সর্বশেষ

ফেবু লিখন

মৃত্যুর সিরিয়াল নেই, পূর্বঘোষণাও নেই- এটাই নির্মম বাস্তবতা

হাবীব চৌহান
হাবীব চৌহান

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬ ৬:৪১ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
আজ আমাদের অনেকের ঘনিষ্ঠ দু'জন মানুষের মৃত্যুর খবর পেলাম। প্রতিদিনই এমন মৃত্যুর খবর আসে। তাদের কেউ পরিচিত, কেউ বন্ধু, কেউ আত্মীয়, এমনও কেউ—যার সঙ্গে হয়তো জীবনে একবারও দেখা হয়নি।
প্রতিদিনই এমন অনেক নারী-পুরুষ ও শিশুসহ কত মানুষ পৃথিবীর মঞ্চ থেকে নিঃশব্দে বিদায় নিচ্ছেন। আর খবরের কাগজে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিংবা মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ছে সেই সংবাদ—‘অমুক আর নেই।’
হাবীব চৌহান

কারো মৃত্যুর খবরে আমরা কিছুক্ষণের জন্য থমকে যাই। বুকের ভেতর একটা চাপা কষ্ট হয়। তারপর আবার জীবন তার নিজস্ব গতিতে ফিরে আসে। আমরা আবার কাজে ছুটে যাই, ব্যবসা করি, চাকরি করি, টাকা গুনি, সম্পদ বাড়াই, পদ-পদবি নিয়ে গর্ব করি, ক্ষমতার দাপট দেখাই, মানুষের সঙ্গে অহংকার করি। যেন আমাদের হাতে অনন্ত সময় জমা আছে!

অথচ সবচেয়ে বড় সত্যটি আমরা জেনেও ভুলে থাকি—আমাদের কারও হাতে এক মিনিট সময়ও জমা নেই।
আমাদের জন্মের একটা সিরিয়াল আছে। কেউ আগে আসে, কেউ পরে। কিন্তু মৃত্যুর কোনো সিরিয়াল নেই। মৃত্যুর কোনো বয়স নেই, কোনো পূর্বঘোষণাও নেই।

মৃত্যু কখনো দরজায় কড়া নেড়ে বলে না— আমি আগামীকাল আসব। সে হঠাৎ আসে। কখনো ভোরে, কখনো দুপুরে, কখনো সন্ধ্যায়, কখনো গভীর রাতে। কখনো হাসির মুহূর্তে, কখনো ঘুমের মধ্যে, কখনো প্রিয়জনের পাশে, আবার কখনো একেবারে একা। এটাই মৃত্যুর নির্মম বাস্তবতা।

আমরা অন্যের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করি, কিন্তু নিজের মৃত্যুকে যেন অসম্ভব কোনো ঘটনা মনে করি। পরিচিত কেউ মারা গেলে বলি—‘আহা, মানুষটা তো ভালোই ছিল!’ তারপর কয়েকদিন পর সব ভুলে যাই। অথচ যে মানুষটির মৃত্যুতে আজ শোক প্রকাশ করছি, কাল সেই একই সংবাদ হয়তো আমাদের নামেও লেখা হবে।
কিন্তু কবে? কখন? কেউ জানে না।

আজ যে মানুষটি সকালে ঘর থেকে বের হয়েছেন, তিনি হয়তো জানেন না—এটাই তার শেষ বের হওয়া।
যে মানুষটি পরিবারের সঙ্গে বসে খেয়েছেন, জানেন না—এটাই হয়তো তার শেষ খাবার।
যে বন্ধুকে ফোন করে বলেছেন, পরে কথা বলব, তিনি জানেন না—সেই ‘পরে’ আর কোনোদিন নাও আসতে পারে।

জীবন আসলে এই ‘হয়তো’-র ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
হয়তো আজ রাতেই। হয়তো আগামীকাল ভোরে।
হয়তো সন্ধ্যার আগে। হয়তো সকালের নাস্তার টেবিলে।
হয়তো দুপুরের ব্যস্ততায়। হয়তো কোনো রাস্তার মোড়ে।

হয়তো হাসপাতালের বিছানায়। অথবা একেবারেই কোনো পূর্বাভাস ছাড়া। তবু আমরা কত অহংকার করি!

