স্মৃতিতে আমার পিতাঃ সময়ের ব্যবধানে
শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬ ৬:৪৬ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
আজ আমার পিতা কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালীর বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও শিক্ষাবিদ মরহুম মাওলানা আবদুস ছাত্তারের তেইশতম মৃত্যুবার্ষিকী। গত কয়েক বছর ধরে এই দিনে আমি পোস্ট দিয়ে আসছি,যেখানে তার জীবন ও কর্মের উপর কিছু কিছু বলা হয়েছে। আজ উনার বিষয়ে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে কিছু লেখার চেষ্টা করব।
২০০২ সনের আজকের দিনে তিনি যখন ইন্তেকাল করেন তখন আমি নরসিংদীতে জেলা প্রশাসক হিসেবে কর্মরত। মৃত্যুবরণ করেন পরিণত বয়সেই, বয়স হয়েছিল ৯৩। মৃত্যুর সপ্তাহখানেক আগে জরুরী খবর পেয়ে আমি কুমারখালীতে যেয়ে হাজির হলাম, কিন্তু মনে হল বোধহয় উনি একটু সুস্থ হয়ে গেছেন। তাই আমি আবার ফিরে এলাম নরসিংদীতে।
জেলা প্রশাসকদের ছুটির বিষয়ে নিয়মকানুনের কোন রদবদল হয়েছে কিনা আমার এখন জানা নেই। আমাদের সময়ে কেবিনেট সেক্রেটারীর নিকট স্টেশন লিভের অনুমতি নিতে হতো।এছাড়া সাময়িক ছুটির জন্য বিভাগীয় কমিশনারের অনুমোদন লাগতো। অনেক সময় সৌজন্যবশত জেলার মন্ত্রীকে অবহিত করতেন কেউ কেউ । অবহিত না করলেও কিছু এসে যেত না।
আমার সেই সময়ের এই তিন ব্যক্তিই বর্তমানে অনন্তলোকে। তারা সবাই আমার প্রতি খুবই সহানুভূতিশীল ছিলেন। সেই সময়ের শ্রদ্ধেয় কেবিনেট সেক্রেটারীর নামের আগে অনেকে বর্তমানে বিভিন্ন বিশেষণ ব্যবহার করেন বলে শুনেছি ।
একটি ঘটনার কথা বলি,
আমার কনিষ্ঠ বোনের বিয়ের তারিখ ঠিক হয়ে যাওয়ার পর আমি ছুটির আবেদন করেছিলাম। কিন্তু ছুটি মিলল না অজ্ঞাত কারণে। বাধ্য হয়ে বিয়ের তারিখই পরিবর্তন করতে হলো।
নরসিংদীতে ফিরে আসার দুই দিন পরই জানলাম, পিতার অবস্থা খুবই খারাপ। ঠিক পরপরই আমাদের তৃতীয় ভাই প্রফেসর কাজী মনজুর কাদির জানালো, আব্বা নেই। আব্বার শেষ দিনগুলোতে এই ভাইটিই সবচেয়ে বেশি আব্বার দেখাশোনা করছিল। আবার সপরিবারে নরসিংদী থেকে কুমারখালীর পথে রওনা দিলাম, বিভাগীয় কমিশনারকে টেলিফোনে জানিয়ে।
সেদিন পথে যেতে যেতে বায়োস্কোপের পর্দার মতো আব্বার নানা স্মৃতি, কথা, আদেশ উপদেশ মনের পর্দায় ভেসে আসছিল। তিনি লেখাপড়া করেছিলেন ব্রিটিশ ভারতের কলকাতায়। কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেন।বর্তমানে এটি কলকাতা আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। তার আগে বগুড়ায় একটি মাদ্রাসায় পড়ে ছিলেন। কাল ক্রমে আমি যখন বগুড়ায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক তখন পদাধিকারবলে সেই মাদ্রাসার সভাপতি হয়েছিলাম। তখন ওই মাদ্রাসার প্রায় সবগুলি সভা আমি করতাম সেখানে উপস্থিত হয়ে। আমার জন্য সেটা ছিল এক গর্বের ব্যাপার।
