১৪ বছর পরও অমীমাংসিত সাগর-রুনি হত্যা: সাংবাদিকতার বুকে এক ঐতিহাসিক ক্ষত
সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬ ৭:২৬ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১২-এর সেই রাতটা বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় নিঃশংসভাবে খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। এক পরিবারের দুই সাংবাদিককে হত্যার সেই ঘটনা শুধু দুই পরিবারকে ভাঙিয়ে দেয়নি; পুরো সাংবাদিক সমাজের বুকে এক গভীর ক্ষত রেখে গেছে।
প্রায় ১৪ বছর কেটে গেছে। বহু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি, বহু তদন্ত সংস্থার পরিবর্তন, হাইকোর্টের কঠোর নির্দেশ—কিন্তু বিচারের আলো এখনো পৌঁছায়নি। ২০১২ সালে থানা পুলিশ, পরে ডিবি, এরপর র্যাব—দীর্ঘ সময় তদন্ত করেও হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন হয়নি। ২০২৪ সালের শেষের দিকে হাইকোর্টের নির্দেশে পিবিআই-নেতৃত্বাধীন টাস্কফোর্স গঠিত হয়। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ এখন পর্যন্ত ১২৯ বার পেছানো হয়েছে। সর্বশেষ, ২০২৬ সালের ২৭ আগস্ট আদালত নতুন তারিখ দিয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর।
এত দীর্ঘ সময়, এত প্রশ্ন—কেন? কী এমন তথ্য ছিল, যা সাগর-রুনি প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন? গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, তদন্তে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সম্পৃক্ততার ক্লু পাওয়া গেছে। আইসিটির চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, বিষয়টি নিবিড়ভাবে যাচাই করা হচ্ছে। তবে নাম প্রকাশ করা হয়নি। কিছু সংবাদমাধ্যম সরাসরি বরখাস্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান ও অভিনেত্রী/সাবেক সংসদ সদস্য রোকেয়া প্রাচীর নাম উল্লেখ করেছে; তবে এটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
রুনি যখন চ্যানেল আইতে কাজ করতেন, তখন অনেক সহকর্মী তাঁকে চিনতেন। সাগর-রুনির মতো দুই সাংবাদিক দম্পতিকে হত্যার পেছনে কী এমন শক্তিশালী হাত কাজ করেছে, যা ১৪ বছর ধরে বিচারকে আটকে রেখেছে? এ প্রশ্ন শুধু দুই পরিবারের নয়; এ প্রশ্ন পুরো জাতির। সাংবাদিকের কাজ সত্য সংগ্রহ করা, সত্য প্রকাশ করা। কিন্তু সেই সত্যের পক্ষে লড়াই করতে গিয়ে যদি দুই সাংবাদিককে নিঃশংসভাবে হত্যা করা হয়, আর তার বিচার না হয়—তাহলে গণতন্ত্রের শিরদাঁড়ায় কী বার্তা যায়?
এই মামলায় বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মাসুম মিন্টু, কামরুল ইসলাম (অরুণ), আবু সাঈদ, সাগর-রুনির বাসার নিরাপত্তারক্ষী পলাশ রুদ্র পাল ও এনায়েত আহমেদ এবং তানভীর রহমান খানকে। তানভীর রহমান খান জামিনে আছেন; পলাশ রুদ্র পাল জামিনে মুক্তির পর পলাতক। অন্যরা কারাগারে। কিন্তু মূল রহস্য এখনো অস্পষ্ট।
সাগর-রুনি হত্যা মামলা এখন শুধু একটি ফৌজদারি মামলা নয়; এটি বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ঐতিহাসিক পরীক্ষা। বিচারের কাঠগড়ায় দোষীদের আনা না গেলে সাংবাদিকরা কীভাবে নিরাপদে কাজ করবেন? কীভাবে জনগণের কাছে সত্য পৌঁছে দেবেন? এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন শুধু দুই পরিবারের বিচার নয়; এটি পুরো জাতির জন্য এক ন্যায়বিচারের পরীক্ষা।
আজ, ১৪ বছর পর, যখন তদন্তে নতুন ক্লু আসছে, তখন আশা জাগে। কিন্তু সেই আশার পাশাপাশি থাকে এক গভীর ক্ষোভ—কেন এত দেরি? কেন এত অনিশ্চয়তা? সাগর-রুনির রক্তের দায় শুধু দুই পরিবারের নয়; এ দায় পুরো জাতির। বিচার হতে হবে—দ্রুত, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ। কারণ, সাগর-রুনি শুধু দুই সাংবাদিক নন; তাঁরা বাংলাদেশের সাংবাদিকতার প্রতীক।
এই মামলার বিচার দায়রা আদালতে হবে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নয়—এটি চিফ প্রসিকিউটর স্পষ্ট করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়: কেন ১৪ বছর ধরে বিচারের আলো পৌঁছায়নি? কেন বহু প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপান্তরিত হয়নি? সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ডের বিচার শুধু দুই পরিবারের জন্য নয়; এটি পুরো সাংবাদিক সমাজের, পুরো জাতির জন্য এক ন্যায়বিচারের পরীক্ষা।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট।
১২৬ বার পড়া হয়েছে