সর্বশেষ

সাহিত্য

মৃত্তিকার লিপি ও এক নির্জন জাতকবির আখ্যান

আবদুল হাই মাশরেকীর শিল্প-সাধনার নন্দনতাত্ত্বিক মানচিত্র

গাউসুর রহমান
গাউসুর রহমান

সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০:১৩ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
বাংলার মাটি, মানুষ, প্রকৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যকে সৃষ্টিশীলতার কেন্দ্রে রেখে নিজস্ব সাহিত্যভুবন নির্মাণ করেছিলেন আবদুল হাই মাশরেকী। কবিতা, নাটক, পুঁথি, জারি-সারি, ভাটিয়ালি ও মুর্শিদি গান থেকে সাংবাদিকতা—বহুমাত্রিক শিল্পচর্চায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলার প্রান্তিক মানুষের জীবন ও স্বপ্নের এক নিবেদিত শিল্পী। প্রচারের আড়ালে থাকা এই নিভৃতচারী স্রষ্টার শিল্প-সাধনা, মানবতাবাদ ও লোকজ সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা আজও বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।
গাউসুর রহমান

বাংলার মানচিত্রজুড়ে ছড়িয়ে আছে কত শত নদী, কত সহস্র পলিমাটির ঘ্রাণ। এই মাটির সোঁদা গন্ধ আর নদীর কলতানের ভেতরেই মিশে থাকে এক প্রচ্ছন্ন সৃজনী শক্তি, যা মাঝে মাঝে কোনো এক বিশেষ আধারে রূপ পায়। বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের আকাশপটে আবদুল হাই মাশরেকী তেমনই এক নাম, যিনি কোনো উচ্চকিত প্রচারের ডামাডোলে নিজেকে বিলিয়ে দেননি; বরং শরতের মেঘের মতো শান্ত চরণে বাংলার লোকজ জীবনের আঙিনায় ছড়িয়ে দিয়েছেন তাঁর সৃজনী সুধা। তাঁকে কেবল একজন কবি, নাট্যকার কিংবা লোক-গবেষক বললে তাঁর প্রতিভার বিশালতাকে এক সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ করা হয়। তিনি ছিলেন মূলত এক চিরন্তন জীবনশিল্পী, যাঁর কলমে ধরা দিয়েছিল বাংলার খেটে খাওয়া মানুষের দীর্ঘশ্বাস, ফসলের মাঠের স্বপ্ন আর প্রকৃতির সাথে মানুষের সেই আদিম ও অকৃত্রিম সখ্য।

ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র-বিধৌত জনপদে যাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে, তাঁর রক্তে ও মননে পলিমাটির উর্বরতা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আবদুল হাই মাশরেকী সেই মাটিকে কেবল স্পর্শই করেননি, তিনি মাটির গভীরে প্রোথিত শিকড়কে চিনতে পেরেছিলেন। তাঁর জীবন ও সাহিত্যের পটে কান পাতলে শোনা যায় এক মরমী বাঁশির সুর, যা কখনও যান্ত্রিক নগরায়নের কৃত্রিমতায় ম্লান হয়নি। আজকের এই দ্রুতধাবমান যান্ত্রিক সময়ে দাঁড়িয়ে যখন মানুষ নিজের আত্মপরিচয়ের সংকটে ভোগে, তখন মাশরেকীর সাহিত্য এক শীতল ছায়ার মতো আমাদের তৃষিত আত্মাকে প্রশান্তি দেয়।

ফরাসি দার্শনিক জঁ-জাক রুশো একদা আহ্বান জানিয়েছিলেন ‘প্রকৃতির দিকে ফিরে যাও’। মাশরেকীর সাহিত্যের মূল সুরটিও ছিল ঠিক তাই, তবে তা কোনো তাত্ত্বিক বাধ্যবাধকতা থেকে নয়, বরং এক স্বতঃস্ফূর্ত অনুরাগ থেকে। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘মাঠের ফুল’-এর কথা ভাবলে মনে হয়, তিনি যেন প্রতিটি ঘাসের ডগার ভাষা বুঝতেন। নাগরিক কবিরা যখন উদ্যান বা কৃত্রিম বাগানের সৌন্দর্যে মোহিত হতেন, মাশরেকী তখন অবহেলিত ঘাসফুল বা ধুলোমাখা মেঠো পথের ভেতরেই খুঁজে পেতেন নন্দনতত্ত্বের সার্থকতা।