তার কলকাতার ছাত্র জীবনের কিছু কিছু বিষয় ইতোপূর্বে বিভিন্ন পোস্টে লিখেছি। বিশেষ করে সেই সময়ে বিশিষ্ট সব মুসলিম চিন্তাবিদ ও সমাজ নেতাদের সঙ্গে তার ওঠাবসা হয়েছিল। তিনি থাকতেন এলিয়ট হোস্টেলে, বেকার হোস্টেলের পাশেই।
কর্মজীবনে তিনি ছিলেন মুসলিম ম্যারেজ রেজিস্ট্রার এন্ড কাজী, প্রধান মাওলানা কুমারখালী এম এন হাই স্কুল এবং কুমারখালী বড় জামে মসজিদের ইমাম। এর বাইরে আরও অসংখ্য সামাজিক ও বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কুমারখালী পৌরসভার কমিশনার ছিলেন কয়েক দফায়। কুষ্টিয়া জেলা জজ আদালতে
জুড়ি বোর্ডের সদস্য মনোনীত হয়েছিলেন বহুবার।
প্রতিদিন প্রভাতে তাঁর মধুর কোরআন তেলাওয়াতের শব্দে আমাদের ঘুম ভাঙতো। এর ব্যত্যয় খুবই কম ঘটতে দেখেছি। পোশাকে আশাকে ছিলেন সবসময়ই রুচিশীল। ছকে বাঁধা জীবনে তার দিন চলত। সব সময় হেঁটেই চলাফেরা করতেন। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে ছিলেন খুবই অভিজাত। পকেটের শেষ টাকাটিও খরচ করে ঘরে ফিরতেন। তিনি মনে করতেন পরেরদিন আল্লাহই চালাবে। আল্লাহর উপর এই অগাধ নির্ভরশীলতা আমি খুব কম লোকের মধ্যেই দেখেছি।
আরবী, ফারসি উর্দু, হিন্দি ও ইংরেজী ভাষায় তাঁর ভালো দখল ছিল। এম এম আর এন্ড কাজী হিসেবে তার নিয়োগপত্রটি এখনো আমার কাছে আছে। নিয়োগ পেয়েছিলেন ব্রিটিশ আমলে লর্ড ওয়াভেল এর সময়ে। মনেপ্রাণে তিনি ছিলেন একজন অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তি। ছেলেবেলায় দেখেছি ভোরবেলায় পানি পড়ানোর জন্য আমাদের বাড়িতে মানুষের ভিড় পড়ে যেত। এদের অনেকেই থাকতেন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। তিনি পানি পড়ে ফুঁ দিয়ে দিতেন। কেন যেন মানুষের এর উপরে বিশ্বাস ছিল।
অন্যদিকে মনেপ্রাণে ছিলেন একজন সম্পূর্ণ আধুনিক মানুষ, মন ও মননে। কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্রদের অনেকটাই প্রগতিশীল ধ্যান-ধারণার মধ্য দিয়ে তৈরি করা হতো, তার মধ্যেও তার প্রতিফলন ছিল। ইংরেজি ভাষার চর্চা তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমাকে উৎসাহিত করতেন, ছেলেবেলা থেকেই। কেউ ইংরেজিতে তার সঙ্গে কথা বললে খুশি হতেন। বলতেন উপযুক্ত লোক।
আব্বাকে কারো সঙ্গে উচ্চস্বরে ঝগড়া করতে কখনো দেখেছি বলে মনে পড়ে না। উচ্চ নীচ পন্ডিত মূর্খ, ধনী-গরীব, নারী পুরুষ, তরুণ বৃদ্ধ সবার সঙ্গেই আব্বা মিষ্টস্বরে আলাপ করতেন। স্কুলে ছাত্রদের সঙ্গে আচরণ ছিল খুবই স্নেহপরায়ণ। কখনো কখনো এমন হয়েছে যে, কোন কোন ছাত্রের পিতা কিংবা দাদাও স্কুলে উনার ছাত্র ছিলেন। সম্বোধনেও তা প্রকাশ পেত।
অনাবৃষ্টির কারণে একবার খুবই অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। হাশিমপুর দয়রামপুর এলাকা থেকে একদল মানুষ এসে আব্বাকে নিয়ে যায় সেখানে এক মোনাজাত পরিচালনা করার জন্য,যাতে বৃষ্টি হয়। আব্বা সেখানে যেয়ে সকলের সঙ্গে মোনাজাতে অংশগ্রহণ করেন এবং আল্লাহর দরবারে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করতে থাকেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝমঝম করে বৃষ্টি এসে যায়। এখনো ওই এলাকার প্রবীণ লোকেরা এই গল্প করে থাকেন।
