সর্বশেষ

ফিচার

মেসির ‘স্লো ফুটবল’ ও ফাইনালের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ!

লিটন আব্বাস
লিটন আব্বাস

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬ ১১:৪০ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
২০২৬ বিশ্বকাপে লিওনেল মেসি তার মোট অতিক্রান্ত দূরত্বের ৪৭% হেঁটে পার করেছেন. ফিফা (FIFA) ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া গণমাধ্যমগুলোর ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, ৩৯ বছর বয়সী এই মহাতারকার হাঁটার নিখুঁত পরিসংখ্যান সবাইকে চমকে দিয়েছে!কম দৌড়েও টুর্নামেন্টে ৩৩টি শট নিয়েছেন। সতীর্থদের জন্য সর্বোচ্চ ২১টি সুযোগ তৈরি করেছেন। হাঁটার ফাঁকেই গোল করেছেন সর্বোচ্চ ৮টি।অ্যাসিস্ট করেছেন আরও ৪টি গোল—কাতার বিশ্বকাপেও লিওনেল মেসির মোট কভার করা দূরত্বের ৫৭ শতাংশই ছিল হাঁটার গতি।
লিটন আব্বাস

মাঠের প্রায় ৪৭ শতাংশ সময়ই নাকি হেঁটে হেঁটে কাটিয়েছেন! সাধারণ চোখে মনে হতে পারে, ৩৯ বছর বয়সী এক ফুটবলারের ক্লান্তি। কিন্তু ফুটবল বোদ্ধারা যখন নিখুঁত চশমা চোখে খেলাটা বিশ্লেষণ করলেন,বেরিয়ে এলো এক অবিশ্বাস্য সত্য!
সাবেক বার্সেলোনা কোচ পেপ গার্দিওলার ভাষায়, মেসি মাঠে অলসভাবে হাঁটেন না। তিনি যখন হাঁটেন, তখন তার মাথা অবিরাম ডানে-বামে ঘোরে। প্রতিপক্ষের ডিফেন্সের ফাঁকফোকর খুঁজে বের করতে এবং শক্তি সঞ্চয় করে সঠিক মুহূর্তে কাউন্টার অ্যাটাক করার জন্যই তিনি এই ফুটবলীয় বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেন। এই কৌশলের সফল প্রমাণ আমরা কাতারেই দেখেছি, যেখানে তিনি ৭টি গোল ও ৩টি অ্যাসিস্ট করে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেছিলেন।

মেসির এই হেঁটে হেঁটে খেলা কোনো ক্লান্তি নয়, ছিল প্রতিপক্ষের বুকে লুকিয়ে আঘাত করার নীরব কৌশল। যখন তিনি মাঠে শান্ত পায়ে হাঁটেন, আসলে তার চোখ চারপাশের পুরো ডিফেন্সকে স্ক্যান করে। ফুটবল বিশেষজ্ঞরা এই জাদুকরী কৌশলের নাম দিয়েছেন ‘স্লো ফুটবল’। মেসি যেন মাঠের সবুজ ঘাসে দাঁড়িয়ে একাই একটা ম্যাপ তৈরি করেন। মাথার ভেতর মুহূর্তের মধ্যে সাজিয়ে ফেলেন অ্যাডভান্স প্ল্যানিং—কোথায় পাস দিতে হবে, কোন ফাঁক গলে বল নিয়ে বক্সে ঢুকতে হবে, আর কখন গোলটা করতে হবে। এই ধীরগতির ফুটবল দিয়েই মেসি পুরো ফুটবল বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছেন।
৩৯ বছর বয়সী এই মহাতারকা মূলত শক্তি সঞ্চয় করে নিখুঁত মুহূর্তে প্রতিপক্ষকে আচমকা আঘাত করার জন্যই এই কৌশল ব্যবহার করছেন।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই স্প্যানিশ ধাঁচের ধীরগতির অথচ শিল্পসম্মত ফুটবল খেলেই কিন্তু এবারের ইউরোতে অপরাজিত ফ্রান্সকে বিদায় করে ফাইনালে পা রেখেছে স্পেন। স্পেনের তরুণ তুর্কিরা আর মেসি যেন একই দর্শনে বিশ্বাসী—বল পায়ে রেখে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করো, তারপর আচমকা এক আঘাতে ম্যাচ কেড়ে নাও।

সামনের ফাইনালে তাই আরও একবার দেখা যাবে এই ‘স্লো ফুটবল’ আর মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের ধ্রুপদী প্রদর্শনী। এটি শুধু গায়ের জোরের খেলা হবে না; হবে নান্দনিক ছোট ছোট পাসের (টিকিটাকা) মহাকাব্য। মাঠের দখল নেওয়ার জন্য মাঝমাঠে চলবে অদৃশ্য দাবা খেলা। ফুটবলপ্রেমীরা চাতক পাখির মতো চেয়ে আছেন সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য, যেখানে গতিকে হারিয়ে জয় হবে বুদ্ধির, জয় হবে শৈল্পিক ফুটবলের।

বয়স বাড়লেও মেসির মস্তিস্ক ও ‘স্লো ফুটবল’ কৌশল এখনো অটুট। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও মেসির দুর্দান্ত দুটি অ্যাসিস্টেই আর্জেন্টিনা ফাইনালে জায়গা করে নেয়।হার না মানা মনোভাব: নকআউট পর্বের প্রতি ম্যাচেই আর্জেন্টিনা কঠিন লড়াই করে জিতেছে। তাদের এই কামব্যাক করার মানসিকতাই স্পেনের ডিফেন্সের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।

১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের স্মৃতিবিজড়িত সেই ঐতিহাসিক ১৯ জুলাইয়ের তারিখেই আগামী রবিবার নিউ ইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা মহাহরণে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও বর্তমান ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন, যেখানে বাজির বাজার ও অপটা সুপারকম্পিউটারের ৪৫.১% প্রেডিকশনে স্পেনের পাল্লাই কিছুটা ভারী রয়েছে। পুরো টুর্নামেন্টে রদ্রি-ওলম্বদের নিখুঁত টিকিটাকা পাসিং আর উইঙ্গে ১৯ বছর বয়সী বিস্ময় বালক লামিন ইয়ামালের বিধ্বংসী গতিতে ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালে ওঠা স্পেনকে ঐতিহাসিক এক ত্রিমুকুট (ইউরো, অলিম্পিক ও বিশ্বকাপ) জয়ের হাতছানি দিচ্ছে। অন্যদিকে, ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসির জাদুকরী ‘স্লো ফুটবল’ ও দুটি অ্যাসিস্টে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে আসা আর্জেন্টিনা নামছে তাদের ইতালি (১৯৩৮) ও ব্রাজিলের (১৯৬২) পর ইতিহাসে মাত্র তৃতীয় দল হিসেবে টানা দুটি বিশ্বকাপ জয়ের অমর কীর্তি গড়তে। মাঠের নিয়ন্ত্রণ, টিকিটাকা ও আধুনিক গতিময় ফুটবলে তারুণ্যে ঠাসা স্পেন স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও, ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মঞ্চে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী চাতক পাখির মতো চেয়ে আছেন মেসির সেই মহাকাব্যিক ফুটবল বুদ্ধি ও আর্জেন্টিনার অপরাজেয় মনস্তাত্ত্বিক কামব্যাক মানসিকতার দিকে—যা মুহূর্তের মধ্যে স্প্যানিশদের সব হিসাব-নিকাশ ও ইতিহাস উল্টে দিতে পারে।

লেখক : নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক।

১২৬ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
ফিচার নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন