ধূমকেতুর দহন ও নীলোৎপল অশ্রু: নজরুলের বিরহ-তত্ত্বের এক মরমী অবগাহন
মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬ ৩:০০ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যজগতে বিরহ কেবল ব্যক্তিগত প্রেম-বিচ্ছেদের বেদনা নয়; এটি প্রেম, আধ্যাত্মিকতা, প্রকৃতি, একাকিত্ব ও বিদ্রোহের এক গভীর মরমী সমন্বয়। নার্গিসের সঙ্গে অসমাপ্ত সম্পর্ক, পুত্র বুলবুলের অকালমৃত্যু, বৈষ্ণব বিরহ-তত্ত্ব ও সুফি দর্শনের প্রভাব—সব মিলিয়ে নজরুলের বিরহী সত্তা তাঁর সৃষ্টিশীলতার এক গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে।
নজরুলের বিরহকে বুঝতে গেলে তাঁর জীবনের সেই সব ধূসর বাঁকগুলোর দিকে তাকাতে হয়, যেখানে ভাগ্য বারবার তাঁর সাথে লুকোচুরি খেলেছে। ১৯২১ সালের সেই বৃষ্টিভেজা দৌলতপুরের কথা ভাবা যাক। নার্গিস আসার খানমের সঙ্গে সেই যে এক অসমাপ্ত বাসর বা বিচ্ছেদের গল্প তা কি কেবল একজন কবির ব্যর্থ প্রেম ছিল? হয়তো না। সেটি ছিল নজরুলের রোমান্টিক জগতের প্রথম বড় রকমের ভাঙন। এই ভাঙনই তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিল ‘অভিশাপ’-এর মতো কবিতা। সেখানে তিনি লিখছেন, “আমার কন্ঠ রুদ্ধ করিবে তোমারই দেওয়া মালা / তোমারই অগ্নি দহিবে তোমারে দিবে অসহ জ্বালা”। এই চরণে কি শুধুই প্রতিহিংসা? না, এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক একাকী মানুষের আর্তনাদ। প্রমিলার সঙ্গে ঘর বাঁধলেও নজরুলের কপালে শান্তির তিলক বোধহয় বিধাতা খুব বেশিদিন স্থায়ী হতে দেননি। প্রিয় পুত্র বুলবুলের অকাল বিদায় কবিকে এমন এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিল, যেখানে দাঁড়িয়ে জগৎ আর জীবন দুটোকেই বড় তুচ্ছ মনে হয়। সেই সময়কার নজরুলের গান বা কবিতা পড়লে মনে হয়, তিনি যেন এই মর্ত্যলোকের কেউ নন; তিনি অন্য কোনো এক হাহাকারের দেশের বাসিন্দা।
নজরুলের এই বিরহী রূপটি কিন্তু কেবল কান্নাকাটির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে এক গভীর দার্শনিক ভিত্তি। তিনি একদিকে যেমন বৈষ্ণব পদাবলীর সেই চিরন্তন রাধা-তত্ত্বের রস আস্বাদন করেছিলেন, অন্যদিকে ডুবেছিলেন সুফি দর্শনের ‘ইশক-এ-হকিকি’ বা স্রষ্টার প্রতি নিঃশর্ত প্রেমের অতলে। বৈষ্ণব দর্শনে রাধার যে বিরহ, তা তো কেবল কৃষ্ণের জন্য তৃষ্ণা নয়, তা আসলে জীবাত্মার পরমাত্মার সঙ্গে মিলিত হওয়ার এক ব্যাকুল আর্তি। নজরুল এই তত্ত্বকে নিজের যন্ত্রণার সঙ্গে এমনভাবে মিশিয়ে দিলেন যে, তাঁর বিরহ আর ব্যক্তিগত রইল না, তা হয়ে উঠল বিশ্বজনীন। আবার সুফিদের সেই ‘ফানা’ বা নিজেকে বিলীন করে দেওয়ার যে সাধনা, নজরুলের কবিতায় তার ছোঁয়া পাওয়া যায় পদে পদে। তিনি যখন লেখেন, “পাসরিতে চাহি যারে সে কেন স্মরণে আসে / যত দূরে যাই কেন সে রয় আশেপাশে” তখন বোঝা যায়, এই প্রিয়তমা কেবল কোনো রক্ত-মাংসের মানবী নন, বরং এক অধরা সত্য বা সৌন্দর্যের প্রতীক। ফরাসি দার্শনিকেরা যাকে বলেন ‘ডিজায়ার’ বা চিরন্তন বাসনা, নজরুলের কাব্যে সেই বাসনাই এক সৃজনশীল বিরহের রূপ নিয়েছে।
নজরুলের বিরহ-চেতনায় প্রকৃতির ভূমিকা যেন এক নীরব সাক্ষী। বিশেষ করে নজরুলের বর্ষা-বন্দনা বা ‘শাওন’ নিয়ে লেখা গানগুলোর আভিজাত্য বাংলা সাহিত্যে সত্যিই দুর্লভ। মহাকবি কালিদাসের ‘মেঘদূত’-এর যক্ষ যখন মেঘের মাধ্যমে প্রিয়ার কাছে খবর পাঠাত, নজরুলের বিরহী মনও যেন সেই মেঘের পিঠেই সওয়ার হতো। “শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে” এই একটি লাইনের মধ্যেই কী এক অদ্ভুত মায়া আর রিক্ততা মিশে আছে। ২০২৬ সালের এই হাইপার-কানেক্টেড দুনিয়ায়, যেখানে বৃষ্টির ছাঁট থেকে বাঁচতে আমরা দ্রুত জানালার কাঁচ তুলে দিই বা স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকি, সেখানে নজরুলের এই সুরগুলো হঠাৎ কানে এলে যেন সব যান্ত্রিকতা ফিকে হয়ে যায়। নজরুল প্রকৃতিকে শুধু দেখেননি, তিনি প্রকৃতির রিক্ততার সাথে নিজের বুকের ভেতরের শূন্যতাকে মিলিয়ে দিয়েছেন। শরৎ কিংবা শীতের ঝরা পাতাও তাঁর কাছে এক চিরন্তন বিচ্ছেদের রূপক হিসেবে ধরা দিয়েছে। এটি যেন এক প্রকার অস্তিত্ববাদী দর্শন যেখানে মানুষ বুঝতে পারে যে, শেষ পর্যন্ত সে একা এবং এই একাকিত্বই তার সবচাইতে বড় সম্পদ।
বিদ্রোহ আর বিরহ এই দুটি বিষয়কে নজরুলের কাব্যে কি আলাদা করা সম্ভব? হয়তো না। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতাকে যদি কেউ নিবিড়ভাবে পাঠ করে, তবে সেখানেও এক অদ্ভুত বিষণ্নতা খুঁজে পাওয়া যাবে। “আমি বিঁধিল-বিদীর্ণ হিয়া শ্মশান, আমি নিশীথ-বেলার হাহাকার” এই লাইনগুলো কি কোনো বিজয়ী বীরের আস্ফালন? না, এ হলো এক চূর্ণ-বিচূর্ণ হৃদয়ের সত্য প্রকাশ। তাঁর বিদ্রোহ ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে, আর তাঁর বিরহ ছিল সুন্দরের জন্য। একটি ছিল বাইরের জগতের সাথে লড়াই, অন্যটি ছিল নিজের আত্মার ভেতরের দহন। থিওডোর অ্যাডর্নোর মতো দার্শনিকেরা বলেন যে, শ্রেষ্ঠ শিল্প সবসময় এক প্রকার নেতিবাচক দ্বান্দ্বিকতার মধ্য দিয়ে সত্যকে প্রকাশ করে। নজরুলও তাঁর বিরহের নীল দহনকে বিদ্রোহের অগ্নিতে রূপান্তর করেছিলেন। তাই তাঁর বিরহ যত গভীর হয়েছে, তাঁর বিদ্রোহের সুরও তত তীব্র হয়েছে।
নজরুল গীতি, বিশেষ করে তাঁর গজলগুলোর কথা না বললে তাঁর বিরহী সত্তার আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। পারস্যের মরমী কবিদের ঢঙে তিনি বাংলা গানে যে বিষাদ আর আভিজাত্য এনেছিলেন, তা বাংলা সংগীতের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত। তিনি যখন ছায়ানট বা দোলনচাঁপা রাগের প্রয়োগ করেন, তখন সেই সুরের ভাঁজে ভাঁজে বিচ্ছেদের এক অতীন্দ্রিয় প্রশান্তি টের পাওয়া যায়। নজরুলের কাছে বিরহ মানে কেবল বিলাপ করা নয়, এটি ছিল এক প্রকার তপশ্চর্যা। তাঁর গানের সেই ‘প্রিয়া’ বা ‘প্রিয়তমা’ প্রায়শই কোনো পার্থিব মানবী নয়, বরং এক পরম সত্যের ছায়া। রবীন্দ্রনাথের বিরহ যেখানে এক শান্ত, স্নিগ্ধ আর ধ্রুপদী রূপ নেয়, নজরুলের বিরহ সেখানে অনেক বেশি আবেগময়, ঝোড়ো হাওয়া আর উথাল-পাথাল। রবীন্দ্রনাথের দুঃখ যেন নদীর ধীর লয়ের ঢেউ, আর নজরুলের দুঃখ হলো সমুদ্রের সেই বিশাল গর্জন যা তীরে আছড়ে পড়ে নিজেকে চূর্ণ করতে চায়।