শৈশবে আমরা ভাইবোনেরা আব্বাকে খুব ভয় পেতাম। আব্বা যতক্ষণ বাড়িতে থাকতেন ঘরের বাইরে যাবার সাহস হতো না। আমার শৈশব মানেই ষাটের দশক। যখন বাড়ির পাশেই জে এন স্কুলে ক্লাস থ্রিতে পড়ি তখন আব্বা আমাকে জীবনে প্রথমবারের মতো একটি ফাউন্টেনপেন কিনে দেন। তিনি আমার স্কুলে গিয়েছিলেন এবং আমাকে ডেকে নিয়ে পকেট থেকে বের করে কলমটি আমাকে দেন। জীবনে অনেক কিছু ভুলে গিয়েছি কিন্তু এই স্মৃতিটি কেন যেন আজও মনে আছে।
ছেলেবেলায় আব্বার কাছ থেকে এক আনা চেয়ে নিতাম। এটা চাইবার পূর্ব পর্যন্ত অনেকক্ষণ তার সামনে বসে থেকে থেকে সাহস সঞ্চয় করতাম। তখনো নয়া ছয় পয়সার আনা শুরু হয়নি। চার পয়সায় ছিল এক আনা।
জীবনের প্রথম তিনবার ঢাকায় এসেছিলাম আব্বার সঙ্গে। ১৯৬৪ সনে আব্বার সঙ্গে সিলেট গিয়েছিলাম, যখন আমি চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র। সেসময় হযরত শাহজালাল( রহঃ) এর মাজারে বসে আব্বা আমাকে কোরআন শরীফের সবক দিয়েছিলেন। ঢাকাতে আব্বার প্রিয় ছিল চকের মসজিদ। সব সময় চেষ্টা করতেন সেখানে যেয়ে নামাজ পড়তে।
দুশ্চিন্তা কিংবা টেনশন বলতে যা বোঝায় আব্বার মধ্যে তা খুব কমই দেখেছি। বরং বেশিরভাগ সময় হাসি খুশি থাকতেন। কোন সমস্যা দেখা দিলে কিছুক্ষণ ভেবে পরক্ষণেই আবার নিজেকে সামলিয়ে নিতেন।সন্তানদের লেখা পড়ার বিষয়টি তাঁর কাছে ছিল সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এমনকি এর জন্য তিনি পৌর এলাকার একটি মূল্যবান জমিও বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন, আমাদের অজান্তেই।
স্থানীয় ইতিহাসবেত্তাদের মতে আমাদের পূর্বপুরুষরা ইসলাম প্রচারের জন্য সুদূর ইরাক থেকে এ দেশে এসেছিলেন। বাইরে প্রকাশ না করলেও ভেতরে ভেতরে তিনি বংশ গর্বে গর্বিত ছিলেন।
১৯৮৬ সন থেকে যাবতীয় কাজ কর্ম থেকে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। তার তেমন কোনো জটিল রোগ ছিল না। তবে জীবনের শেষের দিকে স্মৃতিশক্তি অনেকটাই কমে যায়।
কুমারখালীতে খোন্দকার আব্দুল হালিম ও মীর মোরশেদ আলী সমন্বয়ে মাওলানা আবদুস ছাত্তার স্মৃতি পরিষদ নামে একটি পরিষদ রয়েছে। প্রথম কয়েক বছর মৃত্যু দিবসে আলোচনা সভার আয়োজন করা হতো। বর্তমানে উনারাও বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত। আমরা সন্তানেরাও ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছি এদিক সেদিক। তাই মৃত্যুদিবসে দোয়া খায়ের ও মিলাদ মাহফিলের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে কুমারখালীর কয়েকটি মসজিদে। এবারেও সেরকমই ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমরা সন্তানেরা যোগ্য নই, হয়তো উনার জন্য আরও অনেক কিছু করার দরকার ছিল, কিন্তু পারিনি। এই ব্যর্থতা লুকোনোর জায়গা নেই।
আপনারা আমার আব্বার জন্য দোয়া করবেন।
লেখক: সাবেক সচিব।
(লেখাটি লেখকের ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে)
১২৮ বার পড়া হয়েছে