নড়িয়ায় রামঠাকুরের ৪শ' বছরের পুরোনো মঠ ভাঙার অভিযোগ
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:০০ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ডিঙ্গামানিক এলাকায় শ্রীশ্রী সত্যনারায়ণ সেবামন্দিরের প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো একটি ভবন ভেঙে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। মন্দির পরিচালনা কমিটির সহসভাপতি বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ও সাধারণ সম্পাদক মুকুল চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে এক্সকাভেটর দিয়ে ভবনটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন মন্দির কমিটির সদস্য, স্থানীয় বাসিন্দা ও ভক্তরা। তাঁদের দাবি, ভবনটির সঙ্গে সাধক শ্রীশ্রী রামঠাকুরের স্মৃতি জড়িয়ে ছিল। তবে মন্দির কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ ও জরাজীর্ণ হওয়ায় অপসারণ করা হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৮৬০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বর্তমান শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার ডিঙ্গামানিক এলাকায় মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন শ্রীশ্রী রামঠাকুর। তাঁর বাবা শ্রী রাধামাধব চক্রবর্তী ছিলেন একজন সাধক এবং মা শ্রীমতি কমলাদেবী চক্রবর্তী ছিলেন সেবাপরায়ণ নারী। চার ভাইয়ের মধ্যে রামঠাকুর ছিলেন সেজো।
শ্রীশ্রী রামঠাকুরের আদিনিবাস ছিল নড়িয়া উপজেলার জপসা ইউনিয়নের কীর্তিনাশা নদীর তীরে। নদীভাঙনের শিকার হয়ে তাঁর বাবা শ্রী রাধামাধব চক্রবর্তী শ্বশুরবাড়ি ডিঙ্গামানিক এলাকায় বসবাস শুরু করেন।
রামঠাকুরের জীবদ্দশাতেই চট্টগ্রামের পাহাড়তলী, তাঁর জন্মভূমি ডিঙ্গামানিক এবং কলকাতার যাদবপুরে তিনটি আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশ-বিদেশে তাঁর লক্ষাধিক ভক্ত ও অনুরাগী রয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানান।
নড়িয়ার ডিঙ্গামানিক এলাকায় রামঠাকুরের জন্মভূমিতে প্রায় ২২ একর জায়গাজুড়ে রয়েছে শ্রীশ্রী সত্যনারায়ণ মন্দির। সেখানে মূল মন্দিরের পাশাপাশি নাটমন্দির, মহারাজ ভবন, ঠাকুরের জন্মঘর, দুর্গা মণ্ডপ, কালীমাতার মন্দির, কমলামাধব স্মৃতি মন্দির ও মোহন্তদের স্মৃতি মন্দির রয়েছে। ভক্তদের থাকার জন্য দুটি চারতলা ভবনবিশিষ্ট যাত্রীনিবাসসহ মোট আটটি ভবন রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে ১০টি পুকুর, যার মধ্যে তিনটি প্রধান পুকুর।
দুর্গা মন্দিরের পাশে ছিল অন্তত ৪০০ বছরের পুরোনো একটি দ্বিতল ভবন। স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিদের দাবি, ভবনটি শ্রীশ্রী রামঠাকুর ও তাঁর পূর্বপুরুষেরা ব্যবহার করতেন। ভবনের চিলেকোঠায় লক্ষ্মীনারায়ণ বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত ছিল। সেখানে রামঠাকুর পূজা করতেন এবং ধ্যানমগ্ন থাকতেন বলেও তাঁরা জানান।
বর্তমানে মন্দিরটির পঞ্চম মোহন্ত হিসেবে রয়েছেন শ্রীমৎ ধূর্জটি প্রসাদ চক্রবর্তী। কয়েক বছর ধরে তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ভারপ্রাপ্ত মোহন্ত ও যুবরাজ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় শ্রীমৎ সুভাষ চক্রবর্তীকে। তাঁকে সভাপতি করে মন্দির পরিচালনার জন্য ১৭ সদস্যের একটি কমিটিও করা হয়।
রামঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত এই স্থান প্রতিবছর দেশ-বিদেশের ভক্তদের মিলনস্থলে পরিণত হয়। বাংলা সনের ২৭, ২৮ ও ২৯ মাঘ তিন দিনব্যাপী মন্দিরে নামযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়। ২৯ মাঘ দুপুরে ভোগরাগের পর ভক্তদের মধ্যে মহাপ্রসাদ বিতরণ করা হয়। এ উপলক্ষে দেশ-বিদেশ থেকে হাজার হাজার ভক্ত ও অনুসারী এখানে আসেন। এ ছাড়া শুক্লা ত্রয়োদশী তিথিতে মহন্ত মহারাজদের স্মরণে আরেকটি উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।
গত বৃহস্পতিবার (৯ সেপ্টেম্বর) সংস্কারকাজের জন্য শ্রীশ্রী সত্যনারায়ণ সেবামন্দিরের নাটমন্দির, লক্ষ্মণ ঘর ও মোহন্তদের বিশ্রামঘর ভেঙে ফেলা হয়। একই সময়ে রামঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো ভবনটিও ভেঙে ফেলা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ভারপ্রাপ্ত মোহন্ত ও যুবরাজ শ্রীমৎ সুভাষ চক্রবর্তী এবং মন্দির পরিচালনা কমিটির অধিকাংশ সদস্যকে না জানিয়েই ভবনটি ভাঙা হয়েছে।
