ফেলতে হবে। নতুন আইনের অধীনে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে, সমস্ত আমলাতান্ত্রিক ও আইনি দীর্ঘসূত্রতা লাঘব করতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর সর্বোচ্চ ১ মাসের (৩০ দিনের) মধ্যে অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ ফাঁসি কার্যকর করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন; দ্রুততম সময়ে এই দৃশ্যমান কঠোর শাস্তি কার্যকর হলে সমাজের অন্যান্য অপরাধীদের বুকে কাঁপন ধরবে এবং আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।
শুধু আইন করলেই রাষ্ট্র রাতারাতি নিরাপদ হবে না— যদি না, আমরা নাগরিক হিসেবে সচেতন হই। আমাদের প্রতিটি পাড়ায়, মহল্লায় অপরাধীদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কোনো অপরাধীকে যেন সামাজিকভাবে বা রাজনৈতিকভাবে কোনো আশ্রয় দেওয়া না হয়। একই সাথে পরিবার থেকে প্রতিটি সন্তানকে নৈতিকতা ও নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার শিক্ষা দিতে হবে।
ইতিহাসের পাতায় কোনো জাতি চিরকাল তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা দালানকোঠার উচ্চতা দিয়ে স্মরণীয় থাকে না। একটি জাতি কতটা সভ্য, তা পরিমাপ করা হয় সেই দেশে নারী ও শিশুরা কতটা নিরাপদ; তা দিয়ে। আজ আমাদের কপালে যে কলঙ্কের তিলক এঁকে দিয়েছে এই— গত চার মাসের ১১৮টি শিশু ধর্ষণ আর ১৭টি খুন— তা মুছে ফেলার সময় এখনই।
সংসদে নতুন আইন প্রণয়ন এবং দ্রুততম সময়ে ফাঁসি কার্যকরের মাধ্যমে আমাদের প্রমাণ করতে হবে; এই রাষ্ট্র এখনো মরে যায়নি।
একবার ভাবুন, আমাদের অতি আদরের সন্তানটি যখন ভয়ে গুটিয়ে থাকে; তখন কি আমাদের এই মেকি নীরবতা ভাঙা উচিত নয়? আসুন, আমাদের প্রতিটি ঘরের দেয়াল ভেঙে এক বিশাল প্রতিরোধ গড়ে তুলি। এই অন্ধকারকে গ্রাস করতে দেব না আমাদের ভবিষ্যৎ। ওদের কেড়ে নেওয়া শৈশব, ওদের রঙিন প্রজাপতি ধরার দিনগুলো আমাদের ফিরিয়ে দিতেই হবে। আগামী দিনের পৃথিবী যেন আমাদের এক বধির, পঙ্গু মানসিকতার জাতি হিসেবে ধিক্কার না দেয়। বরং তারা যেন সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করে—আমরা ছিলাম সেই অপরাজেয় অভিভাবক, যারা নিজেদের সন্তানের আত্মমর্যাদা আর সুরক্ষায় পৃথিবীর সব অন্ধকারের বিরুদ্ধে এক চুলও ছাড় দেয়নি।
একটি শিশুর হাসিমুখ, নিষ্পাপ চোখ আর চঞ্চলতাই হলো একটি সুস্থ সমাজের প্রতীক। কিন্তু বর্তমান সময়ে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধ আমাদের এই ধারণাকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। বর্তমান সমাজব্যবস্থায় শিশুরা আজ সবচেয়ে বেশি অসুরক্ষিত, যা একটি স্বাধীন ও সভ্য জাতির জন্য চরম লজ্জাজনক।
লেখক: প্রাবন্ধিক, নাট্যকার
১৭২ বার পড়া হয়েছে