সর্বশেষ

ফিচার

ময়মনসিংহ অঞ্চলে পর্যটনশিল্প বিকাশে পুরাকীর্তির ভূমিকা

ইমতিয়াজ আহমেদ
ইমতিয়াজ আহমেদ

বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬ ৯:৫৩ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
গত ২০ জুলাই ২০২৬ তারিখে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে জেলার পর্যটনশিল্পের বিকাশ এবং শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন পার্কের সার্বিক উন্নয়ন উপলক্ষে এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জেলা শ্রশাসনের ফেসবুক পেইজ ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে এই আলোচনা সভা সম্পর্কে অবগত হয়ে যারপারনাই পুলকিত হয়েছি।

পর্যটনশিল্প বিকাশে আশার প্রদীপ জ্বলার সমূহ সম্ভাবনা দেখছি। জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে এবং স্থানীয় সাংসদ, মউক চেয়ারম্যান, সিটি কর্পোরেশন প্রশাসক, বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এবং পরিবেশবাদী সংগঠনসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই সভায় জেলার পর্যটন খাতের সম্ভাবনা উন্মোচন এবং স্থানীয় বিনোদন কেন্দ্রগুলোর আধুনিকায়নে নানাবিধ পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে বলে প্রকাশ। তবে কি কি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে তা প্রচারমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়নি বলে আমরা জানতে পারিনি।

পর্যটনশিল্প বিকাশে মোটাদাগে দুটি প্রধান খাত রয়েছে; একটি পুরাকীর্তি, অপরটি প্রাকৃতিক। আলোচ্য প্রবন্ধে পর্যটনশিল্পের পুরাকীর্তি অর্থাৎ প্রত্নতাত্ত্বিক খাতটি নিয়ে আলোকপাত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি। পুরাকীর্তি স্থাপনা ইতিহাসের চাক্ষুষ সাক্ষী। পুরাকীর্তি একটি জাতির বা একটি অঞ্চলের ক্রমবিকাশের ইতিহাস ধারণ করে। এজন্য একটি পুরাকীর্তি স্থাপনার সামনে দাঁড়িয়ে বা অধ্যয়ন করে যে কোন প্রজন্মের প্রতিনিধি পুরাকীর্তি স্থাপনাটির প্রতিষ্ঠাকালের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে পারে। জানতে পারে সে সময়ের সাধারণ মানুষের বা একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর মানুষদের জীবনপ্রণালী সম্পর্কে। এজন্য পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই পুরাকীর্তি স্থাপনা সুরক্ষা করা হয়। সংস্কার-সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করে টিকিয়ে রাখা হয়। দেখভাল করার জন্য প্রতিটি দেশেই রয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর/বিভাগ। বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। দেখভাল করার জন্য রয়েছে সংস্কৃতি বিষয়ক মণ্ত্রনালয়ের অধীন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।

ময়মনসিংহ অঞ্চলে পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটাতে হলে পুরাকীর্তির উপর ভর করতেই হবে। কারণ, এ অঞ্চলে রয়েছে পুরাকীর্তির ভান্ডার। এজন্য পুরাকীর্তিসমুহ যথাযথভাবে সংস্কার-সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করতে হবে। ময়মনসিংহে তিন শতাধিক মূল্যবান পুরাকীর্তি রয়েছে; তন্মধ্যে, মাত্র ১১টি সংরক্ষিত হিসেবে ঘোষিত। এই ১১টি সংরক্ষিত পুরাকীর্তির আজ চরম ভগ্নদশা। ধ্বংস ও বিলীন চিত্র দৃশ্যমান। অসংরক্ষিত পুরাকীর্তিসমূহের অবস্থা তাহলে কেমন তা সহজেই অনুমেয়। ময়মনসিংহ অঞ্চলের পুরাকীর্তিসমুহ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করলে এ অঞ্চলে পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটতে বাধ্য। যা পর্যটনশিল্পে ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনবে।

ময়মনসিংহ জেলায় তিন শতাধিক (নোট: ২০১০-১২ সালে জার্মানীর অর্থায়ন ও প্রযুক্তিতে পরিচালিত জরিপে ৩২০টি পুরাকীর্তির তালিকা করা হয়েছিল)পুরাকীর্তির মধ্যে ১১টি সংরক্ষিত পুরাকীর্তির ০৩টি ময়মনসিংহ শহরে ও ০৮টি মুক্তাগাছা উপজেলায় অবস্থিত। গৌরপুর উপজেলা মূল্যবান পুরাকীর্তি অধ্যূষিত এলাকা হলেও সেখানকার কোন পুরাকীর্তি অদ্যাবধি সংরক্ষিত পুরাকীর্তির তালিকায় নেই। জেলার অন্যান্য উপজেলাতেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পুরাকীর্তি। পুরাকীর্তি স্থাপনাগুলোকে যথাযথভাবে সংস্কার-সংরক্ষণ করে তুলে ধরা একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবচিত্র কি? স্বাধীনতার ৫৪ বছরে কতভগ পুরাকীর্তি যথাযথভাবে সংস্কার-সংরক্ষণ করা হয়েছে? এ বিষয়টি আজ প্রশ্নের উদ্রেক করে। পুরাকীর্তি সংরক্ষণ না করলে পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটবে কিভাবে? প্রাচীন ময়মনসিংহ ছিল পুরাকীর্তির ভান্ডার। কিন্তু পুরাকীর্তিগুলোর আজ কি অবস্থা? কয়টি টিকে আছে, কয়টি বিলীন/বেহাত হয়েছে সে খবর কে রাখে?

জেলা প্রশাসন ও অন্যান্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অবহেলা, অদূরদর্শিতা ও সমন্বয়হীনতার কারণে পুরাকীর্তি স্থাপনাগুলো বিলীন/বেহাত ও ধ্বংস হচ্ছে। যেমন, গৌরিপুর লজ ময়মনসিংহের ৩টি এ ক্যাটাগরির পুরাকীর্তির মধ্যে ১টি। অথচ গুরুত্বপূর্ণ এই পুরাকীর্তি স্থাপনাটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধীনে নেই। দখলে রয়েছে সোনালী ব্যাংক। গৌরিপুর লজে সাধারণ দর্শনার্থীগণের প্রবেশ নিষেধ। এর দ্বিতীয়তলায় সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তারা বসবাস করেন। গতবছরের জুলাইয়ে ময়মনসিংহ নগরীর হরিকিশোর রায় রোডে প্রশাসন কর্তৃক একটি পুরাকীর্তির বাড়ী ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে শিশু একাডেমি নির্মাণের অজুহাতে। এদিকে, মহারাজ সূর্যকান্ত আচার্য্য চৌধুরি কর্তৃক ১৮৮৯-৯০ সালে রাজরাজেশ্বরী ওয়ার্টার ওয়ার্কস্ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ময়মনসিংহ নগরীতে প্রথম সুপেয় পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেটারও অবহেলা ও সংস্কার-সংরক্ষণের অভাবে যুগ যুগ ধরে বেহাল চিত্র। এর অনেককিছুই বিলীন/বেহাত হয়ে গিয়েছে। সম্প্রতি ময়মনসিংহ শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগ আলেকজান্দ্রা ক্যাসেলের সম্মূখ অংশের ডানপাশে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করে ক্যাসেলকে আড়াল করে দিয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর চলমান সংস্কার কাজের অংশ হিসেবে প্রত্নতাত্ত্বিক আদলের সীমানা প্রাচীরের পরিবর্তে সাধারণমানের সীমানা প্রাচীর পুন:নির্মাণ করছে। অথচ প্রত্নতাত্ত্বিক আদলে অতিসহজেই সীমানা প্রাচীর পুন:নির্মাণ করা যেত। এছাড়া লোভী ব্যক্তিচক্র দ্বারাও পুরাকীর্তি স্থাপনা ধ্বংস, বিলীন/বেহাত হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা ও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে। এভাবে পুরাকীর্তি স্থাপনা স্থানীয় প্রশাসন/নানান কর্তৃপক্ষ ও ব্যক্তিচক্র কর্তৃক ধ্বংস, বিলীন/বেহাত করে ফেললে পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটবে কিভাবে?

ময়মনসিংহ অঞ্চলের পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটাতে হলে করণীয় কি? করণীয় হলো, সংরক্ষিত ও অসংরক্ষিত সকল পুরাকীর্তি স্থাপনার সংস্কার-সংরক্ষণ ও উন্নয়ন। এক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনসহ স্থানীয় সকল কর্তৃপক্ষ ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। পুরাকীর্তি সংস্কার-সংরক্ষণ ও উন্নয়ন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রধান কাজ বিধায় তাদেরকে সম্পৃক্ত করতেই হবে। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসন ও অন্যান্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সাথে প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক যোগাযোগ/সমন্বয় স্থাপন করতে হবে। প্রয়োজনবোধে 'পর্যটনশিল্প বিকাশ সেল' নামে একটি বিশেষ সেল গঠন করা যেতে পারে।

পর্যটনশিল্পের বিকাশসাধনে প্রচার-প্রচারণা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই পুরাকীর্তি স্থাপনাগুলোর যথাযথভাবে সংস্কার-সংরক্ষণ ও উন্নয়নপূর্বক সেগুলোর তথ্য-উপাত্তসহ সচিত্র পরিচিতি অনলাইন ও অফলাইনে অধিকতর প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে পুরাকীর্তিসমূহের তথ্য-উপাত্ত জেনে দেশী-বিদেশী পর্যটক ও গবেষকগণ আগ্রহী হন ময়মনসিংহে আসতে। পুরাকীর্তি স্থাপনাসমূহে গমনের জন্য যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। যাতে পর্যটকগণ সহজেই গমনাগমন করতে পারেন। যাতায়াত সহজ না হলে পর্যটকগণ আগ্রহ হারাবেন। পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন এবং বিশেষ করে পর্যটন পুলিশ প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করতে হবে।

পুরাকীর্তিসমূহ যথাযথভাবে সংস্কার-সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করে দৃশ্যমান করলে দেশী-বিদেশী পর্যটক ও গবেষকদের আগমন ঘটবে বিধায় এ অঞ্চলে নানান ধরণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এতে স্থানীয়ভাবে বেকার সমস্যাও অনেকটা লাঘব হবে। সম্প্রতি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক 'ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রত্নস্থল সমূহের সংস্কার-সংরক্ষণ ও উন্নয়ন' শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে, যার বাস্তবায়ন কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। প্রায় ৩৪ কোটি টাকার এই প্রকল্পের মাধ্যমে ০৭টি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি স্থাপনার সংস্কার-সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কাজ করা হবে। পুরাকীর্তি স্থাপনাগুলো হলো - শশীলজ ভবন, মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ি, ময়মনসিংহ জাদুঘর, আলেকজান্ডার ক্যাসেল, জোড় মন্দির, এন এন পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও পাথরের শিব মন্দির। এছাড়া ০৫টি প্রত্নতত্ত্বস্থলে ১০টি প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য করা হবে। প্রত্নতত্ত্বস্থল সমূহ হলো - নেত্রকোণা জেলার রোয়াইলবাড়ি দুর্গ ও বরুজ ডিবি , ময়মনসিংহ জেলার বোকাইনগর কিল্লা ও কেল্লা তাজপুর দুর্গ এবং শেরপুর জেলার গড় জরিপা দুর্গ। শুধু এই ০৭টি পুরাকীর্তি স্থাপনা নয়, অন্যান্য সকল গুরুত্বপূর্ণ পুরাকীর্তি স্থাপনার সংস্কার-সংরক্ষণ ও উন্নয়নের উদ্যোগ নিতে হবে।

পর্যটনশিল্প বিকাশে পুরাকীর্তি অন্যতম খাত বিধায় ময়মনসিংহ অঞ্চলের পুরাকীর্তিসমূহের সংস্কার-সংরক্ষণ ও উন্নয়ন একান্ত জরুরি। এই কর্মটি সম্পাদন করলে এ অঞ্চলে পর্যটনশিল্পের বিকাশ সহজেই ঘটবে। যেসব দেশে/অঞ্চলে পর্যটনশিল্প বিকশিত তাতে অনন্য অবদান রেখেছে পুরাকীর্তি। তা আমলে নিয়েই সঠিক কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে।

লেখক : সদস্য সচিব, পুরাকীর্তি সুরক্ষা কমিটি, ময়মনসিংহ অঞ্চল।

১৪২ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
ফিচার নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন