বদরুদ্দীন ওমর অটল মেরুদণ্ডের নিঃসঙ্গ শেরপা
সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৮:০১ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
উপমহাদেশের সমাজ, অর্থনীতি, সাহিত্য ও রাজনীতির ধারায় বদরুদ্দীন ওমর একজন ব্যক্তি কিংবা প্রাবন্ধিক নন, তিনি নিজেই আপসহীন বুদ্ধিবৃত্তিক এক প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্য। ১৯৩১ সালে তাঁর জন্ম এবং দীর্ঘ সতেরো দশকেরও বেশি সময়ের সৃষ্টিশীল ও প্রদীপ্ত জীবনের অবসান ঘটে ২০২৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। আজ তাঁর প্রথম প্রয়াণ দিবসে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায়—এক জীবনব্যাপী সত্য সাধনা, মেহনতি মানুষের মুক্তির নিরন্তর লড়াই এবং অন্যায়ের সামনে অটল মেরুদণ্ডের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ৫০-এর দশক থেকে শুরু করে মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর বাক্য, কলম ও চলনে তিনি কোনো দিন বিন্দুমাত্র আপস করেননি।
—বদরুদ্দীন ওমরের সামগ্রিক চিন্তার প্রধান ভিত্তিই ছিল খেটে খাওয়া মানুষ—কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মেহনতি জনতার মুক্তি। তিনি কোনো শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরের আবদ্ধ গবেষক কিংবা কোনো গ্রন্থাগারের তত্ত্ববিদ ছিলেন না। তাঁর গবেষণার খোরাক জোগাত হাট-মাঠ, ঘাট, পথের ধূলোবালি ছিল সম্বল। তিনি বলতে গেলে পায়ে হেঁটে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গেছেন, তাদের জীবনের বঞ্চনা ও শোষণের ইতিহাস অনুধাবন করেছেন এবং সেই অভিজ্ঞতাকে নিজের ক্ষুরধার লেখায় রূপ দিয়েছেন।
বদরুদ্দীন ওমরের প্রকাশিত মোট বইয়ের সংখ্যা শতাধিকেরও বেশি। বাংলা ও ইংরেজি—উভয় ভাষায় তিনি রাজনীতি, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিবিষয়ক এই গ্রন্থগুলো রচনা করেছেন। এর মধ্যে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে তাঁর ৩ খণ্ডের যুগান্তকারী আকর গ্রন্থ ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ এ দেশের সাহিত্য ও ঐতিহাসিক গবেষণায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই গ্রন্থ ছাড়া ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত মাত্রা ও আর্থ-সামাজিক ব্যাকগ্রাউন্ড অনুধাবন করা অসম্ভব। ওমর কেবল কাঁচঘেরা ঘরের গবেষক ছিলেন না তিনি; তাঁর চিন্তা ও চেতনার মূল উৎস ছিল মেহনতি মানুষের জীবনসংগ্রাম। তিনি হাট-মাঠ, ঘাট , পথের ধূলোবালিতে মিশে থাকা কৃষক-শ্রমিকের অধিকারের কথা ভেবেছেন সারা জীবন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাঙলাদেশের কৃষক’ কিংবা ‘বাঙলাদেশের কৃষক ও কৃষক আন্দোলন’-এ তিনি এ দেশের তৃণমূল খেটে খাওয়া মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির চিত্র তুলে ধরেছেন।
—প্রাজ্ঞ এই দার্শনিক শুধু ইতিহাসবিদ ও গবেষকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অসামান্য শিক্ষাবিদ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠা এবং অধ্যাপনার মাধ্যমে তিনি এক ঝাঁক মুক্তচিন্তার ছাত্র গড়ে তুলেছিলেন। তবে যখনই তিনি অনুভব করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোগত সীমানা তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের দর্শনের পথে বাধা সৃষ্টি করছে, তিনি দ্বিধাহীনভাবে রাজকীয় অধ্যাপক পদ ত্যাগ করেছিলেন এবং সরাসরি খেটে খাওয়া মানুষের গণতান্ত্রিক ও বৈপ্লবিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ করেছিলেন।
বদরুদ্দীন ওমরের জীবনকে চেনার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি ছিল রাষ্ট্র ও ক্ষমতার মুখে তাঁর অবিচল নির্মোহতা। ১৯৭৩ সালে যখন তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদাপূর্ণ ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’ প্রদান করা হয়, তিনি তা প্রত্যাখান করে নীতি ও আদর্শের বিরল ঐতিহাসিক উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলেন। তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই প্রত্যাখ্যানের পেছনে বিশাল ঝুঁকি বিদ্যমান থাকলেও পদক, অর্থ কিংবা ক্ষমতার লোলুপতা তাঁর মতো নির্মোহ লেখকের চেতনায় বিন্দুমাত্র আঁচড় কাটতে পারেনি। শুধু তাই নয়, স্বাধীনতা পদক- ২০২৫ প্রত্যাখান করে বিশ্বে আলোচিত হয়েছেন বরেণ্য বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমর।
জীবনের অন্তিম পর্যায় ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রের কোনো প্রলোভনে নিজেকে বিকিয়ে দেননি।—উপমহাদেশের ইতিহাস, নীতি-আদর্শ ও শোষিত মানুষের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে বদরুদ্দীন ওমর অনন্য মহীরুহ। সমাজ, রাজনীতি ও সাহিত্য ভাবনায় প্রায় সাত দশক ধরে তিনি যা লিখে গেছেন এবং জীবনব্যাপী যা লালন করে গেছেন—তা তাঁকে কেবল একজন লেখক নয়; বরং এ দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের অসামান্য দিশারীতে পরিণত করেছে। আজকের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে সুবিধাবাদিতা, তোষামোদ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব চারপাশকে গ্রাস করছে, তখন বদরুদ্দীন ওমরের মতো ব্যক্তিত্বের অপ্রতুলতা আমরা প্রবলভাবে অনুভব করি। তিনি শিখিয়ে গেছেন কীভাবে ক্ষমতার চোখের দিকে তাকিয়ে সত্য বলতে হয়? কীভাবে কোনো বস্তুগত অর্জনের তোয়াক্কা না করে আদর্শের পথে একাকী হেঁটে যেতে হয়।
আজকের প্রজন্মের কাছে তাঁর শত খণ্ডের চিন্তাশীল গ্রন্থ এবং সুদীর্ঘ জীবনের আপসহীন সংগ্রাম পরম উদ্দীপনা ও চর্চার বিষয় হয়ে আছে। প্রথম প্রয়াণ দিবসে এই প্রাজ্ঞ দার্শনিক, নিরপেক্ষ ইতিহাসবিদ, বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও নির্মোহ লেখকের স্মৃতির প্রতি অতল শ্রদ্ধা। বাংলা ভাষার রাজনীতি ও জ্ঞানচর্চার আকাশে তিনি অবিনাশী তারা হয়ে পথ দেখাবেন এই বিশ্বাস করা যায়।
লেখক : নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক।
১৯০ বার পড়া হয়েছে