বর্তমান এই ২০২৬ সালের যান্ত্রিক প্রেক্ষাপটে নজরুলের বিরহ-তত্ত্ব কেন এত জরুরি? আজকের এই ‘ডিজিটাল লোনলিনেস’ বা স্ক্রিনের আড়ালের নির্জনতার যুগে আমরা হয়তো বাহ্যিকভাবে অনেক মানুষের সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু অন্তরে বড্ড বেশি একা। এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কালে অনুভূতির যখন কোনো যান্ত্রিক ব্যাখ্যা খোঁজা হয়, তখন নজরুলের ‘নিভৃত হাহাকার’ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষ হওয়া মানেই হলো ব্যথা পাওয়ার ক্ষমতা রাখা। নজরুলের বিরহ আমাদের শেখায় যে, যা আমরা পাইনি, সেই না-পাওয়ার বেদনাও এক প্রকার পরম পাওয়া হতে পারে। তাঁর কবিতা ও গান মানুষকে পুনরায় তার ভেতরের সেই আদিম ও কোমল মানুষটির কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। মানবিক সংযোগের যে অভাব আজ পৃথিবী জুড়ে হাহাকার তুলছে, নজরুলের কাব্য সেখানে যেন এক শীতল চন্দন।
নারীর প্রতি নজরুলের দৃষ্টিভঙ্গিও তাঁর বিরহের এক বড় অনুষঙ্গ। নজরুলের কাব্যে নারী কখনো মানসী, কখনো দুঃখিনী মা, আবার কখনো সেই অধরা স্বপ্ন। তাঁর প্রেমের কেন্দ্রে যে নারী থাকেন, তিনি প্রায়শই বাস্তব জগতের ধরা-ছোঁয়ার বাইরের এক প্রেরণা। ইতালীয় কবি দান্তের কাব্যে যেমন বিয়াত্রিচ ছিলেন এক দৈব অনুপ্রেরণা, নজরুলের কাছেও বিরহিণী নারী ছিল তাঁর সৃজনের মূল চাবিকাঠি। বিরহ এখানে নারীকে শরীরী গণ্ডি থেকে মুক্ত করে এক আধ্যাত্মিক উচ্চতায় বসিয়ে দেয়। নজরুলের বিরহী মন হয়তো বুঝত যে, মিলন মানেই এক প্রকার সমাপ্তি বা স্থবিরতা, আর বিচ্ছেদ মানেই হলো অনন্ত যাত্রা। বিচ্ছেদই কবিকে প্রতি মুহূর্তে সৃষ্টিশীল রাখে, প্রতি মুহূর্তে নতুন করে জ্বলে উঠতে সাহায্য করে।
নজরুলের কাব্যতত্ত্বে বিরহের এই বহুস্তরীয় রূপটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি শেষ পর্যন্ত এক বিষাদগ্রস্ত কিন্তু অপরাজেয় মানুষের প্রতিচ্ছবি। তিনি শিখিয়েছেন, হৃদয়ের রক্তক্ষরণ থেকেই শ্রেষ্ঠ সুরের জন্ম হয়। নজরুল বিরহকে কোনো অভিশাপ ভাবেননি, বরং একে হৃদয়ের শুদ্ধিকরণ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এই যে আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও তাঁর গান শুনলে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে, তা কি কেবল সুরের কারসাজি? মোটেও না। এটি হলো সেই চিরন্তন মানুষের আর্তি, যা নজরুল তাঁর কাব্যে অমর করে গেছেন।
কাজী নজরুল ইসলামের বিরহী সত্তা তাঁর বিদ্রোহী রূপেরই এক অদৃশ্য বর্ম। অগ্নিবীণার সেই আগুনের তারটি যখন ছিঁড়ে যায়, তখনই সেখান থেকে বেরিয়ে আসে অশ্রুমালার মুক্তো। নজরুল কেবল সাম্য বা যুদ্ধের কবি নন, তিনি মানুষের সেই ধ্রুপদী একাকিত্ব আর মহাজাগতিক বিষণ্নতার এক প্রবাদপ্রতিম কারিগর। তাঁর বিরহের নীল দহনই তাঁকে করে তুলেছে ‘মাটির কবি’, ‘মানুষের কবি’। নজরুলকে বুঝতে হলে তাঁর সেই বজ্রনির্ঘোষ হুঙ্কারের পাশাপাশি তাঁর নিভৃত হৃদয়ের ফিসফিসানিকেও শুনতে হবে। হয়তো এই বিরহের তপশ্চর্যায় মগ্ন ছিলেন বলেই তিনি বলতে পেরেছিলেন “মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণতূর্য”। এই বাঁশরীই হলো তাঁর বিরহ, যা ছাড়া রণতূর্যের হুঙ্কার হয়তো কেবল চিৎকারেই পর্যবসিত হতো। নজরুলের বিরহ এক অন্তহীন প্রার্থনা, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের হৃদয়ে এক শান্ত শীতল ছায়া দিয়ে যাবে। দিনশেষে, এই বিরহই হয়তো মানুষকে মানুষ হিসেবে টিকিয়ে রাখে মেশিন থেকে আলাদা করে। নজরুল সেই অমেয় বিরহেরই এক রাজপুত্র।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।
১২৩ বার পড়া হয়েছে