সর্বশেষ

মতামত

দাম্পত্য ঘনিষ্ঠতার অবক্ষয়: পাবলিক হেলথের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা

খাজা মাসুম বিল্লাহ কাওছারী
খাজা মাসুম বিল্লাহ কাওছারী

রবিবার, ১০ মে, ২০২৬ ১১:৪৩ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
বর্তমান বিশ্বে দাম্পত্য সম্পর্কের অন্যতম নীরব সংকট হলো “Sexless Marriage” বা যৌন ও মানসিক ঘনিষ্ঠতাহীন বিবাহিত জীবন। অনেক দম্পতি বাহ্যিকভাবে একসাথে বসবাস করলেও তাদের সম্পর্কের ভেতরে ধীরে ধীরে আবেগ, আকর্ষণ ও আন্তরিকতা নিঃশেষ হয়ে যায়।

একসময় যারা একে অপরকে ছাড়া জীবন কল্পনা করতে পারতেন না, বিয়ের কয়েক বছর পর তারাই মানসিক দূরত্ব, বিরক্তি ও একাকীত্বে ভুগতে শুরু করেন।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বিবাহিত নারীদের মধ্যে প্রায় ২৯.২% ডিপ্রেশন এবং ২৬.৯% উদ্বেগে ভুগছেন, যা দাম্পত্য অসন্তুষ্টি ও intimacy crisis-এর সাথে সম্পর্কিত। অন্যদিকে, গ্রামীণ বিবাহিত পুরুষদের প্রায় ৬০% যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যার কথা জানিয়েছেন। গবেষণাগুলো ইঙ্গিত দেয় যে emotional distance, stress, communication gap এবং মানসিক চাপ বর্তমান দাম্পত্য জীবনে sexual frustration বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি কেবল শারীরিক আকর্ষণ হারানোর বিষয় নয়, বরং এটি emotional disconnection বা মানসিক বিচ্ছিন্নতার একটি জটিল প্রক্রিয়া। সম্পর্ক মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, intimacy বা ঘনিষ্ঠতা ধ্বংস হয় ধীরে ধীরে—অবহেলা, অসম্মান, যোগাযোগের অভাব এবং অমীমাংসিত মানসিক ক্ষতের মাধ্যমে।


সেক্সলেস ম্যারেজ আসলে কী?
Clinical Psychology অনুযায়ী, যখন একটি দাম্পত্য সম্পর্কে দীর্ঘ সময় ধরে যৌন সম্পর্ক অনুপস্থিত থাকে বা বছরে ১০ বারের কম শারীরিক সম্পর্ক ঘটে, তখন সেটিকে “Sexless Marriage” বলা হয়।
আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী Denise A. Donnelly-এর গবেষণায় দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দম্পতি এই সমস্যার মধ্যে বসবাস করছেন।
তবে গবেষকরা মনে করেন, যৌন সম্পর্কের সংখ্যাই একমাত্র বিষয় নয়; বরং সম্পর্কের emotional intimacy বা আবেগীয় সংযোগই এখানে মুখ্য।

আকর্ষণ কেন কমে যায়?
বিয়ের শুরুতে মানুষের মস্তিষ্কে Dopamine, Oxytocin এবং Serotonin-এর মাত্রা বেশি থাকে। এই হরমোনগুলো প্রেম, উত্তেজনা ও সংযুক্তির অনুভূতি সৃষ্টি করে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সম্পর্ক যদি emotional nourishment না পায়, তাহলে এই অনুভূতিগুলো দুর্বল হতে শুরু করে।
খ্যাতিমান সম্পর্ক গবেষক John Gottman তার দীর্ঘ ৪০ বছরের গবেষণায় দেখিয়েছেন, দাম্পত্য সম্পর্কে চারটি বিষয় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর:
Criticism (অতিরিক্ত সমালোচনা)
Contempt (অবজ্ঞা)
Defensiveness (আত্মরক্ষামূলক আচরণ)
Stonewalling (নীরব দূরত্ব তৈরি করা)
তিনি এগুলোকে “Four Horsemen of Relationship Apocalypse” নামে আখ্যায়িত করেছেন।

