‘এখানকার সরকার আমি’ মন্তব্যে বিতর্ক: এমপির ক্ষমতার সীমা কোথায়?
বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬ ৭:০৬ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মুফতি মো. আমির হামজার সাম্প্রতিক কয়েকটি বক্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জনসভা ও প্রতিবাদ সমাবেশে তিনি নিজেকে কুষ্টিয়া সদরের “প্রধানমন্ত্রী” ও “এখানকার সরকার” হিসেবে উল্লেখ করেছেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের তাঁর অধীনস্থ হিসেবে তুলে ধরে তাঁদের কাজ করার নির্দেশ দেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
গত ১৬ আগস্ট কুষ্টিয়ায় এক সমাবেশে আমির হামজা বলেন, “এখানকার সরকারই আমি।” ডিসি ও এসপি নিরপেক্ষভাবে কাজ না করলে তাঁদের “বিদায় করে দেওয়া হবে” বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এর আগে ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওতে আগামী পাঁচ বছর কুষ্টিয়া সদর আসনের জন্য নিজেকে “প্রধানমন্ত্রী” হিসেবে আখ্যা দেন তিনি। উন্নয়ন বাজেট তাঁর হাতে দেওয়া হবে এবং তাঁর সময়ের সব উন্নয়ন তাঁর মাধ্যমেই হবে—এমন বক্তব্যও তাঁকে দিতে শোনা যায় বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বাংলাদেশের সংবিধান ও প্রশাসনিক কাঠামোতে একজন সংসদ সদস্যের ক্ষমতা এ রকম নয়। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৫ অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর কর্তৃত্বে প্রয়োগ হয় এবং মন্ত্রিসভা সংসদের কাছে যৌথভাবে দায়বদ্ধ। একজন এমপি প্রধানমন্ত্রী নন; তিনি রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানও নন। তাঁর সাংবিধানিক কাজ মূলত আইন প্রণয়ন, জাতীয় বাজেট ও নীতিনির্ধারণে অংশ নেওয়া, সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনী এলাকার সমস্যা জাতীয় সংসদ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরা।
ডিসি, এসপি ও ইউএনও রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কর্মকর্তা। ডিসি মাঠ প্রশাসনের দায়িত্ব পালন করেন; এসপি জেলায় পুলিশ প্রশাসনের নেতৃত্ব দেন; ইউএনও উপজেলা পর্যায়ে সরকারের নির্বাহী কাজ সমন্বয় করেন। তাঁরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সরকারি চাকরিবিধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক কমান্ড কাঠামোর অধীনে কাজ করেন—কোনো এমপির ব্যক্তিগত নির্দেশে নয়। দায়িত্বে অবহেলা বা অসদাচরণের অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে তদন্ত, বদলি বা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়, কিন্তু তা করতে হয় নির্ধারিত সরকারি প্রক্রিয়ায়। এমপির এককভাবে কাউকে জেলা থেকে “বিতাড়িত” করার ক্ষমতা নেই।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৯ ও ৬০ অনুযায়ী পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত স্বতন্ত্র সংস্থা। পৌর মেয়র, কাউন্সিলর, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও সদস্যরা এমপির অধস্তন নন; তাঁরা নিজ নিজ ভোটার, সংশ্লিষ্ট আইন এবং সরকারি তদারকি কাঠামোর কাছে জবাবদিহি করেন।
কোনো এলাকায় মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল, সড়ক বা বড় উন্নয়ন প্রকল্প প্রতিষ্ঠা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, বাজেট অনুমোদন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার প্রক্রিয়ার ফল। একজন এমপি প্রকল্পের দাবি তুলতে, বরাদ্দ আদায়ে ভূমিকা রাখতে ও কাজের তদারকিতে সহায়তা করতে পারেন। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে “আমিই মেডিকেল কলেজ চালু করেছি” বা এলাকার সব উন্নয়নের একক কৃতিত্ব দাবি করা রাজনৈতিক প্রচারণা হতে পারে; তা রাষ্ট্রীয় উন্নয়নব্যবস্থার আইনগত বাস্তবতা নয়।
১৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরে গণঅধিকার পরিষদ ও জামায়াতের নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি, হামলা ও হতাহতের অভিযোগ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য রয়েছে। গণঅধিকার পরিষদের দাবি, মুফতি আমির হামজার সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রতিবাদে তাদের পূর্বঘোষিত সমাবেশে হামলা হয়; এতে এক কর্মীর দুই পায়ের রগ কেটে যায় এবং আরেক নেতার নাকের হাড় ভাঙা ও কপাল ফাটাসহ কয়েকজন আহত হন। আহত কয়েকজনকে ঢাকায় চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে বলেও সংগঠনটি জানায়। তাদের অভিযোগ, পরে জেলা কার্যালয়, জেলা সাধারণ সম্পাদকের ব্যক্তিগত কার্যালয় ও এক নেতার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ একাধিক স্থাপনায় ভাঙচুর চালানো হয়। অন্যদিকে, এমপি আমির হামজার পক্ষ থেকে তাঁর গাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ করা হয়েছে।
ঘটনার পর উভয় পক্ষই থানায় পাল্টাপাল্টি মামলা করেছে। আমির হামজার ব্যক্তিগত সহকারী মোমিন বিশ্বাসের মামলায় গণঅধিকার পরিষদের ২৩ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ৪০ থেকে ৫০ জন অজ্ঞাতনামাকে আসামি করা হয়েছে। অন্যদিকে গণঅধিকার পরিষদের সদর উপজেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক রুমন হোসেনের মামলায় ১৩ জনের নাম উল্লেখসহ ৩০ থেকে ৩৫ জন অজ্ঞাতনামাকে আসামি করা হয়েছে। কুষ্টিয়া মডেল থানার তথ্য অনুযায়ী, উভয় এজাহারই মামলা হিসেবে রুজু হয়েছে; তবে তখন পর্যন্ত কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। ফলে সংঘর্ষের দায় কার এবং হামলা-ভাঙচুরে কারা জড়িত—তা নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব ক্ষমতার প্রদর্শন নয়; বরং আইন, প্রতিষ্ঠান ও জনগণের প্রতি জবাবদিহি বজায় রেখে উন্নয়ন-সমন্বয় করা। তাই “আমি এখানকার সরকার” ধরনের বক্তব্য স্থানীয় প্রশাসন ও নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের সাংবিধানিক স্বাতন্ত্র্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।
১২৮ বার পড়া হয়েছে