মোংলায় মেয়েকে জমি লিখে দিয়ে এখন ঠাঁই নেই বৃদ্ধ বাবার
রবিবার, ১০ মে, ২০২৬ ১:২২ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
বাগেরহাটের মোংলায় সম্পত্তিকে কেন্দ্র করে এক বৃদ্ধ বাবাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার নিজের বড় মেয়ে ও জামাইয়ের বিরুদ্ধে।
আদালতে দায়ের করা মামলায় জয়ের পরও নিজ ভিটায় ফিরতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী হায়দার আলী।
জানা গেছে, নব্বইয়ের দশকে জীবিকা নির্বাহের তাগিদে বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলা থেকে পরিবার নিয়ে মোংলা উপজেলার চাঁদপাই ইউনিয়নের উত্তর মালগাজী গ্রামে বসতি স্থাপন করেন আলী হায়দার। ১৯৯৬ সালে তিনি সেখানে ২০ দশমিক ৭৫ শতক জমি ক্রয় করেন এবং বসতঘর নির্মাণ করেন। স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে গড়ে ওঠে তার সংসার।
পরবর্তীতে স্ত্রী মারা গেলে বড় মেয়ে নূর জাহান বেগমের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে নিজের কেনা ৮ কাঠা জমির মধ্যে ৪ কাঠা জমি তার নামে দলিল করে দেন তিনি। মেয়েকে কাছে রাখা এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে জানান স্থানীয়রা।
দীর্ঘদিন সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও ২০১৬ সাল থেকে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, নূর জাহানের স্বামী এবং স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির পরামর্শে পুরো জমির দখল নেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়। একপর্যায়ে বড় মেয়ে ও জামাই মিলে হায়দার আলী, তার ছোট ছেলে এবং অপর মেয়েকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেন। এরপর থেকে প্রায় ১০ বছর ধরে অন্যত্র মানবেতর জীবনযাপন করছেন বৃদ্ধ হায়দার আলী।
নিজের জমি ও বসতভিটা ফিরে পেতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে একাধিকবার বিচার চাইলেও কোনো প্রতিকার পাননি বলে অভিযোগ তার। বরং ২০২৩ সালে বড় মেয়ে নূর জাহান বেগম তার বাবার বিরুদ্ধে আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ তদন্ত ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে চলতি বছরের ৩০ মার্চ আদালত মামলাটি মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় খারিজ করে দেন।
আদালতের রায়ের কপি হাতে নিয়ে গতকাল হায়দার আলী তার এক ছেলে ও এক মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে নিজ বাড়িতে ফেরার চেষ্টা করেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, বাড়িতে পৌঁছানোর পর নূর জাহান বেগম ও তার সমর্থিত লোকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়। মারধর করে আবারও তাদের বাড়ির বাইরে বের করে দেওয়া হয়। পরে খবর পেয়ে মোংলা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।
অভিযুক্ত নূর জাহান বেগম দাবি করেন, তার বাবা তার সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। তিনি বলেন, “আমি ও আমার স্বামী টাকা দিয়েছি। সেই টাকা দিয়ে জমি কেনা হয়েছে এবং বাবার নামেও রাখা হয়েছে।” তবে গত ৩০ বছরে কেন জমি বা দলিল নিয়ে কোনো খোঁজ নেননি—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “প্রয়োজন হয়নি, তাই খোঁজ নিইনি। এখন জমি আমার দখলে, তাই পুরো জমিই আমার।”
অন্যদিকে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে হায়দার আলী বলেন, “যে মেয়েকে নিজের হাতে বড় করেছি, যার ভবিষ্যতের জন্য জমি লিখে দিয়েছি, আজ সে-ই আমাকে রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছে। আদালতের রায় পাওয়ার পরও আমি নিজের জমিতে যেতে পারছি না। আমি এর সঠিক বিচার চাই।”
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চাঁদপাই ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দারাও। তাদের ভাষ্য, সম্পত্তির লোভে কোনো সন্তান নিজের বাবার সঙ্গে এমন আচরণ করতে পারে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। তারা বৃদ্ধ হায়দার আলীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তার আইনগত অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
মোংলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত অমানবিক। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আদালতের রায় হায়দার আলীর পক্ষে থাকায় তাকে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়া এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।”
১১৯ বার পড়া হয়েছে