আলট্রাসোনোগ্রাফিতে যমজ সন্তান, সিজারের পর পাওয়া গেছে ১ শিশু
শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬ ২:৫২ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার শান্তনা আক্তার ও তাঁর স্বামী শান্ত ইসলাম যমজ সন্তানের আশায় ছিলেন। অস্ত্রোপচারের আগে দুটি আল্ট্রাসনোগ্রাম প্রতিবেদনেও গর্ভে যমজ জীবিত সন্তানের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল বলে তাঁদের দাবি। তবে অস্ত্রোপচারের পর পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয় একটি কন্যাশিশু। অপর নবজাতকের বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য না পাওয়ার অভিযোগ তুলে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে থানায় এজাহার দিয়েছেন ওই নারীর স্বামী।
ঘটনাটি ঘটেছে গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেল ৫টার দিকে নওগাঁ শহরের বেসরকারি বলাকা ক্লিনিকে। এ ঘটনায় ক্লিনিকটিতে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। শুরু হয় বাগ্বিতণ্ডা ও সমঝোতার চেষ্টা। খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন জেলা পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, শান্তনা আক্তারের গর্ভে যমজ সন্তান থাকার বিষয়টি দুটি আল্ট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষায় নিশ্চিত করা হয়েছিল। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর একটি কন্যাশিশু হস্তান্তর করা হলেও অপর সন্তানের বিষয়ে কোনো তথ্য জানানো হয়নি। এ ঘটনায় অপর নবজাতকের সন্ধান এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন তাঁরা।
শান্ত ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১২ ও ২১ অক্টোবর তাঁর স্ত্রীর দুটি আলাদা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আল্ট্রাসনোগ্রাম করানো হয়। প্রথমটি করা হয় জয়পুরহাট জেলার একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। পরবর্তী সময়ে ২১ অক্টোবর নওগাঁ শহরের রি-লাইফ ডায়াগনস্টিক সেন্টারেও পরীক্ষা করানো হয়। দুটি প্রতিবেদনেই যমজ জীবিত ভ্রূণের উপস্থিতির কথা উল্লেখ ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
শান্ত ইসলাম বলেন, আল্ট্রাসনোগ্রাম করার পর চিকিৎসক দিনা তাঁদের যমজ সন্তান হওয়ার কথা জানান। এ জন্য মিষ্টি খাওয়ার কথা বলে ৫০০ টাকা চান বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
পরে চিকিৎসক ডা. মাহফুজা খাতুনের পরামর্শে বৃহস্পতিবার বিকেলে তাঁর স্ত্রীকে বলাকা ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। যমজ সন্তান হওয়ায় স্বাভাবিক প্রসবের পরিবর্তে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হবে বলে চিকিৎসক জানিয়েছিলেন। এরপর ডা. মাহফুজা খাতুনের অধীনেই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করেন শান্তনা।
তবে অস্ত্রোপচারের পর একটি কন্যাশিশু দেখানো হলে পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অপর নবজাতক কোথায়, সে বিষয়ে জানতে চাইলেও সন্তোষজনক কোনো উত্তর পাননি বলে অভিযোগ করেন শান্ত ইসলাম।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর ঘটনা ধামাচাপা দিতে তাঁকে মোটা অঙ্কের অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে এ ধরনের প্রস্তাবে রাজি না হয়ে তিনি আইনের আশ্রয় নিয়েছেন। অপর নবজাতকের সন্ধান এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে শান্তনা আক্তারের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের আগে চিকিৎসক ও ক্লিনিকের কর্মীদের কাছ থেকে তাঁরা জেনেছিলেন, তাঁর গর্ভে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে সন্তান রয়েছে। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর তাঁকে শুধু একটি কন্যাশিশু দেখানো হয়।
শান্তনা বলেন, পরিবারের সদস্যরা এ বিষয়ে প্রতিবাদ শুরু করলে তাঁর পেটের অস্ত্রোপচারের কাটা অংশ সেলাই না করে প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট ফেলে রাখা হয়। এ সময় মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করা এবং কথা না শুনলে ওই অবস্থায় রেখেই চলে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তাঁর ভাষ্য, একপর্যায়ে শারীরিকভাবে কাঁপুনি শুরু হলে তিনি আগে সেলাই করে দেওয়ার অনুরোধ জানান। পরে চিকিৎসক তাঁর সঙ্গে রাগারাগি করেন এবং হুমকি দিয়ে ভিডিও ধারণ করেন। এরপর অস্ত্রোপচারের কাটা অংশ সেলাই করা হয়। শান্তনা বলেন, তিনি তাঁর দুই সন্তানকেই ফিরে পেতে চান এবং অপর সন্তানের বিষয়ে জানতে চান।
অন্যদিকে রি-লাইফ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আল্ট্রাসনোগ্রাম করা চিকিৎসক দিনা বলেন, তিনি রোগীর সর্বশেষ আল্ট্রাসনোগ্রামটি করেছিলেন। যন্ত্রে যেভাবে দেখা গেছে, তিনি রোগীকে সেভাবেই জানিয়েছেন।
রি-লাইফ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক শরিফুল ইসলাম বলেন, চিকিৎসক মাহফুজা খাতুনের নির্দেশনায় দিনা আল্ট্রাসনোগ্রাম করেছিলেন এবং তাঁর প্রতিবেদনেই যমজ সন্তানের কথা উল্লেখ ছিল। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর একটি সন্তান জন্ম নেওয়ার কথা জানতে পেরেছেন তাঁরা। আল্ট্রাসনোগ্রামের প্রতিবেদন নাকি অস্ত্রোপচারের তথ্য সঠিক, সে বিষয়ে চিকিৎসকের কাছ থেকেই ব্যাখ্যা পাওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি। পাশাপাশি তাঁর প্রতিষ্ঠানে যথাযথ প্রক্রিয়া মেনেই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে দাবি করেন।
বলাকা ক্লিনিকের মালিক এনামুল হকও তাঁর প্রতিষ্ঠানের কোনো গাফিলতি নেই বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, ডা. মাহফুজা খাতুনের পরামর্শেই ওই নারীকে ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছিল এবং তিনিই অস্ত্রোপচার করেছেন। এর আগে তাঁর নির্দেশেই রি-লাইফ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আল্ট্রাসনোগ্রাম করানো হয়েছিল। বলাকা ক্লিনিকে শুধু অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। অস্ত্রোপচারের পর নবজাতক হস্তান্তরের পুরো প্রক্রিয়া ক্লিনিকের সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা আছে বলেও দাবি করেন তিনি। পুলিশ এসে সেই ফুটেজ দেখে গেছে বলে জানান এনামুল হক।
সমঝোতার জন্য অর্থ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে এনামুল হক বলেন, রোগীর স্বজনেরাই তাঁকে রি-লাইফ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং সেখানে দুই লাখ টাকা দাবি করেছিলেন। উপস্থিত ব্যক্তিদের সামনে তিনি বলেছিলেন, অস্ত্রোপচারের খরচ রি-লাইফ কর্তৃপক্ষ বহন করবে। তবে রোগীর স্বজনেরা তাতে রাজি হননি। আল্ট্রাসনোগ্রাম করা চিকিৎসক দিনার আচরণ নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।
এ বিষয়ে নওগাঁ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিন্টু রহমান বলেন, ভুক্তভোগীর স্বামী থানায় এজাহার দিয়েছেন। এতে বলাকা ক্লিনিকের মালিক, দুই চিকিৎসকসহ অস্ত্রোপচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনা জানার পরই একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছিল। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে নওগাঁ সদর মডেল থানায় এজাহার দেওয়া হয়েছে। নিরপেক্ষ তদন্তের পর প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চিকিৎসক ডা. মাহফুজা খাতুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
১১২ বার পড়া হয়েছে