সর্বশেষ

মতামত

চাই মতপার্থক্যের মধ্যেও ঐক্য

খাজা মাসুম বিল্লাহ কাওছারী
খাজা মাসুম বিল্লাহ কাওছারী

রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:১৩ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
ধর্মীয় মতপার্থক্য ও রাজনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে বিভেদ নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন সিনিয়র সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক খাজা মাসুম বিল্লাহ কাওছারী। তাঁর মতে, মতভিন্নতা থাকলেও সত্য, ন্যায় ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন অক্ষুণ্ণ রাখা জরুরি। ধর্মীয় নেতৃত্বের দায়িত্ব বিভেদের পরিবর্তে সংলাপ, প্রজ্ঞা ও মানবিকতার মাধ্যমে মুসলিম সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করা।
খাজা মাসুম বিল্লাহ কাওছারী

কাহলিল জিবরানের একটি উক্তি দিয়ে আজকের লেখাটি শুরু করি-
“মানুষ যখন ধর্মের নামে মানুষকে আঘাত করে, বিশ্বাসের নামে বিভক্ত হয়, আর সত্যের নামে রক্ত ঝরায়। তখন পরাজিত হয় না কোনো একটি দল, পরাজিত হয় সমগ্র মানবতা। কারণ, যে ধর্ম মানুষকে ভালোবাসতে শেখায় না, যে বিশ্বাস মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে না। সেই ধর্মের ব্যাখ্যায় কোথাও না কোথাও মানুষের বিবেক হারিয়ে গেছে।”

ইংরেজিতে একটি কথা এ ভাবে রয়েছে-
"Religious division turns brothers into enemies, faith into a weapon, and places of worship into battlegrounds. True faith unites hearts; fanaticism divides them.”

মানুষ যখন পথ হারায় তখন সে আলোর সন্ধান করে আর একটি জাতি যখন আদর্শিক সংকটে পড়ে, তখন সে পথপ্রদর্শকের দিকে তাকিয়ে থাকে। বিশেষত ধর্মীয় অঙ্গনে মানুষ যাঁদের কাছে সত্য, ন্যায়, প্রজ্ঞা ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষা প্রত্যাশা করে, তাঁদের বক্তব্য ও আচরণে মানুষ খুঁজে পেতে চায় প্রশান্তি, ঐক্য এবং সঠিক পথের দিশা। কিন্তু সেই প্রত্যাশার জায়গায় যখন বিতর্ক, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও বিভক্তির আশঙ্কা দেখা দেয়, তখন হৃদয়ের গভীর থেকে প্রশ্ন জাগে-

আঁধারে ঘিরিলো কোথা যাই বলো, কে দিবে আমারে পথ দেখাইয়া!

বাংলাদেশের মুসলিম সমাজ আজ নানা মত, পথ, মাজহাব ও ধর্মীয় ব্যাখ্যার বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলছে। মতপার্থক্য ইসলামের ইতিহাসে নতুন নয়। কিন্তু মতপার্থক্য যখন পরস্পরকে বোঝার পরিবর্তে পরস্পরকে অস্বীকার করার হাতিয়ার হয়ে ওঠে তখন তা শুধু ধর্মীয় পরিমণ্ডলকেই অস্থির করে না। বরং সাধারণ মুসলমানের মনেও সৃষ্টি করে সংশয় ও বিভ্রান্তি।

সম্প্রতি জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি হযরত মাওলানা আব্দুল মালেককে ঘিরে যেসব বক্তব্য ও বিতর্ক আলোচনায় এসেছে। ধর্মীয় নেতৃত্বের ভাষা কি মুসলিম উম্মাহর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ঐক্যকে শক্তিশালী করছে? নাকি মতপার্থক্যকে আরও তীব্র করে তোলার ঝুঁকি তৈরি করছে?
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট থাকা জরুরি যে কোনো বক্তব্যের সমালোচনা করতে হলে তার সঠিক প্রেক্ষাপট, পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে বিচার করতে হবে। কারও বক্তব্যকে যাচাই না করে চূড়ান্তভাবে দোষারোপ করা যেমন ন্যায়সংগত নয় ঠিক তেমনি ধর্মীয় পরিচয় বা পদমর্যাদার কারণে যুক্তিসংগত প্রশ্ন ও সমালোচনাকে উপেক্ষা করাও কাম্য নয়। ধর্মীয় নেতৃত্বের মর্যাদা যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতাও অপরিহার্য।


মতের অমিল নাকি বিভেদের রাজনীতি?