মন্দির পরিচালনা কমিটির সহসভাপতি বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ও সাধারণ সম্পাদক মুকুল চন্দ্র রায় ব্যক্তি উদ্যোগে এক্সকাভেটরের সাহায্যে ভবনটি ভেঙে ফেলেছেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
রামঠাকুরের আত্মীয় ও স্থানীয় বাসিন্দা শিল্পী রানী চক্রবর্তী বলেন, পুরোনো ভবনটি ছিল ঠাকুরের দাদুর বাড়ি। তাঁর ১০২ বছর বয়সে মারা যাওয়া দিদি-শাশুড়ির কাছ থেকে তিনি শুনেছেন, রামঠাকুর বাড়িতে এলে ভবনটির তিনতলার চিলেকোঠায় ধ্যান করতেন। এ কারণে জায়গাটি ধ্যানঘর হিসেবে পরিচিত ছিল। সেখানে নারায়ণ ঠাকুরের বিগ্রহও ছিল। ভারতসহ দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভক্তরা ভবনটির সঙ্গে ছবি তুলতেন এবং কেউ কেউ ঘরের মাটিও স্মৃতি হিসেবে নিয়ে যেতেন বলে তিনি জানান।
শরীয়তপুর জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট অমিত ঘটক চৌধুরী বলেন, চার শত বছরের ঐতিহ্যবাহী মঠ ভেঙে ফেলায় তাঁরা ক্ষুব্ধ। তিনি এ ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের শরীয়তপুরের আহ্বায়ক বিজন চন্দ্র মজুমদার বলেন, ভবনটি রামঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত একটি পুরাকীর্তি। তাঁর দাবি, ভবনটির বয়স কমপক্ষে ৪০০ বছর এবং এটিই ছিল রামঠাকুরের শেষ স্মৃতিচিহ্ন। এটি সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করা উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মন্দির পরিচালনা কমিটির কোষাধ্যক্ষ বলরাম দাস বলেন, ভবনটি ঠাকুরবাড়ির একটি ঐতিহ্য ছিল। এটি ভাঙার বিষয়ে তাঁকেও জানানো হয়নি। এমনকি কমিটির অধিকাংশ সদস্যও বিষয়টি জানতেন না। তাঁর দাবি, এটি মন্দির কমিটির সিদ্ধান্তে নয়, ব্যক্তিগতভাবে সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ভেঙেছেন।
তবে মন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মুকুল চন্দ্র রায় বলেন, ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল। তাই সেটি ভেঙে নতুন করে নির্মাণের জন্য অপসারণ করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ভবনটি চুন-সুরকির গাঁথুনির হওয়ায় মেরামত বা সংস্কার করা সম্ভব ছিল না। এর আগে ঠাকুরের জন্মঘরও পুরোনো হয়ে যাওয়ায় ভেঙে নতুন করে করা হয়েছিল।
সহসভাপতি বিশ্বনাথ চক্রবর্তী বলেন, ভবনটি বিভিন্ন গাছপালা ও জঞ্জালে পরিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল। ভবিষ্যতে উন্নয়নের স্বার্থে ভবনটি অপসারণ করা হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী ভবনটি ভাঙার বিষয়ে মোহন্ত অবগত ছিলেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে মোহন্তকে প্রশ্ন করতে হবে।
ভারপ্রাপ্ত মোহন্ত ও পরিচালনা কমিটির সভাপতি শ্রীমৎ সুভাষ চক্রবর্তী বর্তমানে ভারতে রয়েছেন। মুঠোফোনে তিনি বলেন, ঐতিহ্যবাহী ৪০০ বছরের ভবনটি ভাঙার বিষয়ে মন্দির পরিচালনা কমিটির সহসভাপতি বিশ্বনাথ চক্রবর্তী তাঁর সঙ্গে কোনো আলোচনা করেননি। পূজার আগে বাংলাদেশে ঠাকুরবাড়িতে গেলে কমিটির সবাইকে নিয়ে বসে এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম বলেন, পুরাকীর্তি ভবনগুলো সংরক্ষণ করা হয়। কেন এবং কোন উদ্দেশ্যে ভবনটি ভাঙা হয়েছে, তা জনগণের সামনে প্রকাশ করা উচিত। এ বিষয়ে কোনো রেজল্যুশন হয়ে থাকলে সেটিও প্রকাশ করা প্রয়োজন। তাঁদের এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ম্যান্ডেট কতটা রয়েছে, সেটিও দেখার বিষয়। অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রশাসন বিষয়টি খতিয়ে দেখবে।
শরীয়তপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান কিরণ বলেন, মন্দির ভাঙার সঙ্গে বাইরের কেউ জড়িত নয়। ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় কমিটির লোকজনই সেটি ভেঙেছেন। তাঁর দাবি, একটি কুচক্রী মহল মিথ্যাচার করে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে।
ঘটনাটি নিয়ে ভক্ত ও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ভবনটি ভাঙার সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া, এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং সংরক্ষণের বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরবর্তী সময়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তা এখন দেখার বিষয়।
১১৭ বার পড়া হয়েছে