নারী থেকে পুরুষ হওয়ার চেষ্টায় স্তনে অস্ত্রোপচারে মৃত্যু
সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৮:১৫ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
ঢাকার পান্থপথের একটি বেসরকারি হাসপাতালে মহিলা থেকে পুরুষ হওয়ার জন্য স্তনে অস্ত্রোপচারের কয়েক ঘণ্টা পর রোজি আক্তার লিজা (৩১) নামের এক তরুণীর মৃত্যু হয়েছে। গত ৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে অস্ত্রোপচারের পরদিন ৬ সেপ্টেম্বর ভোরে তাঁর মৃত্যু হয়। পরিবারের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের আগে ও পরে হাসপাতালের চিকিৎসাপদ্ধতি এবং কাগজপত্রে তাঁর নাম ও লিঙ্গ পরিবর্তনের বিষয়টি তাঁরা পুরোপুরি জানতেন না।
বরিশালের গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজি আক্তার লিজা। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রব হাওলাদারের মেয়ে। পরিবারের সদস্যরা গত ৬ সেপ্টেম্বর বিকেলে তাঁর মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান। পরে ওই দিন সন্ধ্যায় তাঁকে দাফন করা হয়।
পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লিজা ছোটবেলা থেকেই নিজেকে ছেলেদের মতো প্রকাশ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। তিনি ছেলেদের মতো চুল কাটতেন এবং পোশাক-আচরণেও তা দেখা যেত। দু'বার বিয়ে হয়েছে কিন্তু কোথাও সংসার করেনি লিজা। গত প্রায় তিনবছর আগে লিজা তার আপন ভাইয়ের স্ত্রীকে নিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছিলো। পরে তারা বাড়িতে ফিরে আসে। লিজা ছোট বেলা থেকেই কোন ছেলেকে পছন্দ করতোনা- এমনটাই জানায় লিজার মা।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা জেমিনি ওরফে জেনিফা আক্তারের সঙ্গে লিজার ঘনিষ্ঠতা ছিল। জেনিফা নিয়মিত তাঁদের বাড়িতে আসতেন এবং কখনো কখনো দীর্ঘ সময় সেখানে থাকতেন। তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা থাকলেও এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
জেনিফা আক্তার বলেন, তাঁরা একে অপরের বাসায় যাতায়াত করতেন এবং একসঙ্গে থাকতেন। তাঁর ভাষ্য, লিজা দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় হরমোন–সংক্রান্ত চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। পরে পুরুষ হিসেবে জীবনযাপনের উদ্দেশ্যে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জেনিফার দাবি, অস্ত্রোপচারের জন্য লিজার মা, বাবা ও বোন মিলে প্রায় দেড় লাখ টাকা দেন। গত ৩ সেপ্টেম্বর পান্থপথের ইউনিহেলথ স্পেশালাইজড হাসপাতালে ‘সরফরাজ’ নামে লিজাকে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের কাগজপত্রে তাঁকে পুরুষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অস্ত্রোপচারের আগে সম্মতিপত্রে লিজার স্ত্রী হিসেবে জেনিফা স্বাক্ষর করেন বলেও তিনি জানান।
তবে লিজার বাবা আব্দুর রব হাওলাদার বলেন, জেনিফা তাঁর মেয়ের অস্ত্রোপচারের সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করবেন—এ বিষয়ে তিনি জানতেন না। হাসপাতালের কাগজপত্রে মেয়ের নাম ‘সরফরাজ’ করা হয়েছে, সেটিও তিনি পরে জানতে পারেন বলে জানান।
আব্দুর রব বলেন, তাঁর স্ত্রী তাঁকে জানিয়েছিলেন, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে লিজা পুরুষ হয়ে জেনিফাকে বিয়ে করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে মেয়ের চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের বিষয়ে পরিবারের মধ্যে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে তাঁর সঙ্গে যথেষ্ট আলোচনা হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন।
লিজার মা ফজিলা বেগম বলেন, ছোটবেলা থেকেই তাঁর মেয়ে কোনো পুরুষের সঙ্গে সংসার করতে আগ্রহী ছিলেন না। পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁকে দুবার বিয়ে দেওয়া হলেও কোনো সংসার টেকেনি। পরে জেনিফার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়। জেনিফাকে ঘনিষ্ঠ বান্ধবী মনে করেই অস্ত্রোপচারের বিষয়ে তাঁর ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি।
হাসপাতালের দেওয়া মৃত্যু সনদে লিজার নাম ‘সরফরাজ’ এবং লিঙ্গ পুরুষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে তাঁকে ৩ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে ভর্তি দেখানো হয়েছে।
মৃত্যুর কারণ ও অস্ত্রোপচারের সঙ্গে এর কোনো সরাসরি সম্পর্ক ছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হয়।
হাসপাতালের একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা নিজেকে এডমিন পরিচয় দিয়ে বিষয়টি হাসপাতালের জিএমের সঙ্গে আলোচনা করতে বলেন। পরে জিএম বিশ্বজিত বৈদ্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ডা. মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে ফোন রেখে দেন। এরপর একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে অস্ত্রোপচারের ধরন, চিকিৎসার অনুমোদন, রোগীর পরিচয়সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং অস্ত্রোপচারের পর মৃত্যুর কারণ—এসব বিষয় যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা।
১২৯ বার পড়া হয়েছে