নায়ক থেকে নেতা: থালাপতি বিজয়-এর উত্থানে তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ
মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬ ২:২৫ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
দক্ষিণী চলচ্চিত্র জগতের জনপ্রিয় মুখ থালাপতি বিজয় এখন রাজনীতির ময়দানে এক শক্তিশালী উপস্থিতি। দীর্ঘদিনের জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে ধাপে ধাপে গড়ে তোলা সাংগঠনিক কাঠামোর ওপর ভর করেই তিনি পৌঁছে গেছেন ক্ষমতার কেন্দ্রের দোরগোড়ায়। তাঁর এই রূপান্তর শুধু ব্যক্তিগত নয়—তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রাজ্যের প্রচলিত দুই শক্তি দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝগম (ডিএমকে) এবং অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝগম (এআইএডিএমকে)-এর পাশাপাশি তৃতীয় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে বিজয়ের দল তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম (টিভিকে)। অল্প সময়ের মধ্যেই দলটির উত্থান তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
বিজয়ের রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা হয় ২০০৯ সালে, যখন তিনি ‘বিজয় মাক্কাল ইযাক্কম’ নামে একটি সামাজিক সংগঠন গড়ে তোলেন। শুরুতে অরাজনৈতিক এই প্ল্যাটফর্ম ত্রাণ কার্যক্রম, শিক্ষা সহায়তা এবং স্থানীয় সমস্যায় সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত বিস্তৃত ভিত্তি তৈরি করে। পরবর্তীতে এই সংগঠনই হয়ে ওঠে তাঁর রাজনৈতিক শক্তির ভিত্তি।
২০১১ সালে এআইএডিএমকে নেতৃত্বাধীন জোটকে সমর্থনের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো সরাসরি রাজনৈতিক অবস্থান নেন বিজয়। এরপর ধীরে ধীরে তাঁর বক্তব্য ও উপস্থিতিতে রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট হতে থাকে। বেকারত্ব, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার মতো ইস্যুতে সরব হন তিনি। ২০১৯ সালে সিটিজেনশিপ এমেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট-এর সমালোচনার মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান আরও দৃঢ় হয়।
২০২১ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তাঁর সংগঠনের প্রার্থীদের সাফল্য ছিল বড় একটি টার্নিং পয়েন্ট। এতে প্রমাণ হয়, জনপ্রিয়তা শুধু জনসমাগমেই সীমাবদ্ধ নয়—তা ভোটেও রূপ নিতে পারে।
অবশেষে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক দল তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম ঘোষণা করেন বিজয়। দল ঘোষণার সময়ই তিনি জানিয়ে দেন, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দল এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে এবং কোনো প্রাক-নির্বাচনী জোটে যাবে না।
রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পর নিজের দীর্ঘ চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারের ইতি টানার ঘোষণাও দেন তিনি। প্রায় তিন দশকের অভিনয়জীবন শেষে এই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির স্পষ্ট বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে যাত্রাপথ পুরোপুরি মসৃণ ছিল না। ২০২৫ সালে দলীয় এক অনুষ্ঠানে পদদলনের ঘটনায় প্রাণহানি সংগঠনের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। যদিও সেই সংকটে সংযত প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে নেতৃত্বের ভিন্ন দিক তুলে ধরেন বিজয়।
বর্তমানে তামিলনাড়ুর রাজনীতি ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিকে এগোচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিজয়ের দল উল্লেখযোগ্য আসন পেলে তিনি সরকার গঠনের অন্যতম নির্ধারক শক্তিতে পরিণত হতে পারেন।
বিজয়ের উত্থান অনেকটাই স্মরণ করিয়ে দেয় কিংবদন্তি অভিনেতা-রাজনীতিক এম. জি. রামাচন্দ্রন-এর সময়কে, যিনি একসময় তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছিলেন। তবে দুই যুগের এই দুই তারকার উত্থানের প্রেক্ষাপট ভিন্ন—যেখানে এমজিআর জনমুখী কল্যাণনীতির ওপর নির্ভর করেছিলেন, সেখানে বিজয় এগোচ্ছেন নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে ভিত্তি করে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের নির্বাচন শুধু একটি ভোটযুদ্ধ নয়—এটি তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন ভাষা ও নেতৃত্বের পরীক্ষার মঞ্চ হয়ে উঠছে। ফল যাই হোক, থালাপতি বিজয়-এর এই উত্থান ইতোমধ্যেই ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে।
১২০ বার পড়া হয়েছে