খোকসা জুড়ে আতঙ্ক
কুষ্টিয়ায় ‘রাজন বাহিনী’র বিরুদ্ধে চাঁদা ও অস্ত্রবাজির অভিযোগ, নিরাপত্তাহীনতায় হিন্দু সম্প্রদায়
বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৬:২১ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
কুষ্টিয়ার খোকসায় বিএনপি নেতা নাফিজ আহম্মেদ রাজু খানের ওপর হামলার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে এলাকার ত্রাস কথিত ‘রাজন বাহিনী’। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের আড়ালে একটি সশস্ত্র চক্র দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় চাঁদাবাজি, জমি দখল, হুমকি ও অস্ত্রবাজি চালিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক হামলার পর বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
তবে পারভেজ-উল-আলম ওরফে ‘রাজন বাহিনী’র সঙ্গে নিষিদ্ধ চরমপন্থী সংগঠনের সম্পৃক্ততা, হামলার পেছনে কারা জড়িত এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা—এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে স্থানীয়দের অভিযোগ ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্যের ভিত্তিতেই বিষয়টি উঠে এসেছে।
খোকসা উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক নাফিজ আহম্মেদ রাজু খানের ওপর সাম্প্রতিক হামলাকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, খোকসা থানাপাড়া এলাকায় নিজ বাড়ির সামনে মোটরসাইকেল থেকে নামার সময় তাঁর ওপর হামলা চালানো হয়।
রাজু খানের স্বজন ও স্থানীয়দের অভিযোগ, হামলাকারীরা ধারালো অস্ত্র ও হাতুড়ি দিয়ে তাঁকে মারধর করে গুরুতর আহত করে। এতে তাঁর দুই হাত ও পায়ের একাধিক হাড় ভেঙে যায় বলে তাঁরা দাবি করেন। হামলার সময় গুলিবর্ষণ ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, হামলার পর রাজু খানকে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁর বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে পরিবারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কথিত ‘রাজন বাহিনী’ নামে পরিচিত একটি চক্র খোকসা ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছে। চাঁদাবাজি, জমি দখল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অর্থ দাবি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অবৈধ অস্ত্র প্রদর্শনের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, নদীসংলগ্ন চরাঞ্চল ও বিভিন্ন লোকালয়ে এ চক্রের সদস্যদের আনাগোনা নিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্য নথি, মামলা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেন, চক্রটির সঙ্গে সাবেক চরমপন্থীদের যোগাযোগ রয়েছে। আবার কেউ কেউ এটিকে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখছেন। তবে এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তদন্ত বা সরকারি কোনো প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।
রাজু খানের ওপর হামলার পর খোকসার হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় অনেক বাসিন্দা। তাঁদের অভিযোগ, কিছু পরিবারকে ভয়ভীতি দেখানো, চাঁদা দাবি এবং জমি নিয়ে চাপ প্রয়োগের ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব ঘটনায় অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। কেউ কেউ সন্ধ্যার পর প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে বের হচ্ছেন না বলেও জানান। তবে কোনো নির্দিষ্ট পরিবার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির ওপর হামলা, চাঁদাবাজি কিংবা জমি দখলের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বা তদন্তের ফল পাওয়া যায়নি। ফলে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
রাজু খানের ওপর হামলার ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তাঁদের অভিযোগ, হামলার সময় দীর্ঘক্ষণ গুলিবর্ষণ ও ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেলেও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি করে।
তবে পুলিশের পক্ষ থেকে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে কত সময় লেগেছে, কী ধরনের অভিযান চালানো হয়েছে কিংবা এ ঘটনায় কতজনকে শনাক্ত করা হয়েছে—এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের দাবি, হামলার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা না হলে পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে তাঁরা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, চাঁদাবাজি বন্ধ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
খোকসার বাসিন্দাদের একাংশ মনে করছেন, সাম্প্রতিক হামলাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে এর পেছনের কারণ, জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের বিষয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের দৃশ্যমান পদক্ষেপ চান তাঁরা।
রাজু খানের ওপর হামলার অভিযোগ, ‘রাজন বাহিনী’র কথিত তৎপরতা এবং স্থানীয়দের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি এখন তদন্তের দাবি রাখে।
অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত, ভুক্তভোগীদের বক্তব্য এবং প্রাসঙ্গিক নথি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এদিকে, এসব অভিযোগের বিষয়ে কুখ্যাত বাহিনী প্রধান রাজনের মুঠোফোনে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি কোন বক্তব্য দিবেননা বলে জানান। তবে বলেন, বক্তব্য থাকলে পরবর্তীতে প্রেস কনফারেন্স বা বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দেওয়া হবে। এই বলেই সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেন।
বাহিনী প্রধান রাজনকে এখনও গ্রেপ্তার করতে না পারা প্রসঙ্গে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম বলেন, পুলিশী তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। অতি দ্রুতই তাকে আইনের আওতায় নিতে পরিকল্পনা মাফিক কাজ করছে জেলা পুলিশ। তার বিষয়ে যেকোনো তথ্যউপাত্ত দিতে সচেতন জনগণের সহায়তাও কামনা করেন তিনি।
২৭৭ বার পড়া হয়েছে