সর্বশেষ

সাহিত্য

অস্তিত্বের ধূসর পাণ্ডুলিপি ও অনাগত সাম্য: নজরুলের কথাসাহিত্যে অবিনাশী ব্রাত্যজন

গাউসুর রহমান
গাউসুর রহমান

বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০:৫২ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
কাজী নজরুল ইসলামের কথাসাহিত্যে উঠে এসেছে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বৈষম্য, প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা। ‘মৃত্যুক্ষুধা’, ‘বাঁধনহারা’, ‘কুহেলিকা’সহ তাঁর উপন্যাস ও ছোটগল্পে সমাজের অবহেলিত মানুষের অস্তিত্ব, বঞ্চনা ও সাম্যের স্বপ্ন বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ২০২৬ সালের বাস্তবতায়ও নজরুলের মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক সাহিত্যচিন্তার প্রাসঙ্গিকতা নতুন করে আলোচনায় আসে।

গাউসুর রহমান

নজরুলের কথাসাহিত্য যেন এক বিশাল দর্পণ। সেখানে কোনো রাজপ্রাসাদের বিলাসিতা নেই, বরং আছে সমাজের সেই সব মানুষের প্রতিচ্ছবি, যাদের পায়ের ছাপ ইতিহাসের পাতায় পড়ে না। তাঁর উপন্যাস আর ছোটগল্পগুলো নিছক কোনো আখ্যান নয়; সেগুলো পরাধীন উপমহাদেশের সেই সব ছিন্নমূল মানুষের দীর্ঘশ্বাস। তাঁর গদ্যে যে প্রতিবাদ ছিল, তা কেবল ব্রিটিশ শাসনের শৃঙ্খল ভাঙার জন্য নয়, তা ছিল মানুষের ভেতরের জড়তা আর সামাজিক হীনম্মন্যতার বিরুদ্ধে এক নিরন্তর জেহাদ।


নজরুলের ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসটির কথা ভাবলে প্রথমেই চোখে ভাসে কৃষ্ণনগরের চাঁদ সড়কের সেই ধুলিমলিন গলিটা। সেখানে জীবন মানে কেবল বেঁচে থাকা নয়, জীবন মানে প্রতি মুহূর্তে ক্ষুধার সঙ্গে যুদ্ধ করা। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন আমরা খাদ্যের অপচয় আর বিলাসিতার শিখরে, তখন নজরুলের সেই সর্বহারা শ্রেণির ছবিটা বড় বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। কার্ল মার্ক্স তাঁর দর্শনে যে শ্রেণির কথা বলেছিলেন, নজরুল যেন সেই তত্ত্বকে রক্ত-মাংসের মানুষে রূপান্তর করেছিলেন এই উপন্যাসে।

ক্ষুধা মানুষের নৈতিকতাকে কতটা চুরমার করে দিতে পারে, তা নজরুলের চেয়ে নিপুণভাবে আর কে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছে? যখন জঠরের জ্বালা অসহ্য হয়ে ওঠে, তখন আভিজাত্য কেবল একমুঠো অন্নের কাছে মাথা নত করে। উপন্যাসের ‘আনসার’ চরিত্রটি তো আসলে নজরুলের নিজেরই এক ছায়া। সে কেবল এক বিপ্লবী নয়, সে একাধারে এক স্বপ্নদ্রষ্টা এবং প্রেমের কাঙাল। সে বুঝেছিল, সমাজকে বদলাতে হলে কেবল আইন বদলালে চলে না, মানুষের পেটের হাহাকার আগে মেটানো দরকার। লুই আলথুসার বর্ণিত সেই ‘আদর্শিক রাষ্ট্রযন্ত্র’ যখন সাধারণ মানুষকে শৃঙ্খলিত করে রাখে, নজরুল তখন তাঁর লেখনীর কুড়াল দিয়ে সেই শৃঙ্খল ভাঙার ডাক দেন। ‘মৃত্যুক্ষুধা’য় দারিদ্র্য কোনো পরিসংখ্যান নয়, বরং এক ভয়ংকর সামাজিক অভিশাপ, যা মানুষকে তার আপন সত্তা থেকে বিচ্যুত করে দেয়। নজরুল এখানে এক আশ্চর্য সাম্যের গান গেয়েছেন, যেখানে ক্ষুধার কাছে হিন্দু-মুসলিম কিংবা উঁচু-নিচু জাতের কোনো ভেদ নেই।


