কুচকুচে কালো রাতে সাদা বত্রিশ দাঁতের হাসি..
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২:৩১ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
১৭৯০ সালে এক স্কচ বণিকের হাতে গড়ে ওঠা ব্রিটিশ আমলের পুরোনো দোতলা বাড়ি। শতাব্দী পেরিয়ে যাওয়া সেই বাড়িতে এখন এয়ারবিএনবির অতিথি হয়ে উঠেছেন এক লেখক। কিন্তু বাড়িটির নীরবতা, অদ্ভুত কেয়ারটেকার অনুঢ়ার রহস্যময় উপস্থিতি আর অন্ধকার রাতে হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ানোর ঘটনায় চার রাত যেন কেটেছে একের পর এক ভৌতিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।
বৃটিশ আমলের এই বাড়ির খাঁজে খাঁজে জমে আছে শতাব্দীর রহস্য! ১৭৯০ সালে জনৈক স্কচ বণিকের হাতে গড়া এই দোতলা বাড়ি কালক্রমে হাতবদল হতে হতে এখন এক পর্তুগীজ অভিবাসী ড. এস. সিলভার দখলে। বর্তমানে বাড়িটি এয়ারবিএনবি হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়।
এই ডুপ্লেক্স বাড়ির প্যাঁচানো কাঠের সিঁড়িটি মুচড়ে উঠে গেছে দোতলায়। ছাদটি ঘেরা লাল রঙের মাটির টালি দিয়ে, আর ছাদের ঠিক নিচেই আবলুশ কাঠের নিখুঁত ফলস সিলিং।
এই বাড়ির কেয়ারটেকার অনুঢ়া। সত্তোরোর্ধ্ব এই প্রৌঢ়ের মুখাবয়ব সবসময় ভাবলেশহীন, ঠোঁটে একটুও হাসির রেখা নেই। কিন্তু সে খুব ভালো মনের মানুষ। তাঁর গায়ের রং এমন মিশকালো যে ঘুটঘুটে অন্ধকারে তাকে আলাদা করা অসম্ভব। তাঁর ইংরেজি উচ্চারণ খাঁটি বৃটিশ একসেন্টে। অনুঢ়ার সাথে কথা বললেই মনে হবে এই লোক যেন পার্থিব দুনিয়ার সবকিছুর ওপর চরম বিরক্ত। দিনের বেলা তো বটেই, রাতের বেলা তাকে খুঁজে পাওয়া দায়। কই যায়, কী করে—গত চার দিনে তাঁর কোনো হদিস পাইনি। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আমি যখনই "অনুঢ়া" বলে ডেকে উঠেছি, অমনি সে শূন্য ভেদ করে বা অন্ধকার চিরে ঠিক আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে!
সে হাঁটে বিড়ালের মতো পা টিপে টিপে—মানুষ তো দূরের কথা, পায়ের নিচে মাটিও টের পায় কিনা সন্দেহ!
একবার ভাবুন তো, ঝিঁঝিঁ ডাকা সুনসান নীরবতা আর আলো-আঁধারির সেই রাতে এমন উপস্থিতি কেমন হাড় হিম করা আতঙ্কের জন্ম দেয়!
ভুত দেখার মতো শিউরে উঠে বুকে হাত দিয়ে নিজেকে সামলে বলি,
তুমি কোথায় ছিলে, ডাকতেই হুট করে সামনে চলে এলে?
অনুঢ়া তখন তাঁর কুচকুচে কালো মুখের ভেতর থেকে সেই সাদা ঝকঝকে বত্রিশটি দাঁত বের করে এক অদ্ভুত নীরব হাসিতে ফেটে পড়ে। রাতের নিস্তব্ধতাকে সে যেন আরও বহুগুণ ভয়ংকর বানিয়ে তোলে।
এমন এক রহস্যময় ও ছায়ামূর্তির মতো মানুষের আশ্রয়ে আমি কীভাবে যে গত চারটে রাত কাটিয়ে দিলাম, তা ভাবলেই এখনো সর্বাঙ্গে কাঁটা দিয়ে ওঠে। তবে স্বস্তির বিষয় এই যে, এই এয়ারবিএনবিতে আমার সাথে আরও কিছু অতিথি রয়েছে—এক অস্ট্রেলিয়ান কাপল, এক চীনা ও জার্মান দম্পতির পাশাপাশি রয়েছে এক তামিল দম্পতিও। তাদের উপস্থিতিটুকুই আমার সাহসের। বাকি কটা দিন এই ভুতুড়ে বাড়িতে আমাকে এভাবেই কাটিয়ে দিতে হবে।
(কোট্টে,কলম্বো)
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।
১২৭ বার পড়া হয়েছে