মানসিক দূরত্ব:
নীরব সম্পর্ক হত্যাকারী
অনেক দম্পতির মধ্যে শারীরিক দূরত্ব তৈরি হওয়ার আগেই মানসিক দূরত্ব শুরু হয়।
যখন একজন সঙ্গী নিজেকে অবহেলিত, অশ্রুত বা অসম্মানিত মনে করেন, তখন ধীরে ধীরে emotional safety নষ্ট হতে থাকে।
Psychotherapist Esther Perel তার গবেষণায় বলেন-
“Desire needs distance, mystery, and emotional vitality.”
অর্থাৎ, সম্পর্ক যখন শুধুই দায়িত্ব, বিল পরিশোধ, সন্তান লালন-পালন ও দৈনন্দিন ক্লান্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তখন রোমান্টিক আকর্ষণ ধীরে ধীরে নিভে যেতে থাকে।
সংসারের চাপ ও যৌন আকাঙ্ক্ষার সম্পর্ক
আধুনিক দাম্পত্য জীবনে অর্থনৈতিক চাপ, কর্মজীবনের ক্লান্তি, পারিবারিক দায়িত্ব এবং মানসিক উদ্বেগ যৌন জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে- দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ (chronic stress) মানুষের libido বা যৌন আকাঙ্ক্ষা কমিয়ে দেয়। Cortisol hormone-এর মাত্রা বেড়ে গেলে শরীর ও মস্তিষ্ক intimacy-এর প্রতি আগ্রহ হারাতে শুরু করে।
বিশেষত দক্ষিণ এশীয় সমাজে অনেক দম্পতি মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন না। ফলে depression, anxiety বা emotional burnout সম্পর্কের ভেতরে নীরবে ক্ষয় সৃষ্টি করে।

যোগাযোগের অভাব:
সম্পর্কের নীরব ধ্বংস দাম্পত্য সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো honest communication-এর অভাব।
অনেক দম্পতি নিজেদের কষ্ট, হতাশা বা অপূর্ণতার কথা প্রকাশ করেন না। ফলে অভিমান জমতে জমতে emotional wall তৈরি হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে- যেসব দম্পতি নিয়মিত অর্থপূর্ণ আলাপ করেন এবং একে অপরের আবেগকে গুরুত্ব দেন, তাদের সম্পর্কে intimacy দীর্ঘস্থায়ী হয়।
মনোবিজ্ঞানে এটিকে “Emotional Responsiveness” বলা হয়। অর্থাৎ, একজন সঙ্গীর আবেগীয় প্রয়োজনের প্রতি অন্যজনের সংবেদনশীল সাড়া।
শুধু শরীর নয়, intimacy হলো মানসিক নিরাপত্তা।

দীর্ঘদিন ফিজিক্যাল রোমান্সের অভাব মানসিক একাকীত্ব, হতাশা, আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া, রাগ-বিরক্তি এবং দাম্পত্য দূরত্ব সৃষ্টি করতে পারে। এতে emotional connection দুর্বল হয় এবং অনেকেই নিজেকে অবহেলিত বা অপ্রয়োজনীয় মনে করতে শুরু করেন।