তাঁর কবিতায় প্রকৃতি ও মানুষ আলাদা কোনো সত্তা নয়। কিষাণীর মলিন আঁচল যখন বাতাসের হিল্লোলে ওড়ে, তখন তা যেন মাঠের কাশবনের দোলাকেই প্রতিধ্বনিত করে। তাঁর একটি পঙক্তিতে তিনি বলেছিলেন ‘মাঠের ফুল আমি ফুটেছি অনাদরে, বনের ছায়ায় আমার ঘর’। এই যে অনাদরের ফুল হয়ে ফুটে থাকার তৃপ্তি, এটাই ছিল তাঁর দর্শনের মূল কেন্দ্রবিন্দু। তিনি প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর হতে চেয়েছিলেন, যাঁদের ভাষা আভিজাত্যের মোড়কে ঢাকা পড়েনি। সামাজিক কাঠামোর একদম নিচতলার সেই মানুষগুলোর জীবনসংগ্রামকে তিনি শিল্পের এক সুউচ্চ বেদিতে আসীন করেছেন। ইতালীয় চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশি যে ‘অরগানিক ইন্টেলেকচুয়াল’ বা শেকড়-সংলগ্ন বুদ্ধিজীবীর কথা বলেছিলেন, মাশরেকী ছিলেন তাঁর এক সার্থক উদাহরণ। তিনি কোনো ওপরতলার ড্রয়িংরুমে বসে গ্রাম দেখেননি, বরং তিনি ছিলেন গ্রামেরই আত্মা।

মাশরেকীর নাট্যচিন্তা ছিল তৎকালীন সময়ের চেয়েও অনেক বেশি আধুনিক ও বাস্তবধর্মী। তাঁর ‘নতুন গাঁয়ের কাহিনী’ নাটকটি যদি আমরা ব্যবচ্ছেদ করি, তবে দেখব সেখানে গ্রামীণ সমাজকাঠামোর এক নির্মোহ চিত্র ফুটে উঠেছে। নাটকটি কেবল বিনোদনের অনুষঙ্গ ছিল না, বরং ছিল গ্রামীণ মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যকার টানাপোড়েনের এক দালিলিক প্রমাণ।

অনেকে তাঁর এই সমাজচিন্তাকে মার্কসীয় দর্শনের সাথে তুলনা করেন। তবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, মাশরেকী কোনো নির্দিষ্ট ‘ইজম’ বা তকমার কাছে দায়বদ্ধ ছিলেন না। তাঁর দায়বদ্ধতা ছিল সাধারণ মানুষের কাছে। তাঁর নাটকে যে শ্রেণি সংগ্রামের সুর বেজে ওঠে, তা কোনো তাত্ত্বিক কচকচানি নয়, বরং তা ছিল শোষিতের আর্তনাদ। তিনি যখন লেখনী ধারণ করতেন, তখন যেন তাঁর কলম হয়ে উঠত কৃষকের লাঙল কিংবা শ্রমিকের হাতুড়ি। অবিভক্ত বাংলার সেই উত্তাল সময়ে তিনি নাটকের মাধ্যমে সমাজের জঞ্জাল দূর করার এক নীরব আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। ‘সাঁকো’র মতো নাটকগুলোতে তিনি সামাজিক সম্পর্কের যে জটিল বুনন তৈরি করেছেন, তা আজও সমাজতাত্ত্বিকদের কাছে এক অমূল্য গবেষণার বিষয়।

বাংলা লোকসাহিত্যের প্রাঙ্গণে মাশরেকীর পদচারণা ছিল রাজকীয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির প্রাণের স্পন্দন লুকিয়ে থাকে তার লোকজ ঐতিহ্যের ভেতরে। পুঁথি সাহিত্যকে তিনি যে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন, তা আধুনিক বাংলা সাহিত্যে বিরল। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘দুঃখু মিয়ার পুঁথি’র কথাই ধরা যাক। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনকে তিনি পুঁথির ছন্দে যেভাবে বেঁধেছেন, তা একদিকে যেমন ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, অন্যদিকে সৃজনশীলতার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।

