সর্বশেষ

মতামত

রামিসার মৃত্যু আমাদের কী প্রশ্ন রেখে গেল

মোঃ আসিফ হাসান রাজু
মোঃ আসিফ হাসান রাজু

শুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬ ৫:২৮ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী রামিসা আক্তারের ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ফৌজদারি অপরাধ নয়, এটি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার ও বিচারব্যবস্থার গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি।

অভিযুক্ত প্রতিবেশী সোহেল রানার বিরুদ্ধে যে নৃশংসতার অভিযোগ উঠেছে, ধর্ষণের পর শিশুটির দেহ বিকৃত করা এবং মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে রাখা, তা কেবল ব্যক্তিগত বিকারগ্রস্ততার বহিঃপ্রকাশ নয়। এই ঘটনা দীর্ঘদিনের বিচারহীনতা, সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিক শিক্ষার দুর্বলতা এবং মানবিক মূল্যবোধের ক্রমাবনতির এক ভয়াবহ প্রতিফলন। একটি সভ্য সমাজে এমন ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবিক চেতনার উপর আঘাত।

ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে এবং আদালতে স্বীকারোক্তিও নেওয়া হয়েছে। সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে, কেবল একটি মামলার দ্রুত বিচার সম্পন্ন করলেই কি এই সংকটের সমাধান হবে? বাস্তবতা হলো দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের বহু ঘটনা তদন্তের ধীরগতি, প্রমাণ সংগ্রহের দুর্বলতা, সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবার সামাজিক চাপ, আর্থিক দুর্বলতা কিংবা ভয়ের কারণে বিচার প্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়ায়। এর ফলে অপরাধীরা ধীরে ধীরে এক ধরনের অঘোষিত নিরাপত্তাবোধ পেয়ে যায় এবং সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই আমাদের সামনে আরও ভয়াবহ সামাজিক বাস্তবতা তৈরি করছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা যেমন বেড়েছে, তেমনি অপরাধের ধরনও আরও নিষ্ঠুর ও বিকৃত হয়ে উঠছে। এখন ধর্ষণ শুধু যৌন সহিংসতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এর সঙ্গে হত্যা, দেহ বিকৃতি এবং প্রকাশ্য নিষ্ঠুরতা যুক্ত হচ্ছে। সমাজবিজ্ঞান ও অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণ বলা হয়। যখন মানুষ প্রতিনিয়ত নৃশংসতার খবর দেখে কিন্তু তার কার্যকর বিচার দেখতে পায় না, তখন অপরাধের প্রতি সামাজিক ভয় ও নৈতিক প্রতিরোধ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে সহিংসতা সমাজের কাছে অস্বাভাবিক কিছু না হয়ে এক ধরনের অভ্যস্ত বাস্তবতায় পরিণত হয়।

এই বাস্তবতার পেছনে সামাজিক ক্ষমতার সম্পর্ক এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতারও বড় ভূমিকা রয়েছে। নৃবিজ্ঞানী ডেভিড গিলমোর তাঁর “ম্যাকুলিনিটি” তত্ত্বে দেখিয়েছেন, পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য যখন সামাজিকভাবে প্রশ্নহীন হয়ে ওঠে, তখন তা সহিংস আচরণকে বৈধতা দিতে শুরু করে। বাংলাদেশের বাস্তবতায়ও আমরা দেখতে পাই, পরিবার, সমাজ এবং কিছু সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও নারীর প্রতি কর্তৃত্ববাদী মনোভাব বিদ্যমান। অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণকে শুধু যৌন আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে নয়, বরং ক্ষমতা প্রদর্শন, প্রতিশোধ বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই মানসিকতা কোনো একদিনে তৈরি হয় না। দীর্ঘদিনের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া, বৈষম্যমূলক পারিবারিক শিক্ষা এবং নারীর প্রতি অসম দৃষ্টিভঙ্গি ধীরে ধীরে এই ধরনের বিকৃত আচরণের ভিত্তি তৈরি করে।

এই পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নাগরিকদের ক্রমবর্ধমান আস্থাহীনতা। রামিসার পিতার হৃদয়বিদারক বক্তব্য, “আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার নিশ্চিত করতে পারেন না”, আসলে একটি ব্যক্তিগত শোকের চেয়েও বড় কিছু। এটি রাষ্ট্রের প্রতি সাধারণ মানুষের ভেঙে পড়া আস্থার প্রতিচ্ছবি। যখন নাগরিকরা বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে যে অপরাধের ন্যায়বিচার হবে না, তখন সমাজে অনাস্থা, ক্ষোভ এবং নীরব ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়। এই ভয় শুধু ভুক্তভোগীর পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি মা-বাবা এবং প্রতিটি শিশুর মনে অনিরাপত্তা ছড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে সামাজিক লজ্জা, ভয় এবং বিচার প্রক্রিয়ার জটিলতা অনেক ভুক্তভোগীকে অভিযোগ দায়ের করতেও নিরুৎসাহিত করে।

