বরিশালে স্বামীর মানসিক নির্যাতনে মেধাবী ছাত্রী ঝুমুরের বিষপানে মৃত্যু
বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬ ৬:৫৯ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
বরিশালের আগৈলঝাড়ায় স্বামীর মানসিক নির্যাতনের অভিযোগের মধ্যে বিষপান করা ঝুমুর খানম সেতু (নাম) মারা গেছেন। ঢাকার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার (৫ অক্টোবর) বিকেল পাঁচটার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১০টার দিকে জানাজা শেষে বাবার বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়েছে।
মেধাবী ছাত্রী ঝুমুর খানম সেতু বরিশাল সরকারি বজ্রমোহন (বিএম) কলেজ থেকে মাস্টার্স পাস করেছিলেন। পরিবারের সম্মতিতে পরে তাঁর বিয়ে হয় গৌরনদী পৌর এলাকার চরগাধাতলী এলাকার মৃত হারুন কাজীর ছেলে শাহারিয়া কাজী ওরফে শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে।
ঝুমুরের বাবা আব্দুল করিম খানের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই তাঁর মেয়েকে স্বামী শাহারিয়া, শাশুড়ি রুনু বেগম, নাজমিন বেগম, শারমিন ও রিয়া খানম এবং নাজমিনের স্বামী সাইদুল হাওলাদার কারণে-অকারণে মানসিক নির্যাতন করতেন। শাহারিয়া বর্তমানে কর্মসূত্রে কুয়েতে থাকেন। দেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের প্ররোচনায় মেয়ের ওপর তাঁর মানসিক নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায় বলে অভিযোগ করেন করিম খান।
একপর্যায়ে ঝুমুরকে তাঁর একমাত্র মেয়েসহ স্বামীর বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। এরপর মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন তিনি।
করিম খান বলেন, বিয়ের সময় পর্যাপ্ত মালামাল না দেওয়া, পাঁচশ বরযাত্রী না আনা এবং ঝুমুর দেখতে সুন্দরী নন—এমন নানা অজুহাতে শাহারিয়া ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে তাঁকে মানসিকভাবে নির্যাতন করে আসছিলেন।
পরিবারের অভিযোগ, গত ৪ অক্টোবর দিবাগত রাতে ভিডিও কলে ঝুমুরকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন তাঁর স্বামী। একপর্যায়ে তাঁকে বিষপান করে মারা যেতে বলেন শাহারিয়া। স্বামীর এমন আচরণে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে পরিবারের সদস্যদের অজান্তে ঝুমুর বিষপান করেন বলে অভিযোগ পরিবারের।
মুমূর্ষু অবস্থায় ঝুমুরকে প্রথমে আগৈলঝাড়া উপজেলা হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে ওই রাতেই তাঁকে বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে সোমবার (৫ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। স্বজনেরা দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে ঢাকা নিয়ে ভর্তি করেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই দিন বিকেল পাঁচটার দিকে ঝুমুরের মৃত্যু হয়।
ঝুমুরের ময়নাতদন্ত শেষে তাঁর লাশ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। রাত নয়টার দিকে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স তাঁর বাবার বাড়ি আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা ইউনিয়নের উত্তর শিহিপাশা গ্রামের আব্দুল করিম খানের বাড়িতে পৌঁছায়। এ সময় স্বজনদের কান্নায় সেখানে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েন এলাকাবাসী।
মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১০টার দিকে জানাজা শেষে বাবার বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে ঝুমুরকে দাফন করা হয়। জানাজায় উপস্থিত স্থানীয় লোকজন ও পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, পরিকল্পিতভাবে মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে ঝুমুরকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। তাঁরা ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, বিষপানের পর তিনটি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া থেকে শুরু করে মৃত্যু ও দাফন পর্যন্ত ঝুমুরের স্বামীর পরিবারের কেউ তাঁর পাশে ছিলেন না।
আগৈলঝাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মাসুদ খান বলেন, পুরো বিষয়টি তদন্তাধীন। এ ঘটনায় পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগের বিষয়ে ঝুমুরের স্বামী শাহারিয়া কাজী ওরফে শাহাবুদ্দিনের পরিবারের কেউ কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
ঝুমুরের পরিবার আরও জানায়, কয়েক মাস আগে তাঁর ২০ বছর বয়সী একমাত্র ভাই ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ভাইয়ের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই ঝুমুরের অস্বাভাবিক মৃত্যুতে পরিবার ও এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
১৮২ বার পড়া হয়েছে