মিখাইল বাখতিন যেমন ‘বহুস্বরবাদ’-এর কথা বলেছিলেন, মাশরেকীর পুঁথিতেও আমরা সেই প্রান্তিক মানুষের বহুবিধ কণ্ঠস্বরের দেখা পাই। তিনি গ্রামীণ মানুষের মুখের ভাষাকে সাহিত্যের আঙিনায় এক রাজকীয় মর্যাদা দান করেছেন। জসীমউদ্দীন যেমন গ্রাম বাংলার বিরহ ও বেদনাকে এক রোমান্টিক আবহে তুলে ধরেছিলেন, মাশরেকী সেখানে ছিলেন আরও বেশি প্রত্যক্ষ ও রূঢ় বাস্তববাদী। তাঁর লোকগাঁথাগুলো কেবল গল্প নয়, বরং তা ছিল বাংলার লোকজীবনের এক চলমান ইতিহাস। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, পশ্চিমী সাহিত্যের অন্ধ অনুকরণে বাঙালির মুক্তি নেই, বরং মুক্তি আছে নিজের শিকড়ের সেই চেনা সুরের ভেতরে।

“আল্লাহ মেঘ দে পানি দে, ছায়া দে রে তুই” এই গানটি শোনেনি এমন বাঙালি হয়তো খুঁজে পাওয়া ভার। কিন্তু এই কালজয়ী সৃষ্টির কারিগর যে আবদুল হাই মাশরেকী, তা আধুনিক প্রজন্মের অনেকেই হয়তো জানেন না। এই একটি গানই তাঁর অমরত্বের জন্য যথেষ্ট ছিল। গ্রাম বাংলার চিরায়ত অনাবৃষ্টির হাহাকার, প্রকৃতির কাছে মানুষের আকুল প্রার্থনা আর এক গভীর আধ্যাত্মিক আর্তি এই গানে একাকার হয়ে গেছে।

মাশরেকী রচিত জারি, সারি, ভাটিয়ালি আর মুর্শিদি গানগুলো যেন ব্রহ্মপুত্র আর মেঘনার কলতানে সিক্ত। তাঁর গানে যে সুরের ব্যঞ্জনা পাওয়া যায়, তা কেবল সংগীত নয়, বরং তা মাটি ও মানুষের এক শাশ্বত কথোপকথন। তিনি যখন লিখেন ‘মাঝি বাইয়া যাও রে’, তখন সেই মাঝির শ্রম আর জীবনের অনিশ্চয়তা আমাদের হৃদয়ে এক গভীর রেখাপাত করে। তিনি সুরের মাধ্যমে এক ধরনের ‘ইকো-সেন্ট্রিক’ বা প্রকৃতি-কেন্দ্রিক দর্শন প্রচার করেছিলেন, যেখানে মানুষ প্রকৃতির অধিপতি নয়, বরং তার এক বিনীত অংশ মাত্র। আধুনিক নাগরিক সংগীত যখন যান্ত্রিক ড্রাম আর গিটারের মূর্ছনায় ক্লান্ত, তখন মাশরেকীর এই মরমি গানগুলো আমাদের কানে জলতরঙ্গের মতো বেজে ওঠে।

আবদুল হাই মাশরেকী কেবল নিভৃত সাধক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সচেতন নাগরিকও। তাঁর সাংবাদিকতা জীবন ছিল সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে এক সাহসী লড়াই। ‘দেশ কাল’ পত্রিকা সম্পাদনার মধ্য দিয়ে তিনি যে মুক্তবুদ্ধির চর্চা করেছিলেন, তা সেই সময়ের প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশে ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রেডিও পাকিস্তানের সাথে যুক্ত থেকেও তিনি সুকৌশলে বাংলার লোকজ শিল্পীদের যে মঞ্চ করে দিয়েছিলেন, তা আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক স্বর্ণালী অধ্যায়।

তিনি বিশ্বাস করতেন, সংস্কৃতির লড়াই ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন। তাই ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান সবক্ষেত্রেই তাঁর লেখনী ছিল শাণিত। তিনি জঁ-পল সার্ত্রের সেই ‘এনগেজড লিটারেচার’ বা দায়বদ্ধ সাহিত্যের এক মূর্ত প্রতীক। তবে তাঁর এই সক্রিয়তা ছিল নিঃশব্দ। তিনি প্রদীপের মতো নিজে জ্বলেছেন, কিন্তু তার আলো বিলিয়ে দিয়েছেন অন্যের আঙিনায়। প্রচারের আলো থেকে দূরে সরে থাকা এই ঋষিতুল্য মানুষটি সারাজীবন শুধু দিয়ে গেছেন, বিনিময়ে কিছুই চাননি।

একটি প্রশ্ন প্রায়শই মনের কোণে উঁকি দেয় আবদুল হাই মাশরেকীর মতো এমন এক বহুমুখী প্রতিভা কেন আধুনিক সাহিত্যের মূলধারায় আজও যথাযথভাবে মূল্যায়িত হননি? এর উত্তর হয়তো লুকিয়ে আছে আমাদের নগরকেন্দ্রিক সংকীর্ণ মানসিকতায়। আমরা যারা শহরের ইট-পাথরের খাঁচায় বসে সাহিত্যচর্চা করি, তারা অনেক সময় গ্রাম বাংলার এই ‘মাটির মানুষদের’ তুচ্ছজ্ঞান করি। মাশরেকীর অপরাধ ছিল হয়তো এটাই যে, তিনি কখনও মেকি আভিজাত্যের চাদর গায়ে জড়াননি। তিনি সারাজীবন গ্রাম্যতাকেই নিজের অলংকার মনে করেছেন।

তাছাড়া তাঁর আত্মপ্রচারবিমুখতাও তাঁকে অনেকটা আড়ালে রেখে দিয়েছে। বর্তমান সময়ে যেখানে সামান্য লিখেই মানুষ ‘মহাকবি’ হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়, সেখানে মাশরেকী ছিলেন এক বিস্ময়কর ব্যতিক্রম। তিনি জানতেন, মহাকালই শেষ বিচারক। মানুষের ভালোবাসা আর হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান পাওয়াটাই ছিল তাঁর কাছে বড় পুরস্কার। তবে ব্যক্তিগতভাবে অবহেলিত হলেও তাঁর শিল্পকর্ম কিন্তু থেমে থাকেনি। তাঁর সৃষ্টি আজ বাংলার হাটে-মাঠে-ঘাটে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ফেরে। কোনো কবির এর চেয়ে বড় সার্থকতা আর কী হতে পারে?

মাশরেকীর জীবনদর্শনে এক গভীর অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদ কাজ করত। তিনি মানুষকে দেখতেন তাঁর অন্তরের ঐশ্বর্য দিয়ে। তাঁর রচনায় হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ভেদাভেদ কখনও স্থান পায়নি। সর্বজনীন ভ্রাতৃত্ববোধই তাঁকে একজন বিশ্বনাগরিকে পরিণত করেছে।

ইমানুয়েল লেভিনাস যে ‘পরার্থপরতা’র দর্শনের কথা বলেছিলেন, মাশরেকীর সাহিত্যে আমরা তার প্রতিফলন দেখি। অন্যের চোখের জল মোছানোই ছিল তাঁর সাহিত্যের উদ্দেশ্য। তাঁর প্রতিটি কবিতা ও নাটকের চরিত্রে ফুটে ওঠে এক অপার মমতা। তিনি কেবল শিল্পের জন্য শিল্প সৃষ্টি করেননি, তিনি মানুষের মুক্তির জন্য শিল্প গড়েছেন। তাঁর এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বর্তমানের অসহিষ্ণু পৃথিবীতে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

মাশরেকীর ভাষার দিকে তাকালে এক অদ্ভুত সারল্য চোখে পড়ে। তিনি কোনো জটিল উপমা বা দুর্ভেদ্য অলংকারের আশ্রয় নেননি। তাঁর শব্দগুলো যেন শরতের আকাশের মতো পরিষ্কার। ‘ধানের শিষে শিশির বিন্দু’ কিংবা ‘নদীর বাঁকে নিঃসঙ্গ বক’ এমন সব চেনা ছবি দিয়েই তিনি এক মহাজাগতিক অনুভবের জন্ম দিতেন। তাঁর ছন্দবোধ ছিল একদম প্রাকৃতিক। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ কিংবা বৃষ্টির টাপুর-টুপুর শব্দের ভেতর থেকেই তিনি তুলে আনতেন তাঁর ছন্দের ঝংকার।

