এক-এগারোর গ্রেপ্তার নাটকের মাস্টারমাইন্ড দুই সম্পাদক: মাসুদের স্বীকারোক্তি
শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬ ৫:৩২ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
এক-এগারো প্রেক্ষাপটে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং আরাফাত রহমান কোকোকে গ্রেপ্তারের সিদ্ধান্তে প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি ও সুশীল সমাজের একটি অংশের চাপ ছিল বলে অভিযোগ করেছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।
রিমান্ডে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদে তিনি দাবি করেন, ওই সময় প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান এবং ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের নেতৃত্বে একটি মহল জিয়া পরিবারকে রাজনৈতিকভাবে সরিয়ে দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেয় এবং গ্রেপ্তারের সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালায়।
গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে জানা যায়, এক-এগারোর ঘটনাপ্রবাহ ও তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দাবি করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেনাবাহিনীর ভেতরে খালেদা জিয়া ও তার পরিবারের সদস্যদের গ্রেপ্তার নিয়ে শুরুতে দ্বিধা ছিল। কোর কমান্ড পর্যায়ে তাদের বিদেশে পাঠানো বা গৃহবন্দি রাখার মতো বিকল্প নিয়েও আলোচনা হয়েছিল, তবে পরিস্থিতি পরে ভিন্ন দিকে অগ্রসর হয়।
তিনি আরও দাবি করেন, ২০০৬ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় দেশের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি সেনাবাহিনীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। এরই ধারাবাহিকতায় ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম এক পর্যায়ে তার সঙ্গে বৈঠকের আগ্রহ প্রকাশ করেন। পরে গুলশানের একটি বাসভবনে আয়োজিত নৈশভোজে তিনি অংশ নেন, যেখানে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানসহ কয়েকজন বুদ্ধিজীবী, অর্থনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন বলে তিনি জানান।
মাসুদের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই বৈঠকে দেশের রাজনৈতিক সংকট ও সেনাবাহিনীর সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়। উপস্থিত কয়েকজন রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য বড় ধরনের পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তিনি তখন স্পষ্টভাবে জানান, সেনাবাহিনী চেইন অব কমান্ড অনুযায়ী পরিচালিত হয় এবং এ ধরনের সিদ্ধান্ত সেনাপ্রধানের এখতিয়ারভুক্ত।
রিমান্ডে দেওয়া বক্তব্যে তিনি আরও উল্লেখ করেন, পরবর্তীতে সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের সঙ্গে তার একাধিক বৈঠক হয়। সেখানে নির্বাচন পরিস্থিতি, আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ এবং দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির আগে রাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমেই বাড়তে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত দেশে জরুরি অবস্থা জারির মধ্য দিয়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে।
তার অভিযোগ, সেনাবাহিনীর একটি অংশ জিয়া পরিবারের গ্রেপ্তারের বিরোধিতা করলেও সুশীল সমাজের কিছু প্রতিনিধি দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে দূরে সরানোর পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন। তার দাবি অনুযায়ী, মতিউর রহমান ও মাহফুজ আনামসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি মনে করতেন, রাজনৈতিক সংস্কারের জন্য ওই সময় বড় ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীতে অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি হওয়ায় জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে—এমন আশঙ্কাও তিনি সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছিলেন। তবে তার দাবি অনুযায়ী, পরবর্তীতে জনমত গঠনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা ও মতামত প্রকাশ পেতে থাকে।
জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ উদ্দিন আরও অভিযোগ করেন, ২০০৫ সালের পর থেকে একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি দৈনিক বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে প্রচারণা চালায়। একই সময়ে “যোগ্য নেতৃত্ব” ও “রাজনৈতিক সংস্কার” বিষয়ক আলোচনা, গোলটেবিল বৈঠক ও সেমিনারের মাধ্যমে জনমনে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি করার চেষ্টা চলেছে বলেও তিনি দাবি করেন।
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ধারণা, এক-এগারোর পটভূমি ও নেপথ্যের ভূমিকা আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে হলে সে সময়ের সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা প্রয়োজন হতে পারে।
উল্লেখ্য, গত ২৩ মার্চ রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকা থেকে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর একাধিক মামলায় দফায় দফায় রিমান্ডে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
২০০ বার পড়া হয়েছে