পালিয়ে বিয়ে বা ভিডিও কলে কবুল, আইনের স্বীকৃতি কতটুকু?
বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬ ৯:৫৪ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
পরিবারের অমতে পালিয়ে বিয়ে, নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে হলফনামা কিংবা ভিডিও কলে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা—এসব ঘটনা বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায়। তবে শুধু তিনবার কবুল বলা বা হলফনামা তৈরি করলেই বিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পায় না। ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী বিয়ে সম্পন্ন হওয়া এবং আইন অনুযায়ী বিয়ের নিবন্ধন ও স্বীকৃতি পাওয়ার মধ্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।
বাংলাদেশে অনেক তরুণ-তরুণী পরিবারের সম্মতি না পেয়ে পছন্দের মানুষকে বিয়ে করতে বাড়ি ছেড়ে চলে যান। কেউ দুই সাক্ষীর উপস্থিতিতে ধর্মীয় রীতিতে বিয়ে করেন, আবার কেউ নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে হলফনামা তৈরি করে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে বলে মনে করেন।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিয়ের নিবন্ধন না থাকলে দেনমোহর, ভরণপোষণ, সম্পত্তি ও উত্তরাধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে আইনি জটিলতা দেখা দিতে পারে।
আইনজীবী মো. শামসুদ্দোহা সুমনের মতে, বাংলাদেশে বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। মুসলিম বিয়ের ক্ষেত্রে নিবন্ধিত নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজীর মাধ্যমে বিয়ে নিবন্ধন করতে হয়। শুধু হলফনামা তৈরি করে বিয়ের আইনগত স্বীকৃতি পাওয়া যায় না।
হলফনামা করলেই কি বিয়ে বৈধ হয়?
নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে হলফনামা তৈরি করে বিয়ের ঘোষণা দেওয়ার প্রচলন থাকলেও এটি আইন অনুযায়ী বিয়ে নিবন্ধনের বিকল্প নয়। বিশেষ করে বিয়ের নির্ধারিত বয়স পূর্ণ না হলে বয়স গোপন করতে কেউ কেউ এ পদ্ধতির আশ্রয় নেন।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, বিয়ের ক্ষেত্রে পুরুষের ন্যূনতম বয়স ২১ বছর এবং নারীর ১৮ বছর। ২০১৯ সালে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং অবৈধ বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন বন্ধে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন নিষিদ্ধ করে নির্দেশনা জারি করেছিল আইন মন্ত্রণালয়।
বিয়ে নিবন্ধিত না থাকলে দেনমোহর ও কাবিনের অর্থ আদায়, সম্পত্তির অধিকার কিংবা উত্তরাধিকার দাবি করার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিতে পারে। স্বামী বা স্ত্রীর মৃত্যুর পরও বৈবাহিক সম্পর্কের আইনি স্বীকৃতি প্রমাণ করতে সমস্যায় পড়তে পারেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি।
শুধু তিনবার কবুল বললেই কি বিয়ে সম্পন্ন?
ইসলামি বিধান অনুযায়ী, বিয়েতে বর-কনের সম্মতি, সাক্ষীর উপস্থিতি এবং দেনমোহর নির্ধারণসহ প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করতে হয়। তবে ধর্মীয়ভাবে বিয়ে সম্পন্ন হওয়া এবং রাষ্ট্রীয় আইনে তার স্বীকৃতি নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়।
কাজী অফিস সংশ্লিষ্ট আহসান উল্লাহ মাসুকের ভাষ্য, অনেকের ধারণা, কলেমা পড়ে বা তিনবার কবুল বললেই বিয়ে সম্পন্ন হয়ে যায়। কিন্তু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিয়ে নিবন্ধন করাও জরুরি।
ভিডিও কলে বিয়ের ধর্মীয় ও আইনি জটিলতা
বিদেশে অবস্থানরত বর বা কনের সঙ্গে ভিডিও কলে বিয়ে করার প্রবণতাও রয়েছে। তবে এ বিষয়ে ইসলামি আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে।
কিছু আলেমের মতে, ভিডিও কলে বর-কনেকে শনাক্ত করা সম্ভব হলে এবং বিয়ের অন্যান্য শর্ত পূরণ হলে এমন বিয়ে ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
তবে বিয়ে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতিতে জটিলতা রয়েছে। কাজী অফিস সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, নিবন্ধনের জন্য বর-কনের সরাসরি উপস্থিতি এবং নির্ধারিত কাগজপত্রে স্বাক্ষরের প্রয়োজন হয়। ফলে ভিডিও কলে বিয়ের ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা থাকলেও নিবন্ধনের বিষয়টি আলাদাভাবে নিশ্চিত করা জরুরি।
ভিন্ন ধর্মের মানুষের বিয়ের আইনি সুযোগ
বাংলাদেশে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের নিজ নিজ ধর্ম পরিবর্তন না করে বিয়ের সুযোগ রয়েছে বিশেষ বিবাহ আইন, ১৮৭২-এর অধীনে। এ ক্ষেত্রে নির্ধারিত সিভিল রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয় এবং তিনজন সাক্ষীর উপস্থিতি প্রয়োজন।
আইন অনুযায়ী, এ ধরনের বিয়েতে পুরুষের বয়স কমপক্ষে ২১ বছর এবং নারীর ১৮ বছর হতে হবে। পাশাপাশি বিয়ের সময় উভয়ের জীবিত স্বামী বা স্ত্রী থাকা যাবে না।
বিয়ের ক্ষেত্রে নিবন্ধন কেন জরুরি?
বিয়ে শুধু ব্যক্তিগত বা ধর্মীয় সম্পর্ক নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আইনগত অধিকার ও দায়িত্ব। তাই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পাশাপাশি যথাযথ নিবন্ধন নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
বিয়ের নিবন্ধন থাকলে ভবিষ্যতে দেনমোহর, ভরণপোষণ, দাম্পত্য অধিকার, সম্পত্তি ও উত্তরাধিকারসংক্রান্ত দাবি প্রতিষ্ঠা করা তুলনামূলক সহজ হয়। অন্যদিকে, নিবন্ধন না থাকলে বৈবাহিক সম্পর্কের প্রমাণ দিতে গিয়ে নানা ধরনের আইনি সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন স্বামী বা স্ত্রী।
তাই পালিয়ে বিয়ে, হলফনামা কিংবা ভিডিও কলে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রচলিত আইন ও নিবন্ধনের নিয়ম সম্পর্কে জানা জরুরি। প্রয়োজনে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
১৩৭ বার পড়া হয়েছে