যাকে আমরা ‘সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ’ বলি, মাশরেকী তা নিজের অজান্তেই সম্পন্ন করেছিলেন কয়েক দশক আগে। তিনি প্রান্তিক মানুষের মুখের বোলিকে এক অনন্য নান্দনিকতা দান করেছেন। তাঁর ভাষা কখনও কৃত্রিম মনে হয় না, মনে হয় যেন স্বয়ং মৃত্তিকা কথা বলছে। এই যে ভাষার সারল্য, এটিই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি সাধারণের মাঝে থেকেও ছিলেন অসাধারণ।

আজ যখন বিশ্বায়ন আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে গিলে খেতে উদ্যত, তখন মাশরেকীর সাহিত্য আমাদের জন্য এক শক্তিশালী রক্ষাকবচ। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে নিজের শিকড়কে আঁকড়ে ধরে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়। বিজাতীয় সংস্কৃতির প্লাবনে আমরা যখন দিশেহারা, তখন মাশরেকীর গান ও নাটক আমাদের দিশা দেখায়।

তাঁর অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিগুলো উদ্ধার করা এবং তাঁর কর্মের ওপর আরও গভীর গবেষণা করা এখন সময়ের দাবি। কেবল দু-একটি স্মৃতিচারণমূলক সভার মধ্যেই তাঁকে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই মহান শিল্পীকে পৌঁছে দিতে হবে। যাতে তারা জানতে পারে যে, এই বাংলাতেই এমন একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ জন্মেছিলেন, যিনি মাটিকে ভালোবেসে আকাশের সমান উচ্চতায় আরোহণ করেছিলেন।

দিনের শেষে যখন গোধূলির আলো নদীর জলে ঝিলমিল করে, তখন মনে হয় আব্দুল হাই মাশরেকী যেন কোথাও হারিয়ে যাননি। তিনি আছেন বাংলার প্রতিটি ফসলের মাঠে, প্রতিটি মেঠো পথের বাঁকে। তিনি আছেন সেই কিষাণের ঘামে, যার কথা তিনি সারাজীবন লিখেছেন। তাঁর জীবন ছিল এক দীর্ঘ পথচলা, যেখানে কোনো ক্লান্তি ছিল না, ছিল কেবল সৃষ্টির আনন্দ।

তিনি ছিলেন সেই ধ্রুবতারা, যা নিভৃতে জ্বলে আমাদের পথ দেখায়। তাঁর শিল্প ছিল ত্যাগের, ভোগের নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই বিখ্যাত কথাটি তাঁর ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রযোজ্য “তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ।” সত্যিই, তাঁর লেখা বা গান যতটুকু আমরা জানি, তার চেয়েও অনেক বেশি বিশাল ছিল তাঁর সেই অমলিন ও অজাতশত্রু সত্তাটি। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন যে, বড় হতে হলে আকাশকে নয়, মাটিকে স্পর্শ করতে হয়।

মহাকালের যাত্রাপথে আবদুল হাই মাশরেকী এক অমর নাম। তিনি কেবল একজন কবি বা নাট্যকার নন, তিনি বাংলার আত্মার এক জীবন্ত প্রতিফলন। যতদিন এই বঙ্গে নদী বইবে, যতদিন আকাশে মেঘ ডাকবে আর মাটির গন্ধে ভরে উঠবে চারপাশ, ততদিন মাশরেকী বেঁচে থাকবেন আমাদের মাঝে আমাদের অস্তিত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে। তিনি ছিলেন মৃন্ময় পৃথিবীর এক চিন্ময় কবি, যাঁর হাতে ধুলিকণাও সোনায় রূপান্তরিত হতো। বাংলার এই নিভৃতচারী মহাকবিকে জানাই আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, শিল্প মানে কেবল শব্দ সাজানো নয়, শিল্প মানে হলো অন্যের জীবনের সাথে নিজের জীবনকে একাকার করে দেওয়া। আর সেখানেই তিনি অনন্য, সেখানেই তিনি অপরাজেয়।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক।

১২৬ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
সাহিত্য নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০