সামাজিক এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে আমাদের সাংস্কৃতিক ও নৈতিক পরিবর্তনের অসামঞ্জস্য। প্রযুক্তি, ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের জীবনে দ্রুত পরিবর্তন এনেছে, কিন্তু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নৈতিক শিক্ষা, পারিবারিক সংযোগ এবং মানবিক চর্চা গড়ে ওঠেনি। অনেক তরুণ ও কিশোর সহিংস কনটেন্ট, বিকৃত বিনোদন এবং আধিপত্যবাদী ধারণার দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। পরিবারে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা এবং সংযমের শিক্ষা কমে যাওয়াও সামাজিক সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ফলে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি মানসিক ও নৈতিক বিকাশ না ঘটলে সমাজে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়।

এই প্রসঙ্গে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম, হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম কিংবা খ্রিস্টধর্ম, সব ধর্মই মানুষকে মানবিকতা, সহমর্মিতা, সংযম এবং অন্যের মর্যাদা রক্ষার শিক্ষা দেয়। কোনো ধর্মই নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, নির্যাতন বা জুলুমকে সমর্থন করে না। ইসলাম অন্যায় হত্যাকে সমগ্র মানবজাতির বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে দেখেছে। হিন্দুধর্মে অহিংসা ও মানবকল্যাণকে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বৌদ্ধধর্ম করুণা ও আত্মসংযমের শিক্ষা দেয় এবং খ্রিস্টধর্ম ভালোবাসা ও ক্ষমার মাধ্যমে মানবিক সম্পর্ক গড়ে তোলার কথা বলে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আমাদের সমাজে ধর্মীয় চর্চা অনেক সময় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, অথচ ধর্মের মূল শিক্ষা, অর্থাৎ মানবিকতা, ন্যায়বিচার এবং অন্যের প্রতি সম্মান, সামাজিক আচরণে যথেষ্ট প্রতিফলিত হচ্ছে না।

তবে শুধু ধর্মীয় শিক্ষা বা কঠোর শাস্তির ঘোষণা দিয়েই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কারণ আইন মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি করতে পারে, কিন্তু একা নৈতিকতা তৈরি করতে পারে না। অপরাধ প্রতিরোধে আইনের পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন জরুরি। পরিবারে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই লিঙ্গসমতা, পারস্পরিক সম্মান এবং মানবিক আচরণের শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং সহিংসতা বিরোধী মূল্যবোধ অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিচারব্যবস্থাকে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর করতে হবে, যাতে অপরাধীরা বুঝতে পারে যে কোনো অপরাধই শাস্তি ছাড়া পার পাবে না।

এই দায় শুধু রাষ্ট্র বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নয়। গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, অভিভাবক এবং সচেতন নাগরিকদেরও এই সংকট মোকাবিলায় সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। ধর্ষণ ও সহিংসতার ঘটনাকে শুধু সাময়িক সংবাদ হিসেবে উপস্থাপন না করে এর সামাজিক কারণ, মানসিক প্রভাব এবং প্রতিরোধের পথ নিয়েও আলোচনা বাড়ানো জরুরি। কারণ প্রতিটি নৃশংস ঘটনা আমাদের সমাজের গভীর অসুস্থতার ইঙ্গিত বহন করে।

আজ রামিসার নির্মম মৃত্যু আমাদের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। আমরা কি কেবল কয়েকদিন ক্ষোভ প্রকাশ করে আবার সব ভুলে যাব, নাকি বিচারহীনতা, সামাজিক অবক্ষয় এবং মানবিক মূল্যবোধের সংকটের বিরুদ্ধে বাস্তব পরিবর্তনের পথে এগোব? যদি প্রতিটি অপরাধের নিশ্চিত বিচার, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা এবং মানবিক শিক্ষার সংস্কৃতি গড়ে তোলা না যায়, তবে শুধু কঠোর শাস্তির সংখ্যা বাড়িয়ে এই নৃশংসতা থামানো সম্ভব হবে না।

রামিসা আজ শুধু একটি নাম নয়, সে আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ এবং বিবেকের কাছে এক কঠিন প্রশ্ন, আমরা কেমন সমাজ গড়ে তুলছি যেখানে একটি শিশুও নিরাপদ নয়।

লেখক: শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

১৬২ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন