২৬৯তম মৃত্যুবার্ষিকী
দেশপ্রেমিক মানুষের স্বপ্নের নায়ক নবাব সিরাজউদ্দৌলা
সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬ ১০:৫৬ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
নবাব শাহ কুলী খান মির্জা মুহাম্মাদ সিরাজউদ্দৌলা ছিলেন বাংলা-বিহার-ওড়িশার শেষ স্বাধীন নবাব। তিনি ১৭৫৬ থেকে ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর রাজত্বের সমাপ্তির মধ্য দিয়েই বাংলা এবং পরবর্তীতে প্রায় সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের উপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের সূচনা হয়। সিরাজউদ্দৌলার সেনাপতি মীরজাফর, রায়দুর্লভ এর বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ২৩ জুন ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হন।
পরাজয়ের পরপরই ৩ জুলাই সিরাজদ্দৌলা মহানন্দা নদীর স্রোত অতিক্রম করে এলেও তাতে জোয়ার ভাটার ফলে হঠাৎ করে জল কমে যাওয়ায় নাজিমপুরের মোহনায় এসে তার নৌকা চড়ায় আটকে যায়। তিনি নৌকা থেকে নেমে খাবার সংগ্রহের জন্য একটি মসজিদের নিকটবর্তী বাজারে আসেন। সেখানে কিছু লোক তাকে চিনে ফেলে অর্থের লোভে মীর জাফরের সৈন্যবাহিনীকে খবর দেয়। এ সম্পর্কে ভিন্ন আরেকটি মত আছে যে এক ফকির এখানে নবাব কে দেখে চিনে ফেলে। উক্ত ফকির ইতঃপূর্বে নবাব কর্তৃক শাস্তিপ্রাপ্ত হয়ে তার এক কান হারিয়েছিল। সেই ফকির নবাবের খবর জানিয়ে দেয়। তারা এসে সিরাজদ্দৌলাকে বন্দি করে রাজধানী মুর্শিদাবাদে পাঠিয়ে দেয়। বন্দী হবার সময় নবাবের সাথে ছিলেন তার স্ত্রী লুতফা বেগম এবং চার বছর বয়সী কন্যা উম্মে জহুরা। এর পরের দিন ২ জুলাই (মতান্তরে ৩রা জুলাই) মীরজাফরের আদেশে তার পুত্র মিরনের তত্ত্বাবধানে মুহম্মদিবেগ নামের ঘাতক সিরাজদ্দৌলাকে হত্যা করে। ইতহাস বলে, সিরাজের মৃত্যুর পর তার মৃতদেহ হাতির পিঠে চড়িয়ে সারা শহর ঘোরানো হয়। মুর্শিদাবাদের খোশবাগে নবাব আলিবর্দী খানের কবরের কাছে তাকে কবর দেয়া হয়।
পলাশীর যুদ্ধ ছিল বাংলার পরাজয়ের ইতিহাস। মুসলিম শাসনের পরাজয়ের ইতিহাস। স্বাধীনতা, পতাকা, মানচিত্র হারানোর ইতিহাস। এক মহান এবং উদার যুবক শাসকের পরাজয়ের ইতিহাস। ২৩ জুন ভাগিরথী নদীর তীরে পলাশীর আমবগানে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সন্ধিভঙ্গের অভিযোগ তুলে ক্লাইভও যুদ্ধ ঘোষণা করে। নবাবের পক্ষে দেশ প্রেমিক মীর মদন, মোহন লাল এবং ফরাসি সেনাপতি সিন-ফ্রে প্রাণপণ যুদ্ধ করেন। যুদ্ধে মীরমদন নিহত হন। নবাব সিরাজউদ্দৌলার সৈন্যরা যুদ্ধে অসীম সাহস প্রদর্শনের মাধ্যমে জয়ের পথে এ সময় সেনাপতি মীর জাফর যুদ্ধ থামিয়ে দেন। নবাব বিচলিত! মীর জাফরের অসহযোগিতা বুঝতে পারলেও নবাবের কিছুই করার থাকে না। মীর জাফর স্বাক্ষী গোপালের মত দাড়িয়ে নবাবের পরাজয়কে ত্বরান্বিত করে তোলে। ধর্ম গ্রন্থ স্পর্শ করে শপথ নেয়ার পরও জাফরের ষড়যন্ত্র বন্ধ হলো না। নবাবের সৈন্যদের দুর্বলতা বুঝতে পেরে ইংরেজ সৈন্যরা দ্রুতই আক্রমণ করে। যার অনিবার্য পরিণতি নবাবের পরাজয়।
বাংলার স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সহজ সরল আচরণ ছিল বলেই বারবার ষড়যন্ত্র করা সত্ত্বেও মীর জাফরের প্রতি তাঁর নির্ভরশীলতা দেখা যায়। এটা বাংগালীর মজ্জাগত স্বভাব। বারবার তাঁরা শত্রু চিনতে ভুল করে। পলাশীর পরাজয় আর নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ইংরেজরা স্বাধীনভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অন্যান্য কাজকর্ম করতে থাকে। এ দেশে ইংরেজদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিজয় অর্জন অভিযান শুরু হয়ে যায়। মধ্যবিত্ত সমাজের উথান ও ইংরেজদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিজয় অভিযান বাঙলার মুসলমানদের যে ক্ষতি সাধন করেছে তা শোধরিয়ে নেওয়া আজও সম্ভব হয়নি। বিশ্বাসঘাতকতায় পলাশীর যুদ্ধে তার পরাজয়ের মাধ্যমে ভারতবর্ষে প্রায় ২০০ বছরের ইংরেজ শাসনের সূচনা হয়।
সিরাজউদ্দৌলা মসনদে বসার পরপরই প্রশাসনে বেশ কিছু পরিবর্তন নিয়ে আসেন। মীর জাফরকে সেনাবাহিনীর প্রধান বখশির পদ থেকে সরিয়ে মীরমর্দ্দানকে সেখানে নিয়োগ দেন। এছাড়া মোহনলালকে প্রধানমন্ত্রী পদে নিযুক্ত করা হয়। এরপর সিরাজউদ্দৌলা ইংরেজদের কলকাতায় অবস্থিত কাশিমবাজার কুঠির ব্যাপারে মনোযোগী হন। কারণ সিরাজউদ্দৌলা তাদের এদেশে কেবল বণিক ছাড়া আর কিছু ভাবেননি। এ কারণে ১৭৫৬ সালের ২৯ মে কাশিমবাজার কুঠি অবরোধ করা হয়। ফলে ইংরেজরা নবাবের হাতে যুদ্ধাস্ত্র তুলে দিয়ে মিথ্যা মুচলেকার মাধ্যমে এ যাত্রায় মুক্তি পায়। কলকাতার নাম বদল করে নবাব আলিবর্দি খানের নামানুসারে ‘আলিনগর’ রাখা হয়। এই ঘটনার পর ইংরেজরা আরো নতুন নতুন ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেয়। তারা জগত্ শেঠের মাধ্যমে মীর জাফরকে মসনদে বসানোর চূড়ান্ত পরিকল্পনা করে ফেলে। পরিকল্পনায় আরো যোগ দেন রাজা রায় দুর্লভ, উমিচাঁদ, রাজবল্লভ, মিরন, মির কাশিম, ইয়ার লতিফ খান, ঘসেটি বেগম প্রমুখ। ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে ১৭৫৭ সালের ৫ জুন মীর রজাফরের একটি গোপন চুক্তি সম্পাদিত হয়, যার ফসল ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধ। চুক্তি সম্পাদনের পরই রবার্ট ক্লাইভ পলাশীর প্রান্তরে সৈন্য সমাবেশ ঘটান। সিরাজউদ্দৌলাও তার সেনাবাহিনী নিয়ে অগ্রসর হন। মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন। নতুন সৈন্য সংগ্রহ করে বাংলাকে উদ্ধারের জন্য নবাব সিরাজউদ্দৌলা কিছু বিশ্বস্ত অনুচর নিয়ে রাজধানীতে ফিরে যান। কিন্তু বিধি বাম, ২৯ জুন বীর দেশপ্রেমিক নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে প্রিয়তমা সহধর্মিণী বেগম লুত্ফুন্নিসা ও একমাত্র সন্তান কন্যা উম্মে জোহরাসহ আটক করে বাংলার বেইমান বিশ্বাসঘাতকেরা। এরপর ২ জুলাই মিরজাফরের পুত্র মিরনের নির্দেশে মুহাম্মদি বেগ সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করে। উল্লেখ্য যে, নবাব সিরাজদ্দৌলার হত্যাকারী অনাথ মুহাম্মদী বেগ আলিবর্দি খানের সহধর্মিণী শরফুন্নিসার ঘরে লালিত পালিত হয়েছিলেন এবং প্রচুর ধনসম্পদ দান করে তিনি তাকে বিত্তশালী করেছিলেন।
নবাব সিরাজউদ্দৌলার সততা, দেশপ্রেম, আদর্শ, চেতনা, ভালোবাসা আজও বাংলার দেশপ্রেমিক প্রতিটি হূদয়কে অনুপ্রাণিত করে। তাই তো বাংলার প্রতিটি দেশপ্রেমিক মানুষের স্বপ্নের নায়ক নবাব সিরাজউদ্দৌলা। আর মীর জাফর আজও খলনায়ক বা বিশ্বাসঘাতকের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত। যুগে যুগে, কালে কালে যারা দেশ মাতৃকাকে ভালোবেসে প্রাণ দিয়েছেন। যারা দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে একচুলও ছাড় দেননি বরংচ বর্গী ও বেনিয়াদের সাথে করেছেন লড়াই তাদের মধ্যে প্রজ্বল নক্ষত্র বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। দেশপ্রেমে কেউ যদি উদ্বুদ্ধ হয়ে মৃত্যুহীন হতে চায় তবে তার জন্য উজ্জল দৃষ্টান্ত শহীদ সিরাজউদ্দৌলা।
১৭৫৬ সালে ১৫ এপ্রিল থেকে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পর্যন্ত অর্থাৎ নবাব সিরাজ শাসনের এই চৌদ্দ মাস সাত দিনের দিনপঞ্জি পর্যালোচনা করলে লক্ষ্য করা যায় যে, নবাব সিরাজ প্রতিটি দিন শাসনকার্য সুসংগঠন, শত্রু ও ষড়যন্ত্র দমন, ফরাসি বণিকদের সাথে সমঝোতা রক্ষণ ও ইংরেজদের সাথে যুদ্ধ-বিগ্রহ ইত্যাদি অতিব্যস্ত ও চিন্তিত সময় কাটিয়েছেন। এ ধরনের রাজকীয় ব্যস্ততা ও দুশ্চিন্তার মধ্যে তার ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য কিংবা বিলাসিতার সময় চিলোনা বলেই চলে। তার বিরুদ্ধে যারা বিলাশিতার অভিযোগ করেন তারা কি একবারও চিন্তা করেছে এই ঝড়-ঝঞ্জালের মাঝে বিলাশিতার সময় আসলো কোত্থেকে? অথচ, ব্রিটিশ আমলের ঐতিহাসিকরা সিরাজের ব্যক্তিগত চরিত্রকে ঘৃণ্য ও জঘন্য হিসাবে চিত্রায়িত করতে দ্বিধাবোধ করেনি। শুধু ব্রিটিশ নয়, হিন্দু ও মুসলমান অল্প শিক্ষিত তথাকথিত ঐতিহাসিকরাও দুই শ’ বছর ধরে নবাব সিরাজকে অন্যায়, অত্যাচার, বিলাসী ও লোভী এমনকি দুশ্চরিত্র দুর্বল নবাব হিসেবে প্রমাণিত করার চেষ্টা করেছেন সকল সময়। অথচ কিছু কিছু ফরাসি পর্যটক, বণিক, গভর্নর ও ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় সিরাজ চরিত্রের প্রকৃত রূপের বর্ণনা আছে। তাদের বর্ণনা একত্র করে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে সিরাজ রাজনৈতিক চরিত্রে অত্যন্ত সাহসী ও সূক্ষ্ম, কূটনীতিবিদ এবং ব্যক্তি চরিত্রে সহজ-সরল ও বলিষ্ঠ নবাব ছিলেন।
সিরাজউদ্দৌলার দেশ প্রেম নিয়ে ইতিহাস গবেষক ড. মুহাম্মদ ফজলুল হক লিখেছেন, "দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য নবাব সিরাজকে জীবন বিসর্জন দিতে হয়েছে। ইচ্ছা করলে তরুণ নবাব ব্রিটিশ বণিকদের বাণিজ্য সুবিধা কিছুটা বৃদ্ধি করে এবং তাদের ঔদ্ধত্য সহ্য করে বহু যুগ শান্তিতে নবাবী করে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য তার অকৃত্রিম ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ তিনি সব শত্রুকে চিহ্নিত করে তাদের চিতরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেশের স্বাধীনতাকে মজবুত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তা পারেননি। আমদের ইতিহাস বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস এবং আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি না।"
ইতিহাসের পর্যালোচনা করে একথা ভুললে চলবে না নবাব সিরাজউদদৌলাই দেশপ্রেমের একজন সত্যিকারের সার্থক প্রতিকৃতি ; ছিলেন এ মাটিরই সন্তান। এ দেশের মাটির সঙ্গে বেইমানি করেননি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। তাই বিদেশী বেনিয়াদের গ্রাস থেকে এদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে কার্পণ্য করেননি। ইচ্ছা করলে ব্রিটিশ বেনিয়াদের বানিজ্যে তিনি কিছু সুযোগ- সুবিধা দিয়ে, মুখ বুজে ঔদ্ধত্য সহ্য করে নবাবী আগলে থেকে রাখতে পারতেন আমৃত্যু। কিন্তু তার কোনটাই তিনি করেন নি। অথচ অনেক অসাধু ঐতিহাসিক ইংরেজদের সামান্যতম আনুকূল্য লাভের আশায় নবাব সিরাজদ্দৌলার ব্যক্তিগত জীবন ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে লাগাতার মিথ্যা ও বানোয়াট গল্প বুনে তা প্রচারের আলোয় আনার অপচেষ্টা করে গেছেন এবং সে সব বিকৃত ইতিহাসের ধারা বহমান।
ইতিহাসবিদ ড. মুহাম্মদ মোহর আলীর ' হিস্ট্রি অব দ্য মুসলিম অব বেঙ্গল' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, "পলাশীর যুদ্ধের অব্যবহিত পর থেকেই সিরাজ চরিত্র হননের একটি অসুস্থ প্রবণতা তৈরী হতে থাকে এবং যুদ্ধে পরাজয়ের সব দায়-দায়িত্ব তার উপরই নিক্ষেপ করা হয়। এটি খুব সহজেই বোধগম্য হয় যে, সিরাজের বিরোধীরাই পলাশী যুদ্ধ পরবর্তী প্রায় দুই শতাব্দীকাল শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকেছে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সিরাজ সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত ও মূল্যায়নকে প্রভাবিত করেছে।"
ইতিহাসবিদ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় 'সিরাজউদ্দৌলা' গ্রন্থটিতে ইংরেজ ও তাদের অনুগত ঐতিহাসিকদের সব ষড়যন্ত্র ছিন্ন করার সকল চেষ্টা করেছিলেন। সততার সঙ্গে নির্মোহ সাহসী বক্তব্য রেখেছিলেন তিনি বহুল প্রচারিত এই গ্রন্থে। এই বক্তব্যের জন্য বাঙালি জাতি তাঁর কাছে চিরদিন কৃতজ্ঞ থাকবে। তিনি লিখেছেন, "সিরাজউদ্দৌলা মাত্র ১৪ মাস ১৪ দিন রাজত্ব করলেও শাসক হিসেবে তাঁর যোগ্যতা কোনো দিক দিয়ে কম ছিল না। একাধারে তিনি ছিলেন 'নিখাদ দেশপ্রেমিক', 'অসীম সাহসী যোদ্ধা', 'সব বিপদে পরম ধৈর্যশীল', 'কঠোর নীতিবাদী', 'নিষ্ঠাবান' এবং 'যে কোনো পরিণামের ঝুঁকি নিয়েও ওয়াদা রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব'।
সিরাজ স্মৃতি উদযাপনের আবেদন করেছিলেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি সিরাজ স্মৃতি উদযাপনের ডাক দিয়েছিলেন দৈনিক 'আজাদ' পত্রিকার মাধ্যমে, ২৯ জুন ১৯৩৯ সালে। সেখানে কবি লিখেছিলেন, হিন্দু-মুসলমানের প্রিয় মাতৃভূমির জন্য নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাহ সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। সর্বোপরি বাংলার মর্যাদাকে তিনি ঊর্ধ্বে তুলিয়া ধরিয়াছেন এবং বিদেশি শোষণের কবল হইতে দেশকে রক্ষা করিবার জন্য আপনার জীবন যৌবনকে কোরবানি করিয়া গিয়াছেন।
বাংলার মেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা এক মহাউজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামে তিনি ছিলেন অগ্রসেনানী। কী স্বল্পকালীন দেশ শাসনে, কী হানাদার ইংরেজদের বিরুদ্ধে বীরত্বসূচক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করে তিনি অমর হয়ে আছেন বাংলার জনগণের মাঝে। চিরসংগ্রামী এ বীর আমাদের তরুণ সমাজের অনুপ্রেরণার উৎস। সব লড়াইয়ে, যুদ্ধে তিনি হয়তো বিজয়ী হতে পারেননি, কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে দুর্দমনীয় লড়াই-সংগ্রামে আর কুচক্রী ইংরেজ বেনিয়াদের বিরুদ্ধে সাহসীকতাপূর্ণ ও বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ সংগ্রাম ও যুদ্ধে তিনি ছিলেন অকুতোভয়। পলাশী যুদ্ধের পর শত শত বছর অতিক্রান্ত হলেও তিনি এখনো রিচরস্মরণীয় সকলের কাছে। আমাদের স্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখার প্রশ্নে সিরাজ এখনো প্রাসঙ্গিক। নবাব সিরাজউদদৌলাই দেশপ্রেমের একজন সত্যিকারের সার্থক প্রতিকৃতি এ কথা এখন সর্বজনবিদিত। এ দেশের মাটির সঙ্গে বেঈমানি করেননি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। নবাব সিরাজউদ্দৌলা এখন ইতিহাসের এক মহান চরিত্র। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তিনি একজন আদর্শ পুরুষ। সে কারণে তিনি আজও প্রাসঙ্গিক। সমকালকে ছাড়িয়ে তিনি মানুষের ভালবাসায় সিক্ত হতে থাকবেন অনন্তকাল। ২৩ জুন পলাশী দিবস আর ৩ জুলাই সিরাজের শাহাদাত বার্ষিকী প্রতি বছর আমাদের সে কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
২৬৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীরতম শ্রদ্ধা।
লেখক : কলাম লেখক, রাজনীতিক কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
১৩৯ বার পড়া হয়েছে