সর্বশেষ

মতামত

মা দিবসে সকল মায়ের প্রতি সালাম মায়ের হাত ধরেই জীবনের প্রথম পথচলা

তৌফিক সুলতান
তৌফিক সুলতান

রবিবার, ১০ মে, ২০২৬ ৩:৪৫ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
মা দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দিন নয়; এটি পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্বার্থ মানুষটির প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি উপলক্ষ। পৃথিবীর প্রতিটি সন্তানের জীবনে মা হচ্ছেন প্রথম শিক্ষক, প্রথম আশ্রয়, প্রথম সাহস এবং সবচেয়ে নিরাপদ ঠিকানা। আজকের এই বিশেষ দিনে সকল মায়ের প্রতি জানাই গভীর সালাম ও অফুরন্ত ভালোবাসা। আমার মা ফাতেমা বেগম-সহ পৃথিবীর প্রতিটি মা, যাঁরা সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য নীরবে আত্মত্যাগ করে যান, তাঁদের প্রতি রইল এই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

আজ হঠাৎ করেই খুব মনে পড়ছে একটি পুরোনো স্মৃতি। একদিন ডাক্তার দেখাতে এবং কিছু টেস্ট করানোর জন্য আমার মা ফাতেমা বেগমকে নিয়ে গিয়েছিলাম জহিরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ। হাসপাতালের করিডোর, অপেক্ষার দীর্ঘ সময়, চিকিৎসকের কক্ষে মায়ের উদ্বিগ্ন মুখ—সবকিছু আজও যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তখন বুঝেছিলাম, মা যখন অসুস্থ হন তখন সন্তানের ভেতরটা কতটা অসহায় হয়ে যায়। ছোটবেলায় মা আমাদের জ্বর হলে সারারাত জেগে থাকতেন, আর সেদিন হাসপাতালের বেঞ্চে বসে মনে হচ্ছিল—সময় যেন উল্টো পথে হাঁটছে। মায়ের কপালের ভাঁজে লেগে থাকা দুশ্চিন্তা আর চোখের কোণে চাপা কষ্ট দেখে বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠছিল।

কিন্তু সেদিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, অপেক্ষার এই দীর্ঘ প্রহরকে আমি মায়ের জন্য আনন্দময় করে তুলব। টেস্টের রিপোর্টের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছিল। সেই ফাঁকা সময়টুকুতে আমি মাকে বললাম, "চলো মা, হাসপাতালের চারপাশটা একটু ঘুরে দেখা যাক।" প্রথমে মা একটু ইতস্তত করছিলেন, শরীরে ক্লান্তি আর মনেও অস্বস্তি। কিন্তু আমার পীড়াপীড়িতে অবশেষে রাজি হলেন। হুইলচেয়ারে বসিয়ে নয়, মায়ের হাত ধরে ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলাম হাসপাতালের প্রাঙ্গণে। একটা সময় ছিল, যখন ছোটবেলায় মা আমার হাত ধরে রাস্তা পার করিয়ে দিতেন। সেদিন মনে হচ্ছিল, সময়ের চাকা যেন ঘুরে গেছে—এখন আমিই মায়ের হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। মায়ের হাতের সেই উষ্ণ স্পর্শ, শিরায় শিরায় যে ভালোবাসা প্রবাহিত, তা পৃথিবীর সব সম্পদের চেয়েও মূল্যবান।

হাসপাতালের ফটকের বাইরে ছোট্ট একটি বাগান ছিল। কয়েকটি গাছ, কিছু ফুল আর কয়েকটি বেঞ্চ—এই ছিল তার সম্বল। মাকে নিয়ে সেখানে দাঁড়াতেই ফুরফুরে একটা বাতাস বয়ে গেল। মায়ের মুখে যেন এক চিলতে প্রশান্তি ভেসে উঠল। ফুলগাছগুলোর দিকে তাকিয়ে মা বললেন, "আহা, কী সুন্দর ফুল ফুটেছে দেখো!" মায়ের মুখে সেই আলতো হাসি দেখে আমার মনটা ভরে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তটিকে ধরে রাখার জন্য আমি পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করলাম। বললাম, "মা, দাঁড়াও, একটা ছবি তুলি।" মা প্রথমে একটু লজ্জা পেলেন, তারপর ধীরে ধীরে ফুলের পাশে দাঁড়ালেন। ক্যামেরার সামনে তিনি বরাবরই সাবলীল নন, তবু সেদিন যেন এক অদ্ভুত নিসর্গের পটভূমিতে মাকে অপার্থিব লাগছিল। হাসপাতালের সাইনবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়েও কয়েকটি ছবি তুললাম। মা বললেন, "হাসপাতালের সামনে ছবি তোলার কী দরকার?" আমি হেসে বললাম, "তুমি ভালো হয়ে উঠছ, এই মুহূর্তটার স্মৃতি রাখতে চাই।" আসলে আমি বুঝতে পেরেছিলাম, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই মূল্যবান, বিশেষ করে যেখানে মা ভালো আছেন, হাসছেন—সেই মুহূর্তগুলো তো রত্নের মতো আগলে রাখার মতো। সেই ছবিগুলো আজও আমার ফোনের গ্যালারিতে সযত্নে সংরক্ষিত আছে। যখনই মন খারাপ হয়, সেই ছবিগুলো দেখে মায়ের ভালোবাসার স্পর্শ পাই, চোখের কোণে পানি চলে আসে। যে হাসপাতাল সাধারণত কষ্ট আর আরোগ্যের প্রতীক, সেদিন সেটাই হয়ে উঠেছিল মায়ের সঙ্গে কিছু মধুর সময় কাটানোর এক অনুপম স্থান।

মায়ের ভালোবাসার কোনো পরিমাপ নেই। একজন মা নিজের স্বপ্ন, ইচ্ছা, সুখ—সবকিছু সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য ত্যাগ করতে পারেন। আমার মা ফাতেমা বেগমও তেমনই একজন নীরব যোদ্ধা। জীবনের কত ঝড়-ঝাপটা তিনি হাসিমুখে সামলে নিয়েছেন, কত রাত জেগে পাশে বসে থেকেছেন, কত ত্যাগ স্বীকার করেছেন—তার ইয়ত্তা নেই। পৃথিবীর প্রায় সব সংস্কৃতি ও ধর্মেই মায়ের মর্যাদা সর্বোচ্চ স্থানে রাখা হয়েছে। ইসলাম ধর্মে মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত বলা হয়েছে। আধুনিক মনোবিজ্ঞানও বলে, একটি শিশুর মানসিক বিকাশ, আত্মবিশ্বাস ও মানবিক গুণাবলি গড়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন মা। একজন মা-ই পারেন সন্তানকে সত্যিকারের মানুষ করে গড়ে তুলতে।

বর্তমান ব্যস্ত জীবনে আমরা অনেক সময় মায়ের সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলি না, তাঁর খোঁজ নিই না, কিংবা তাঁর ছোট ছোট কষ্টগুলো বুঝতে চেষ্টা করি না। অথচ একজন মা সন্তানের একটি হাসির জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করতে পারেন। মা কখনো বড় কিছু চান না; সন্তানের ভালো থাকা আর একটু সম্মানই তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সেদিন হাসপাতালের বাগানে দাঁড়িয়ে মা ফাতেমা বেগমের মুখে যে তৃপ্তির হাসি দেখেছিলাম, তার কোনো মূল্য নেই। কোনো অর্থ, কোনো উপহার সেই হাসির বিনিময় হতে পারে না।

বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার পালিত হয় Mother's Day বা মা দিবস। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, মায়ের প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ধারণা বহু পুরোনো হলেও আধুনিক মা দিবসের প্রচলন শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রে। সমাজকর্মী Anna Jarvis তাঁর মায়ের স্মরণে ১৯০৮ সালে প্রথম এই দিবস পালনের উদ্যোগ নেন। পরে ১৯১৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে জাতীয় মা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। ধীরে ধীরে এটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ-সহ বিশ্বের প্রায় ৫০টিরও বেশি দেশ এখন দিবসটি পালন করে। তবে বাস্তবতা হলো—মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের জন্য শুধু একটি দিন যথেষ্ট নয়। প্রতিদিনই হওয়া উচিত মা দিবস।

আজকের দিনে আমাদের সবার উচিত মায়ের পাশে দাঁড়ানো, তাঁর স্বাস্থ্যের খোঁজ নেওয়া এবং তাঁকে সময় দেওয়া। বিশেষ করে বৃদ্ধ বয়সে অনেক মা নিঃসঙ্গতায় ভোগেন। প্রযুক্তিনির্ভর এই যুগে আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত থাকলেও মায়ের সঙ্গে কয়েক মিনিট আন্তরিকভাবে কথা বলার সময় বের করতে পারি না। অথচ সেই কথাগুলোই একজন মায়ের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান উপহার। সেদিন হাসপাতালের সেই অপেক্ষমান সময়টুকুতে মায়ের সঙ্গে গল্প করেছিলাম, পুরোনো দিনের স্মৃতি রোমন্থন করেছিলাম। দেখলাম, কত ছোট ছোট কথা মনে রেখেছেন তিনি—আমার ছোটবেলার দুরন্তপনা, প্রথম স্কুলে যাওয়ার দিন, বৃষ্টিতে কাগজের নৌকা ভাসানোর মুহূর্ত। মায়ের স্মৃতিশক্তি যেন সন্তানের প্রতিটি পদচারণাকে আগলে রাখে।

মা মানে মায়া, মা মানে নিরাপত্তা, মা মানে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। জীবনের প্রতিটি কঠিন সময়ে "মা" ডাকটি মানুষকে নতুন করে বাঁচার শক্তি দেয়। তাই মা দিবসে শুধু শুভেচ্ছা নয়, প্রতিজ্ঞা হোক—আমরা আমাদের মায়েদের আরও বেশি সম্মান করব, ভালোবাসব এবং তাঁদের হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করব। সময়ের নির্মম পরিহাস হলো, আমরা যত বড় হই, মা ততই বুড়িয়ে যান। কিন্তু সন্তানের চোখে মা সবসময় একইরকম থাকেন—অপরাজেয়, চিরসুন্দরী, চিরভালোবাসার প্রতিমূর্তি।

আজ মা দিবসে আমার মা ফাতেমা বেগম-সহ সকল মায়ের প্রতি বিনম্র সালাম। যাঁরা পৃথিবীতে আছেন, তাঁদের জন্য রইল অফুরন্ত ভালোবাসা। আর যাঁরা চলে গেছেন স্মৃতির আকাশে, তাঁদের জন্য রইল হৃদয়ের গভীরতম প্রার্থনা। আল্লাহ পৃথিবীর প্রতিটি মাকে সুস্থ, নিরাপদ ও সুখী রাখুন। তাঁদের প্রতিটি ত্যাগ, প্রতিটি অশ্রু, প্রতিটি দোয়া যেন সন্তানের জীবনে সফলতা ও শান্তির বার্তা বয়ে আনে।

লেখক: তৌফিক সুলতান,প্রভাষক - ব্রেভ জুবিলেন্ট স্কলার্স অফ মনোহরদী মডেল কলেজ,(বি জে এস এম মডেল কলেজ)মনোহরদী, নরসিংদী।
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা - ওয়েল্ফশন মানবকল্যাণ সংঘ,কাপাসিয়া, গাজীপুর।

১২০ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন