ঝলমল অগ্নিকান্ড: অবহেলা ও অপব্যহারে ভষ্মীভূত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পুরাকীর্তি নিদর্শন
সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬ ৮:১১ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
ময়মনসিংহের গৌরীপুরে আগুনে পুড়ে ধ্বংস হয়েছে শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী নাট্যশালা, যা সর্বশেষ ‘ঝলমল সিনেমা হল’ নামে পরিচিত ছিল। লেখক ইমতিয়াজ আহমেদের অভিযোগ, প্রশাসনের অবহেলা, যথাযথ তদারকির অভাব এবং লিজগ্রহীতা ও দখলদারদের অপব্যবহারের কারণে ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ধ্বংস হয়েছে। তিনি এ ঘটনায় দায়ীদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা এবং নাট্যশালাটির ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
আগুনে পুড়ে ছাঁই হলো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বারক গৌরীপুর তথা ময়মনসিংহ অঞ্চলের অন্যতম পুরাকীর্তি নিদর্শন, যা সর্বশেষ 'ঝলমল সিনেমা হল' নামে পরিচিত ছিল। গত ০৬ অক্টোবর ২০২৬ দিবাগত রাত সোয়া দুইটার দিকে আগুন লাগে ঝলমলে। দুই ঘন্টার আগুনে পুড়ে ছাঁই হয়ে যায় শতবর্ষী পুরাকীর্তি স্থাপনাটি, যার সাথে হারিয়ে গেল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের চাক্ষুষ সাক্ষীটি।
গৌরীপুরের জমিদার পরিবারটি ছিল সংস্কৃতি অন্তপ্রাণ। ময়মনসিংহ অঞ্চলে সংস্কৃতির বিকাশে তাদের রয়েছে অনন্য অবদান। জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর একমাত্র পুত্র বীরেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী কলকাতায় অধ্যয়নকালীন সেখানকার ঐতিহ্যবাহী স্টার থিয়েটারের স্থাপত্যশৈলী ও কাঠামো দেখে মুগ্ধ হন। স্টার থিয়েটারের অনুকরণে তিনি বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে গৌরীপুরে নাট্যশালা প্রতিষ্ঠা করেন। নাট্যশালা প্রতিষ্ঠার পর এতে সর্বপ্রথম ঐতিহাসিক নাটক 'শাহজাহান' প্রদর্শিত হয়ে জননন্দিত হয়। 'শাহজাহান' নাটকের মূল দুই চরিত্রে অভিনয় করতে তৎকালীন কলকাতার বিশ্বখ্যাত দুই নাট্যাভিনেতা শিশির ভাদুড়ী ও অহীন্দ্র চৌধুরী সরাসরি গৌরীপুরে এসে মঞ্চ মাতিয়েছিলেন। দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা শিল্পী ও সংস্কৃতিজনদের পদচারণায় মুখরিত থাকত এই নাট্যশালাটি। এ অঞ্চলে সংস্কৃতি বিকাশের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠে নাট্যশালাটি।
জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে সরকারের মালিকানায় হস্তান্তর হয়। সরকার কর্তৃক এই নাট্যশালাটি সিনেমা প্রদর্শনের জন্য বিভিন্ন সময়ে লিজ প্রদান করা হয়। লিজ প্রদানের প্রথম দিকে এটি লিজগ্রহীতা কর্তৃক দেয়া 'গিরি সিনেমা হল' নামে পরিচিত ছিল। পরে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় 'প্রতিমা সিনেমা হল'। সর্বশেষে শতবর্ষী নাট্যশালাটি 'ঝলমল সিনেমা হল' নামে পরিচিতি পায়। ১৯৭৬ সালে শিল্পপতি কাজী মোশারফ হোসেন রতন এবং তাঁর স্ত্রী আনোয়ারা বেগম (বেগম আনোয়ারা) সরকারি নিয়ম মেনে এই নাট্যশালাটি লিজ গ্রহণ করেন সিনেমা হল হিসেবে ব্যবহারের জন্য। কাজী মোশারফ হোসেন রতন ও আনোয়ারা বেগম দম্পতি নিঃসন্তান হওয়ায়, বর্তমানে তাঁদের ১৬ জন ভাতিজা ও আত্মীয় (ফুফুর সূত্রে) এই লিজের যৌথ শরিক বা ওয়ারিশ হিসেবে রয়েছেন বলে জানা যায়। লিজের দলিলে জমির পরিমাণ উল্লেখ আছে ৮৮ শতাংশ। কিন্তুু বাস্তবে জমি রয়েছে ৬৮ শতাংশ। অবশিষ্ট ২০ শতাংশ জমি বিভিন্ন সময়ে বেহাত হয়ে গিয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে প্রকাশ। জমি ও লিজ সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে আদালতে মামলাও চলমান রয়েছে বলে জানা যায়। আবার লিজগ্রহীতারা নাট্যশালার সীমানা ঘেঁষে ১৬টি দোকান নির্মাণ করে ভাড়া দেয়।
২০০৫ সাল পর্যন্ত সিনেমা হল হিসেবে ব্যবহার করা হলেও ২০০৬ দর্শকসংখ্যা কমে যাওযার কারণ দেখিয়ে সিনেমা প্রদর্শনী বন্ধ করে দেয় লিজগ্রহীতারা। মূলত: তখন হতেই শুরু হয় এর অপব্যবহার। লিজগ্রহীতারা লিজের শর্ত ভঙ্গ করে বিভিন্ন ব্যবসার ব্যবসায়ীদের নিকট ভাড়া দেয়। ব্যবসায়ীরাও যাচ্ছেতাইভাবে অপব্যবহার করতে থাকে। কিন্তু প্রশাসন করেছে কি? সিনেমা হলের জন্য লিজ দেওয়া জমি কি কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা নিয়মিত তদারকি দেখভাল করেছে কি? প্রশাসন তা করেনি। হয় তারা অবহেলা করেছে, নয় যোগসাজশে জড়িত ছিল অবৈধ কামাইয়ের জন্য। তা নাহলে দীর্ঘ বছর অবৈধভাবে ব্যবহার হয় কিভাবে? আগুন লাগার সময় সিনেমা হলটি ধাহ্য গ্যাস সিলিন্ডারের গুদাম ও কাঠ চিড়াইয়ের কারখানা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন দায় এড়াতে পারে না। তারা দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা করেছে। এজন্য প্রশাসনের দায়ীদের চিহ্নিত করা উচিত। স্থানীয় প্রশাসন যদি লিজের শর্তানুযায়ী যথাযথ তদারকি করত তাহলে হলের ভেতরে ধায্য পদার্থ রাখা ও কাঠ চিড়াইয়ের কারখানা করার সুযোগ পেত না। ২০০৬ সালে যখন সিনেমা প্রদর্শনী বন্ধ হয়ে যায় তখন কেন লিজ বাতিল করা হয়নি? এই প্রশ্নের উত্তর কে দিবে? উত্তরটা প্রশাসনকেই দেয়া উচিত যেহেতু সিনেমা হলটি রাষ্ট্রের মালিকানাধীন। আগুনে ভষ্মীভূত হওয়ার পর সমালোচনার মূখে স্থানীয় প্রশাসন লিজগ্রহীতাদের শোকজ করেছে। প্রশাসনের যারা দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছে তাদের শোকজ করবে কে?
ভূমিখেকোরা যোগসাজশ করে সরকারি জমি গিলে ফেলতে সারাবছরই অপতৎপরতায় লিপ্ত থাকে। গিলে ফেলছেও বৈকি। সারাদেশেই এমন চিত্র দৃশ্যমান। গৌরীপুরেও একই চিত্র। শতবর্ষী নাট্যশালাটি সিনেমা হল হিসেবে লিজ দেয়ার নথিতে ৮৮ শতাংশ জমির উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে ৬৮ শতাংশ জমি রয়েছে। ২০ শতাংশ বেহাত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানায়। এই যে ২০ শতাংশ জমি বেহাত হলো সে ব্যাপারে প্রশাসন করেছেটা কি? তারা কি নজরদারী বা খোঁজখবর নিয়েছিল? বা কোন কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়েছিল কি? এছাড়া, ২০২৪ এর ০৫ আগস্টের পন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগে সিনেমা চত্বরটি কুচক্রী মহলের অবৈধ দখলে চলে যায়। এক্ষেত্রেও স্থানীয় প্রশাসন নির্লিপ্ততা দেখিয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে প্রশাসন কোনমতেই দায় এড়াতে পারে না।
গৌরীপুরের সচেতন নাগরিকদের সংগঠন ক্রিয়েশন এসোসিয়েশন হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি অ্যান্ড লাইব্রেরি, ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশন এবং এসিক এসোসিয়েশন দীর্ঘদিন ধরে গৌরীপুরের প্রত্নসম্পদ ও হেরিটেজ সাইটগুলো সংরক্ষণের জন্য আন্দোলন চালিয়ে আসছে এবং প্রতি বছর সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দিবস উদযাপন করে আসছে। বিভিন্ন সময়ে সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে শতবর্ষী নাট্যশালাটি সংরক্ষণের জন্য দাবী জানিয়েছিল। মতাদের দাবীর মধ্যে ছিল ঐতিহ্যবাহী এই থিয়েটার হলটিকে অবিলম্বে সরকারি পুরাকীর্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করণ,
নাট্যশালাটি রক্ষায় এর চারপাশে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের উদ্যোগে জরুরি সংস্কার কাজ
করে নাট্যশালাটিকে পুনর্গঠন ও পুনঃসাজিয়ে এর পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা। কিন্তু প্রশাসন ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সংগঠনগুলোর দাবীর প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপই করেনি। দাবীর আলোকে যদি কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হতো তাহলে আগুনের লেলিহান দৃশ্য দেশবাসীকে দেখতে হতো না। দুই ঘন্টার আগুনে পুড়ে ছাঁই হয়ে যেত না।
প্রশাসনের অবহেলা, যথাযথ তদারকি না করা এবং লিজগ্রহীতা ও দখলদারদের অপব্যবহারের কারণে পুড়ে ছাঁই হয়ে গেল শতবর্ষী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বারক পুরাকীর্তি নিদর্শন। আমরা মনে করি, ভষ্মীভূত হওয়ার সকল আয়োজন সম্পন্নকারী প্রশাসনের দুষ্ঠুচক্র এবংদায়ী লিজগ্রহীতা ও দখলদারদের চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি করা একান্ত জরুরি। ভষ্মীভূত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নাট্যশালা তথা সিনেমা হলটিতে তার আদলে ফিরিয়ে আনার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রকে উদ্যোগ নেয়া উচিত। রাষ্ট্রযন্ত্র সে উদ্যোগ গ্রহণ করবে কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়।
লেখক: সদস্য সচিব, পুরাকীর্তি সুরক্ষা কমিটি, ময়মনসংহ অঞ্চল।
১৩২ বার পড়া হয়েছে