সাম্প্রতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর আদর্শ, দলটির সঙ্গে কওমি আলেমদের একাংশের রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং এ বিষয়ে খতিবের কঠোর সমালোচনা। ২০২৬ সালের ৬ অক্টোবর প্রকাশিত সংবাদে তাঁর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিতর্কের কথা উঠে আসে। পরবর্তী সময়ে ৯ অক্টোবর বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে বিক্ষোভ ও পাল্টা রাজনৈতিক স্লোগানের ঘটনাও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

এখানে প্রশ্নটি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করা কিংবা বিরোধিতা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্নটি আরও গভীর—একজন মুসলমানের রাজনৈতিক মত, সাংগঠনিক পরিচয় কিংবা কোনো আলেমের সঙ্গে মতভিন্নতা কি তাঁকে সামগ্রিকভাবে ‘পথভ্রষ্ট’ আখ্যা দেওয়ার যথেষ্ট কারণ হতে পারে? কোনো মতাদর্শের সমালোচনা অবশ্যই করা যায়, প্রয়োজনে কঠোর সমালোচনাও করা যায়। কিন্তু সেই সমালোচনার ভিত্তি হতে হবে সুস্পষ্ট যুক্তি, নির্ভরযোগ্য দলিল এবং ন্যায়বিচারের মানদণ্ড।
ধর্মীয় মতপার্থক্যের নিষ্পত্তি গালাগাল, অপবাদ, স্লোগান কিংবা সামাজিক বিদ্বেষ দিয়ে হয় না। হয় জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সংলাপ ও নৈতিক দায়বদ্ধতার মাধ্যমে।
বায়তুল মোকাররম কেবল একটি মসজিদ নয় এটি বাংলাদেশের অসংখ্য মুসলমানের আবেগ, বিশ্বাস ও ঐক্যের প্রতীক। সেই মসজিদের খতিবের বক্তব্য স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তাই তাঁর প্রতিটি বক্তব্যে সংযম, প্রজ্ঞা ও বৃহত্তর মুসলিম সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রত্যাশা থাকা অযৌক্তিক নয়। একই সঙ্গে তাঁর বক্তব্যের সমালোচকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। কোনো বিতর্কের প্রতিক্রিয়ায় বিদ্বেষমূলক স্লোগান, উত্তেজনা কিংবা প্রতিপক্ষকে হেয় করার প্রবণতা সমস্যার সমাধান নয়।

আমরা কি ভুলে যাচ্ছি যে আমাদের কিবলা এক, আমাদের কোরআন এক, আমাদের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এবং আমাদের মৌলিক ঈমানের ভিত্তি অভিন্ন?

মুসলিম সমাজে ফিকহি মতপার্থক্য আছে, ধর্মীয় ব্যাখ্যার পার্থক্য আছে, রাজনৈতিক চিন্তার বৈচিত্র্যও আছে। কিন্তু এসব পার্থক্যের ঊর্ধ্বে রয়েছে ন্যায়, ভ্রাতৃত্ব, পারস্পরিক মর্যাদা ও মানবিক দায়িত্ববোধ। মতভেদ থাকলেই সম্পর্কচ্ছেদ করতে হবে, ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান নিলেই কাউকে ধর্মীয়ভাবে প্রত্যাখ্যান করতে হবে, এমন মানসিকতা উম্মাহর ঐক্যকে দুর্বল করে।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” (সুরা আলে ইমরান, ৩:১০৩)।

ঐক্য মানে সব বিষয়ে একই মত পোষণ করা নয় বরং মতপার্থক্যের মধ্যেও সত্য, ন্যায় ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন অক্ষুণ্ণ রাখা।

হযরত মাওলানা আজিজুর রহমান নেছারাবাদী (কায়েদ সাহেব হুজুর রহ:) মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের জন্য একটি ডাক দিয়েছিলেন-
"আল-ইত্তেহাদু মা-আল এখতেলাফ" মানে মতপার্থক্যের মধ্যেও ঐক্যবদ্ধতা।

আমাদের আরও গভীর ভাবে ভাবতে হবে যখন মুসলিম সমাজের শক্তি পারস্পরিক বিতর্কে ক্ষয় হয়, তখন শিক্ষা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, দুর্নীতি, সামাজিক অবিচার এবং নৈতিক অবক্ষয়ের মতো জরুরি সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করার শক্তি কোথায় থাকে? যে ধর্ম মানুষের কল্যাণ, ন্যায়বিচার ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষা দেয়। সেই ধর্মের অনুসারীরা যদি পরস্পরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে তবে বৃহত্তর সমাজ কী বার্তা পাবে?

পথপ্রদর্শক চাই বিভেদের প্রাচীর নয়:

একজন প্রকৃত আলেমের মর্যাদা তাঁর জ্ঞানের গভীরতায় যেমন, তেমনি তাঁর প্রজ্ঞা, বিনয়, ন্যায়পরায়ণতা ও মানুষের হৃদয়ে সত্যের আলো পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতায়ও। আলেমের কাজ কেবল ভুল চিহ্নিত করা নয়, ভুলের সংশোধনের পথ দেখানোও। মতভিন্নতার কারণে দূরত্ব তৈরি হলে সেই দূরত্ব কমানোর উদ্যোগ নেওয়া। উত্তেজনার সময় সংযমের শিক্ষা দেওয়া এবং সত্যের প্রশ্নে ব্যক্তিগত বা দলীয় আবেগের ঊর্ধ্বে থাকা। এসবও ধর্মীয় নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

মুফতি আব্দুল মালেকের বক্তব্যের সঙ্গে কারও দ্বিমত থাকলে তিনি তথ্য, দলিল ও যুক্তির ভিত্তিতে সেই দ্বিমত প্রকাশ করতে পারেন, করাটাই যৌক্তিক। একইভাবে তাঁর বক্তব্যের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তারও শান্তিপূর্ণ ও জ্ঞানভিত্তিক পর্যালোচনা হওয়া উচিত। কাউকে অন্ধভাবে অনুসরণ করা যেমন সমাধান নয়, তেমনি যাচাই না করে নিন্দা করাও ন্যায়ের পথ নয়।

ধর্মীয় বিতর্কের কারণে মসজিদের পবিত্র পরিবেশ রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রে পরিণত হোক আমরা কোনক্রমেই তা চাই না । আমরা চাই, মসজিদের মিম্বর থেকে উচ্চারিত হোক সত্য, ন্যায়, তাকওয়া, মানবিকতা ও উম্মাহর কল্যাণের বাণী। আমরা চাই, আলেমরা মতপার্থক্য সত্ত্বেও পরস্পরের সঙ্গে আলোচনায় বসুন, সাধারণ মুসলমানকে বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করুন এবং বিভাজনের পরিবর্তে ঐক্যের সেতু নির্মাণ করুন।
কারণ, ধর্মের নামে বিভক্তি বাড়ানো সহজ কিন্তু বিভক্ত হৃদয়গুলোকে একত্র করা বড়ই কঠিন। আর সেই কঠিন কাজটিই আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

আজ মুসলিম উম্মাহর প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যারা মানুষকে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করাবেন না বরং সত্যের আলোয় সবাইকে আত্মসমালোচনার সাহস দেবেন। এমন আলেম, যারা মতের পার্থক্যকে জ্ঞানের আলোচনায় রূপান্তর করবেন। এমন রাজনৈতিক নেতৃত্ব, যারা ধর্মীয় আবেগকে বিভেদের অস্ত্র না বানিয়ে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাবেন।

আমরা কারও অন্ধ অনুসারী হতে চাই না। আমরা হতে চাই সত্যের অনুসারী। আমরা কারও প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতে চাই না। আমরা চাই ন্যায়ের ভিত্তিতে মতপ্রকাশের অধিকার। আমরা বিভক্তির রাজনীতি চাই না আমরা চাই মর্যাদা, সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ একটি সচেতন মুসলিম সমাজ।

আজ তাই হৃদয়ের গভীর থেকে আবারও উচ্চারিত হয়-
আঁধারে ঘিরিলো কোথা যাই বলো, কে দিবে আমারে পথ দেখাইয়া!

হে আল্লাহ! আমাদের অন্তর থেকে অহংকার, বিদ্বেষ ও অন্ধ দলীয় আনুগত্য দূর করে দাও। আমাদের সত্যকে সত্য হিসেবে চেনার, তা গ্রহণ করার এবং ভুলকে ভুল হিসেবে উপলব্ধি করে তা সংশোধন করার তাওফিক দাও। আমাদের আলেমদের প্রজ্ঞা, নেতৃত্বকে ন্যায়পরায়ণতা এবং মুসলিম উম্মাহকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ঐক্যের পথে পরিচালিত করো।

আমরা বিভেদের অন্ধকার চাই না, আমরা চাই সত্যের আলো। আমরা শত্রুতার দেয়াল চাই না, আমরা চাই ভ্রাতৃত্বের সেতু। আমরা পথ হারাতে চাই না, আমরা চাই এমন পথপ্রদর্শক, যাঁর হাতে থাকবে জ্ঞানের আলো, হৃদয়ে থাকবে আল্লাহভীতি, আর কর্মে থাকবে সমগ্র মানবতার কল্যাণ।


লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, লেখক, গবেষক, বেসরকারি গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক।

১২২ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০