আবার যখন নজরুলের ‘বাঁধন হারা’র পাতায় চোখ রাখা যায়, তখন এক অন্যরকম অস্থিরতা বুকের ভেতর নাড়া দেয়। এটি কেবল একটি পত্রোপন্যাস নয়, বরং মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের এক অনন্য দলিল। জঁ-পল সার্ত্রে তাঁর অস্তিত্ববাদে যে স্বাধীনতার কথা বলেছিলেন, নজরুলের ‘নূবু’ চরিত্রটি যেন তার অনেক আগেই সেই স্বাধীনতাকে আলিঙ্গন করেছিল। সে কোনো প্রথাগত নিয়মের বেড়াজালে বন্দি হতে চায়নি। ঘরছাড়া, যাযাবর এই মানুষটি আসলে আমাদের প্রত্যেকের ভেতরের সেই চিরন্তন অভিযাত্রী, যে অজানার টানে ঘর ছাড়তে চায়।

তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে দাঁড়িয়ে একজন লেখক বলছেন যে, ঘর কিংবা পরিবারই মানুষের শেষ কথা নয় এই সাহসটুকু নজরুলই দেখাতে পারতেন। মধ্যবিত্ত সমাজের ঠুনকো সংস্কার আর পারিবারিক অনুশাসনের অসারতাকে তিনি নূবুর মাধ্যমে ব্যঙ্গ করেছেন। সমাজ-দর্শন এখানে কেবল বাইরের রাজপথের মিছিলে সীমাবদ্ধ নেই, তা পৌঁছে গেছে মনের গহিন অরণ্যে। মুক্তি মানে তো কেবল দেশের মুক্তি নয়, মুক্তি মানে তো নিজের মনের মুক্তিও। ‘কুহেলিকা’ উপন্যাসেও আমরা দেখি সেই একই টানাপোড়েন। সেখানে জাতীয়তাবাদ আর ব্যক্তিগত প্রেমের এক সূক্ষ্ম লড়াই চলে। সশস্ত্র বিপ্লবের পথ বেছে নেওয়া যুবক যখন প্রেমে পড়ে, তখন তার আদর্শ আর আবেগের মধ্যে যে দোলাচল তৈরি হয়, তা নজরুলের কলমে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে ফুটে উঠেছে। বিপ্লব মানেই কি তবে হৃদয়ের সবটুকু আবেগ বিসর্জন দেওয়া? নাকি সেই আবেগই হয়ে ওঠে বিপ্লবের আসল জ্বালানি? নজরুল যেন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন তাঁর উপন্যাসের প্রতিটি ছত্রে।


নজরুলের ছোটগল্পগুলো যদি আজ আমরা উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বের আলোকে বিচার করি, তবে দেখা যাবে সেখানে প্রান্তিক মানুষের বা ‘সাবঅল্টার্ন’ কণ্ঠস্বর কতখানি প্রখর। আন্তোনিও গ্রামসি কিংবা গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকরা যে প্রান্তিক মানুষের অধিকারের কথা বলেছেন, নজরুল তাঁদের নিয়ে লিখে গেছেন এক শতাব্দী আগে। ‘ব্যথার দান’ কিংবা ‘রিক্তের বেদন’-এর গল্পগুলোতে কোনো রাজকীয় জৌলুস নেই। সেখানে আছে মেথর, কুলি, মাঝিমাল্লা আর সমাজের চোখে যারা ‘পতিত’ তাদের জীবনসংগ্রাম।

‘পদ্মগোখরা’ কিংবা ‘রাক্ষুসী’র মতো গল্পগুলো পড়লে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। মানুষের ভেতরের আদিম প্রবৃত্তি আর রিপুর তাড়নাকে তিনি যেভাবে নগ্ন করে দেখিয়েছেন, তা সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনঃসমীক্ষণকেও হার মানায়। তিনি দেখিয়েছিলেন যে, মানুষের আদিম সত্তা কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক কাঠামো মানে না। ‘রাক্ষুসী’ গল্পের সেই হিংস্র অথচ মমতাময়ী নারী চরিত্রটি কি কেবলই এক কাল্পনিক সৃষ্টি? না, তা আসলে সমাজের অবদমিত কাম আর ক্ষোভের এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। নজরুলের অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদ এখানে এক উজ্জ্বল মহিমায় উদ্ভাসিত। তিনি মনে করতেন, মানুষের চেয়ে বড় কিছু আর পৃথিবীতে নেই। এই সহজ সত্যটিই ছিল তাঁর সমস্ত সাহিত্যের মেরুদণ্ড।


নজরুলের সমাজ-দর্শনে কেবল রূঢ় বাস্তবতা নয়, বরং এক মরমী ব্যঞ্জনা বা ‘Mysticism’ লক্ষ্য করা যায়। এটিই তাঁকে অন্য সব সমাজবাদী লেখক থেকে আলাদা করেছে। নজরুল বিশ্বাস করতেন, কেবল আইন করে বা ব্যবস্থা পরিবর্তন করে সমাজ সংস্কার সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন মানুষের হৃদয়ের আমূল রূপান্তর। অপরাধীকে ঘৃণা না করে অপরাধকে ঘৃণা করার যে দর্শন তিনি প্রচার করেছেন, তা বর্তমানের ‘এম্প্যাথি’ বা সহমর্মিতার সংকটে আক্রান্ত বিশ্বের জন্য এক বড় পাথেয়।

সমাজচ্যুত মানুষের প্রতি তাঁর যে অসীম করুণা, তা কেবল একজন সমাজতাত্ত্বিকের বিশ্লেষণ ছিল না, তা ছিল এক মরমিয়ার আর্তোপলব্ধি। আজ আমরা যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় একে অপরকে ট্রোল করছি কিংবা ঘৃণার বিষ ছড়াচ্ছি, তখন নজরুলের সেই ‘মরমী সমাজতত্ত্ব’ আমাদের শেখাতে পারে কীভাবে মানুষকে ভালোবাসতে হয়।


নজরুলের গদ্যের ভাষা নিয়ে কথা না বললে তাঁর আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিনি যেভাবে আরবী, ফারসি শব্দের সঙ্গে তৎসম ও আঞ্চলিক শব্দের মিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন, তা ছিল এক ভাষাগত বিপ্লব। ভাষা যে কেবল শিক্ষিত আভিজাত্যের প্রতীক নয়, বরং তা যে সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের হাতিয়ার হতে পারে নজরুলই তা প্রথম সজোরে প্রমাণ করেন। তাঁর গদ্যে আভিজাত্যের সেই মেকি গাম্ভীর্য নেই, বরং আছে মাটির ঘ্রাণ। মিখাইল বাখতিন বর্ণিত ‘কার্নিভালেস্ক’ তত্ত্বের আলোকে বিচার করলে দেখা যায়, নজরুল ভাষাকে ব্যবহার করেছিলেন প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার বিরুদ্ধে এক উপহাস হিসেবে। উচ্চবিত্ত আর নিম্নবিত্তের মধ্যবর্তী যে ভাষাগত দেয়াল, তা তিনি নিপুণভাবে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিলেন।


আজকের এই গোধূলি লগ্নে দাঁড়িয়ে মনে হয়, নজরুল কি কেবল এক সময়ের লেখক ছিলেন? না, তিনি ছিলেন এক অনন্ত সময়ের স্থপতি। তাঁর ছোটগল্পের সেই বিষাদমাখা শেষটুকু কিংবা উপন্যাসের অপূর্ণ প্রেম আসলে আমাদের অপূর্ণ সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। তিনি যে শোষণহীন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন কি আজ ২০২৬ সালে এসে সফল হয়েছে? হয়তো হয়নি। কিন্তু সেই স্বপ্নের মশালটি তিনি আমাদের হাতে তুলে দিয়ে গেছেন।

এডওয়ার্ড সাইদ বলেছিলেন, বুদ্ধিজীবীর কাজ হলো ‘Speaking truth to power’। নজরুল আজীবন সেই কাজটিই করে গেছেন নির্ভীকচিত্তে। নজরুলের সাহিত্য পাঠ করা মানে কেবল একটি গল্প বা উপন্যাস পড়া নয়; বরং তা হলো নিজের ভেতরের সেই ঘুমন্ত মানুষটিকে জাগিয়ে তোলা।

মহাকালের এই রথচক্রের আবর্তে নজরুল কোনো ধুলো পড়া নাম নন, তিনি এক চিরন্তন বিদ্রোহ, এক শাশ্বত প্রেম আর এক অবিরাম পথচলার প্রেরণা। যে পৃথিবীতে আজও শিশুরা ক্ষুধার্ত ঘুমায়, যেখানে আজও প্রেমের চেয়ে ঘৃণার জয়জয়কার, সেখানে নজরুল প্রাসঙ্গিক ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। তাঁর সেই সাম্যবাদী সুর যেন আমাদের এই যান্ত্রিক হৃদয়ে আবারও মানবতার ঝংকার তোলে। ২০২৬ সালের এই ধূসর সময়ে নজরুলের সাহিত্যই হোক আমাদের লড়াইয়ের গান আর আমাদের মুক্তির সনদ।


লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।

১২৬ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
সাহিত্য নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০