অনেক মানুষ intimacy-কে শুধুই শারীরিক সম্পর্ক মনে করেন। কিন্তু সম্পর্ক মনোবিজ্ঞান বলছে, intimacy মূলত emotional trust, vulnerability এবং mutual respect-এর উপর দাঁড়িয়ে থাকে।
যখন একজন মানুষ তার সঙ্গীর কাছে নিরাপদ বোধ করেন, বিচারহীনভাবে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করতে পারেন এবং সম্মান পান, তখন সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা গভীর হয়।
অন্যদিকে, অপমান, অবজ্ঞা, ব্যঙ্গ, তুলনা বা অবহেলা একজন মানুষের যৌন আকাঙ্ক্ষাকে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দেয়।
প্রযুক্তি ও ডিজিটাল দূরত্ব
বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল আসক্তিও দাম্পত্য ঘনিষ্ঠতা কমিয়ে দিচ্ছে। অনেক দম্পতি একই বিছানায় থেকেও আলাদা স্ক্রিনে ডুবে থাকেন।
গবেষকরা একে “Alone Together Syndrome” বলে উল্লেখ করেছেন। যেখানে মানুষ শারীরিকভাবে কাছাকাছি থাকলেও মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকে।

সমাধানের পথ কী?

মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, সেক্সলেস ম্যারেজের সমাধান শুধু শারীরিক সম্পর্ক বাড়ানো নয়, বরং emotional reconnection তৈরি করা।
সমাধানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো:
১. খোলামেলা ও সম্মানজনক যোগাযোগ
২. পারস্পরিক appreciation প্রকাশ করা
৩. একে অপরকে শুধুমাত্র “দায়িত্ব” নয়, “মানুষ” হিসেবে দেখা
৪. নিয়মিত quality time কাটানো
৫. unresolved conflict দ্রুত সমাধান করা
৬. প্রয়োজনে marriage counseling গ্রহণ করা।

দাম্পত্য জীবনে intimacy হঠাৎ করে মারা যায় না, এটি ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। অব্যক্ত কষ্ট, সুপ্ত ও লুকিয়ে থাকা যন্ত্রণা, মানসিক দূরত্ব, অসম্মান,অবজ্ঞা ও যোগাযোগের অভাব একসময় সম্পর্ককে নিঃস্ব করে দেয়।
একটি সফল দাম্পত্য শুধু একই ছাদের নিচে বসবাস নয়, বরং একে অপরের আবেগ, দুর্বলতা ও মানবিক চাহিদাকে বোঝার নাম।
সুতরাং, “Sexless Marriage” মূলত শরীরের সংকট নয়— এটি হৃদয়ের দূরত্বের প্রতিফলন।
শারীরিক ঘনিষ্ঠতা বা দীর্ঘদিন শারীরিক সম্পর্ক না করলে মানসিক চাপ, বিষণ্নতা, উদ্বেগ, অনিদ্রা, আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া এবং দাম্পত্য দূরত্ব তৈরি হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে স্ট্রেসজনিত কারণে শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এবং তা কোন কোন ভাবে ক্যান্সারের ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।


তথ্যসূত্র
1. Gottman, John & Nan Silver — The Seven Principles for Making Marriage Work
2. Esther Perel — Mating in Captivity
3. Denise A. Donnelly — “Sexless Marriage: The Causes and Consequences”
4. American Association for Marriage and Family Therapy (AAMFT)
5. World Health Organization (WHO) — Mental Health and Relationships Reports
6. Psychology Today — Emotional Intimacy and Marriage Studies
7. Journal of Sex Research — Marital Satisfaction and Sexual Frequency Studies
8. Human Sexuality: Diversity in Contemporary America — Strong, Devault & Cohen
9. Psychology of Human Sexuality — Justin J. Lehmiller
10. Come As You Are — Emily Nagoski
11. Sexuality: A Very Short Introduction — Veronique Mottier
12. The New Male Sexuality — Bernie Zilbergeld
13. The Science of Orgasm — Barry Komisaruk, Carlos Beyer-Flores & Beverly Whipple
14. The Journal of Sex Research
15. Archives of Sexual Behavior
16. Sexual Medicine Reviews
17. Journal of Sexual Medicine.



লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক, বেসরকারি গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক এবং ব্রাক ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের কর্ম-অভিজ্ঞ।

১৩৩ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন