সংস্কৃতি ও সংস্কৃতির উপর আক্রমণ
সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬ ৬:১৯ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
সংস্কৃতি হলো একটি জাতির জীবনাচার, রীতিনীতি, ঐতিহ্য, কৃষ্টি, চিন্তাচেতনা, নিজস্ব ইতিহাসের বহিঃপ্রকাশ। যা গান, নাটক, সিনেমা, নৃত্য ইত্যাদির মাধ্যমে প্রতিটি জাতি প্রকাশ করে থাকে। এই সংস্কৃতিই হলো জাতিগঠনের অন্যতম মাধ্যম। সংস্কৃতির মাধ্যমেই ফুটে উঠে একটি জাতির মানসিক প্রকাশ। যে জাতি সংস্কৃতিগতভাবে যত উন্নত সে জাতির মানসিক বিকাশও তত উন্নত। এই সংস্কৃতিই আবার গড়ে তুলে সাংস্কৃতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক আন্দোলন। সচেতন সাংস্কৃতিককর্মীরা জাগিয়ে তোলে জাতিকে।
অতীতে আমাদের ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন লড়াই সংগ্রামে সাংস্কৃতিক কর্মীদের সরব উপস্থিতি এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বর্তমানেও সচেতন গণমুখী সাংস্কৃতিক কর্মীরা রাজপথে সরব হয়। অন্যায় অপরাধ, সমাজ, জাতি ধ্বংসকারী অপচক্রের অপকর্মের বিরুদ্ধে রাজপথে প্রতিবাদমুখর হয়। জাগিয়ে তোলার প্রয়াস চালায় গণমানুষকে। গণমানুষকে অপচক্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহবান জানায়। ডাক দেয় প্রতিরোধের। দাবি তোলে সরকারের নিকট। মানবিকতার উত্তম প্রকাশ ঘটিয়ে সচেতন সাংস্কৃতিক কর্মীরা অসহায়, নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ দুর্বিপাকে ছুটে চলে প্রান্তর থেকে প্রান্তরে। তোলে ধরে মানবতার মানবিক পতাকা।
সংস্কৃতি মানুষকে উজ্জীবিত করে, জাগিয়ে তোলে। বিকশিত করে মানুষের মানবিক চিন্তাচেতনাকে। আমাদের শেকড়ের শুদ্ধ সংস্কৃতি বিশ্বের মানচিত্রে তোলে ধরেছে আমাদের সবুজ শ্যামল বাংলা ব-দ্বীপকে। লালন হাছনের বাংলাদেশকে। ভাষা শহীদদের বাংলাদেশকে। মুক্তিযুদ্ধে লক্ষ লক্ষ বীর শহীদদের বাংলাদেশকে।
১৯৪৭-এ পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর বাঙালি জাতির উপর প্রথম আঘাত আসে বাংলা ভাষার উপর। ১৯৪৮ সালের ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সমাবর্তন অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেন, "একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা"। তার এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই উপস্থিত শিক্ষার্থীরা তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে "না, না" বলে চিৎকার করে ওঠেন। এহেন পরিস্থিতিতে তমদ্দুন মজলিস ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ফ্রন্টের মাধ্যমে সাংস্কৃতিককর্মীরা সংগঠিত হন।
ভাষা আন্দোলনে সংস্কৃতি কর্মীরা গান, কবিতা, নাটক ও লিখনীর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেন। তারা রাজপথে স্লোগান ও প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে শহুরে গণ্ডি ছাড়িয়ে মফস্বল ও গ্রামে আন্দোলন ছড়িয়ে দেন, যা বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখে। ১৯৫২'র ফেব্রুয়ারির প্রথমদিকে উত্তাল দিনগুলোতে গণসঙ্গীত শিল্পী আব্দুল লতিফ রচনা করেন:
"ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়
ওরা কথায় কথায় শিকল পরায় আমার হাতে-পায়ে।"
কালজয়ী এই গানটিতে সুরারোপ করে তিনি নিজেই ভরাট কন্ঠে গেয়ে ভাষা আন্দোলনকে উজ্জীবিত করেন। গানটি তৎকালীন বাঙালি মনে দারুণ সাড়া জাগায় এবং ভাষা আন্দোলনের অন্যতম প্রেরণা হয়ে ওঠে। ১৯৫২ এর ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথ ভাষা শহীদদের রক্তে রঞ্জিত হলে চারণকবি শেখ সামছুদ্দিন আহমদ রচনা করেন ঐতিহাসিক ও কালজয়ী গান:
“রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করিলি রে বাঙালি
তোরা ঢাকার শহর রক্তে ভাসাইলি”
এভাবেই সাংস্কৃতিককর্মীরা গান, নাটক, পথনাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মাতৃভাষার অধিকারকে গণমানুষের দাবিতে রূপ দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে সাংস্কৃতিককর্মীদের অনন্য অবদান রয়েছে। ভাষা আন্দোলনের পর হতে ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান পর্যন্ত মুক্তিসংগ্রামের প্রতিটি ধাপে সাংস্কৃতিককর্মীরা সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। জুগিয়েছিলেন অদম্য সাহস আর শক্তি। গান, আবৃত্তি, নৃত্য, মঞ্চনাটক, পথনাটক, যাত্রাপালার মাধ্যমে জাগিয়ে তোলেন মুক্তিকামী বাঙালিকে। সংস্কৃতির আবহে তেজোদীপ্ত হয়ে বীর বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তির লড়াইয়ে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান, দেশের নানা প্রান্তে ভ্রাম্যমাণ গান-নাটকের পরিবেশনা মুক্তিযোদ্ধাদের মনে অদম্য সাহস জুগিয়েছিল ও বিশ্ববাসীর সমর্থন আদায় করেছিল। বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত কথিকা, চরমপত্র এবং গান মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত বিজয়ের পথে প্রবলভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। আপসহীন দেশাত্মবোধক গান ও চারণকবির গান মুক্তিকামী মানুষের মনে আশার আলো জ্বেলেছিল।
এভাবেই সাংস্কৃতিককর্মীরা যুগে যুগে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে গণমানুষের পাশে থেকেছেন। অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে থেকেছে। সাংস্কৃতিক আবহে গণমানুষকে উজ্জীবিত করেছে। স্বাধীনতার পূর্বে যেমন স্বাধীনতার পরেও তেমনি দাবি আদায়ের লড়াইয়ে, অন্যায়-অত্যাচার, স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে রাজপথে থেকেছে। গণমানুষকে জাগিয়ে তোলেছেন প্রতিবাদী গান, মঞ্চ নাটক,পথনাটক ইত্যাদির মাধ্যমে। বিচরণ করেছেন রাজপথে। সামিল হয়েছে গণমানুষের কাফেলায়।
এই সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিককর্মীরা আবার সময়ে সময়ে শাসকগোষ্ঠী ও অন্যান্য সংস্কৃতি বিরোধী গোষ্ঠী কর্তৃক আক্রান্ত হচ্ছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালে সরকার পতনের পর সংস্কৃতির উপর আক্রমণ শুরু হয়। সারাদেশে বিরাজ করে আতঙ্কজনক পরিবেশ। ফলে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম স্থিমিত হয়ে পড়ে বহুলাংশে। একটি গণতান্ত্রিক দেশে সরকার আসবে সরকার যাবে। এটা স্বাভাবিক চিত্র। সরকার পতনের সাথে দেশের সংস্কৃতির উপর আঘাত দেশকে পিছিয়ে দেয়ার নামান্তর। লক্ষণীয় বিষয় হলো, গত দুটি বছর সবচেয়ে বেশি আক্রমণ করা হয়েছে বাঙালি জাতির শেকড়ের সংস্কৃতি বাউল গানের উপর। অথচ এই বাউল গান ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত ৪৮টি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম। বিশ্বের দরবারে বাংলার সমৃদ্ধ সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করছে বাউল গান। বাউল গান আমাদের শেকড়ের সহজাত গান। বাউল গানে সৃষ্টিকর্তার কথা, সৃষ্টির কথা, সৃষ্টিতত্ত্বের কথা, মানবতার কথা, সহমর্মিতার কথা, সহনশীলতার কথা, সম্প্রীতির কথা, অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা বলা হয়। এছাড়া, আমাদের রয়েছে সমৃদ্ধ অন্যান্য লোকজ সংস্কৃতি। জারি, সারি, ভাটিয়ালি, পালাগান ইত্যাদি। এসবও আক্রমণের শিকার হয়।
একটি জাতির শেকড়ের সংস্কৃতি সেই জাতির আত্মপরিচয়ের ঠিকানা। আমাদেরও রয়েছে সহজাত শেকড়ের সংস্কৃতি, যে সংস্কৃতি আমাদের আত্মপরিচয়ের ঠিকানা। এই শেকড়ের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে জাতির স্বার্থেই। আর বাঁচিয়ে রাখার প্রথম দায়িত্বটা পালন করতে হবে এদেশের প্রতিটি সরকারকে। সচেতন মানুষ, সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ নানা সংগঠনকে সরব থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, পশ্চিমা সংস্কৃতি আমাদের সংস্কৃতি নয়, আরব্য সংস্কৃতি আমাদের সংস্কৃতি নয়, পাকিস্তানি বা ভারতীয় সংস্কৃতি আমাদের সংস্কৃতি নয়। শেকড়ের সহজাত সংস্কৃতিই বাঙালি জাতির সংস্কৃতি। আর যারা আক্রমণ করে তাদেরও মনে রাখা উচিত, নিজ দেশের শেকড়ের সংস্কৃতির উপর আক্রমণ করা চরম নির্বুদ্ধিতা। আক্রমণ করলেই শেকড়ের সংস্কৃতিকে মুছে ফেলা যায় না। মুছে ফেলা যাবেও না।
লেখক : সদস্য সচিব, পুরাকীর্তি সুরক্ষা কমিটি, ময়মনসিংহ অঞ্চল।
১২৬ বার পড়া হয়েছে