একটু টাকা হাতে এলেই মনে করি, জীবন আমাদের নিয়ন্ত্রণে। একটু ক্ষমতা পেলেই মনে করি, মানুষ আমাদের সামনে মাথা নত করবেই। একটু পরিচিতি পেলেই মনে করি, আমরা অন্যদের চেয়ে বড়। সামান্য স্বার্থের জন্য ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করি, বন্ধুকে দূরে ঠেলে দিই, আপনজনকে কষ্ট দিই, মানুষের অধিকার কেড়ে নিই। ক্ষমা চাইতে লজ্জা পাই, ভালোবাসার কথা বলতে সংকোচ করি, অভিমান ভাঙাতে অহংকারে আটকে থাকি। কিন্তু মৃত্যু এসে যখন দাঁড়াবে, তখন এসবের কোনো মূল্য থাকবে না। সেদিন ব্যাংকের ব্যালান্স কথা বলবে না। পদ-পদবি কথা বলবে না। ক্ষমতার চেয়ার কথা বলবে না। বাড়ি-গাড়ি কথা বলবে না। মানুষকে দেওয়া কষ্টের কোনো ব্যাখ্যাও কাজে আসবে না।

সেদিন সঙ্গে যাবে শুধু আমাদের কর্মের স্মৃতি—মানুষের মনে আমরা কেমন ছিলাম, কতটা ভালোবাসা দিয়ে গেছি, কতটা কষ্ট দিয়ে গেছি। অথচ এই সহজ সত্যটুকু বুঝতে আমাদের কত দেরি! আমরা মৃত্যুকে ভয় পাই, কিন্তু মৃত্যুর আগের জীবনটাকে নিয়ে খুব কমই ভাবি। মানুষের মন ভাঙতে আমাদের এক মুহূর্ত লাগে, কিন্তু সেই ভাঙা মন জোড়া লাগানোর চেষ্টা করতে আমাদের অহংকার বাধা দেয়। ‘আমি কেন আগে ফোন করব?’—এই ছোট্ট অহংকারের কারণে কত সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়। ‘সময় নেই’ বলতে বলতে কত প্রিয় মানুষকে সময় দেওয়া হয় না। তারপর একদিন খবর আসে— ‘সে আর নেই।’

তখন আর ফোন করা যায় না। আর দেখা করা যায় না। আর অভিমান ভাঙানো যায় না। আর বলা যায় না—‘ভাই, কেমন আছো?’ আর বলা যায় না—‘তোমাকে কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা করো।’

মৃত্যু মানুষকে কাঁদায়, কিন্তু তার চেয়েও ভয়ংকর হলো—মৃত্যু আমাদের বুঝিয়ে দেয়, আমরা জীবিত থাকতেই কত কিছু করার সুযোগ নষ্ট করেছি। তাই মৃত্যুর কথা মনে পড়লে আতঙ্কিত হওয়ার চেয়ে সতর্ক হওয়া দরকার।
তাই যাকে ভালোবাসেন, তাকে ভালোবাসার কথাটি আজই বলুন। যাঁর সঙ্গে অভিমান, সম্ভব হলে আজই অভিমান ভাঙান। কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা চান। কারও প্রয়োজন হলে পাশে দাঁড়ান। কারণ আগামীকাল আপনার হাতে থাকবে—এমন নিশ্চয়তা পৃথিবীর কোনো মানুষকে দেওয়া হয়নি।

আমিও জানি না, আমার মৃত্যুর সেই মুহূর্তটি কবে ও কখন আসবে। হয়তো কোনো এক নিশুতি রাতে। হয়তো কোনো এক ভোরের আলোয়। হয়তো ব্যস্ত দুপুরে। হয়তো বিকেলের শেষ সূর্যালোকে। হয়তো আপনজনের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই। সেদিন আমাকে আমার সবকিছু ছেড়ে যেতে হবে। আপনজন, পরিচয়, ব্যস্ততা, স্বপ্ন, অভিমান—সব। তাই আজকের এই জীবনটুকু নিয়ে এত অহংকার কিসের? যে মানুষ জানে না তার শেষ দিন কোনটি, তার এত অহংকার মানায় না। মৃত্যু আমাদের কাউকেই ছাড়বে না। ধনী-গরিব, ক্ষমতাবান-ক্ষমতাহীন, পরিচিত-অপরিচিত—সবার ঠিকানা একদিন একই হবে।

পার্থক্য শুধু এতটুকু— কে কতদিন বেঁচে থাকল, তা হয়তো আমাদের হাতে নেই; কিন্তু যতদিন বেঁচে আছি, কীভাবে বেঁচে থাকব—সেটুকু এখনো আমাদের হাতে। তাই মানুষকে কষ্ট দেওয়ার আগে একবার ভাবুন।
অহংকার করার আগে একবার থামুন। ক্ষমা চাইতে দেরি করবেন না। ভালোবাসতে কার্পণ্য করবেন না। কারণ মৃত্যুর কোনো সিরিয়াল নেই। আজ অন্যের নাম শুনে আমরা শোক প্রকাশ করছি। কাল সেই তালিকায় কার নাম থাকবে, কেউ জানে না। তবে থাকতে পারে- হয়তো আপনার। হয়তো আমার।

(আজ আমাদের অনেকেরই ঘনিষ্ঠ দু'জন মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন)

লেখক: সাংবাদিক।
(লেখাটি লেখকের ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে)

১২২ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
ফেবু লিখন নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন