সর্বশেষ

ফেবু লিখন

আগস্টের আগুনের আঁচে ফের ভাতৃহারা হলাম

শৈবাল আদিত্য
শৈবাল আদিত্য

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬ ৭:৩৯ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
কিছু কিছু মৃত্যু সংবাদ হয়ে আসে না—এসে দাঁড়ায় বুকের ভেতর এক অমোচনীয় শোক হয়ে। একটি অকাল মৃত্যু কেবল একটি প্রাণ-প্রদীপ নিভিয়ে দেয় ব্যাপারটা তা না, একটি মৃত্যু নিভিয়ে দেয় একটি পরিবারের আশা ও ভালোবাসার প্রদীপও, নিভিয়ে দেয় একটি সম্ভাবনার বিচ্ছুরণ৷ ম্লান করে দেয় স্বজন-সুহৃদ-সহকর্মী বা বন্ধুদের হাসি-আনন্দ আর স্মৃতিমাখা আড্ডার ঔজ্জ্বল্য। আর কিছু মৃত্যু এমনভাবে এসে পুরোনো ক্ষতকে আবার রক্তাক্ত করে, যেন সময়ের কোনো পর্দাই তাকে ঢেকে রাখতে পারে না।
সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত ও তার স্ত্রী পুত্র

দেবাশীষ দত্তের মৃত্যুসংবাদ আমার কাছে ঠিক তেমনই এক দুঃসংবাদ। ১৯ আগস্ট ভোরে কলকাতার একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে গেছে নয়টি প্রাণ। সেই নয়টি নিথর শরীরের মধ্যে ছিল কুষ্টিয়ার তরুণ, সৎ ও সাহসী সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত; তার স্ত্রী আফসানা শারমীন; তিন বছরের শিশুপুত্র স্বর্ণশীষ এবং দেবাশীষের শ্বশুর মো. আকরাম হোসেন। একসাথে ঝরে গেল একটি পরিবারের— চারটি জীবন— আগুনের লেলিহান শিখায় মুহূর্তে ইতিহাস হয়ে গেল।

দেবাশীষের পরিচয় শুধু একজন সাংবাদিক হিসেবে দিলে তাকে ছোট করে দেখা হবে। সে ছিল মাঠপর্যায়ে বিচরণ করা অকুতোভয় একজন সংবাদযোদ্ধা। কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজকের আলোর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, চ্যানেল নাইন ও জাতীয় দৈনিক আজকের পত্রিকার কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি। পেশাগত জীবনে সততা, সাহসিকতা, একনিষ্ঠতা ও প্রজ্ঞার যে সমন্বয় একজন সাংবাদিককে মানুষের আস্থার জায়গায় পৌঁছে দেয়, দেবাশীষ সেই পথেই ছিল আগুয়ান।

পেশা হিসেবে সাংবাদিকতা যেমন অ্যাডভেঞ্চারের, ঠিক তেমনি অনেক সময় নিষ্ঠুর আর নির্মমও৷ সংবাদযোদ্ধা মাটি ও মানুষের গল্প বলেন। সম্ভাবনার; পরাজয়ের, আনন্দ ও মাতমের, একতার ও ভাঙনের, সম্মিলন ও যুদ্ধের, সফলতার ও বিপন্নতার, অনিয়ম-দুর্নীতি আর অত্যাচারের সকল কাহিনী রাষ্ট্র করে দেন৷ অন্যের বিপদে ছুটে যাওয়া, দুর্ঘটনার ধোঁয়ার ভেতর দাঁড়িয়ে সত্যের খোঁজ করা, স্বজনহারাদের কান্নার মধ্যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে আনা। তারপর রাত জেগে সেই সংবাদ পৌঁছে দেয়া মানুষের দরজা ও দৃষ্টিসীমানায়।
কিন্তু নিয়তির কী নির্মম পরিহাস!

একদিন সেই সাংবাদিক নিজেই সংবাদ হয়ে যান! যে মানুষটি অন্যের মৃত্যুর খবর লিখত, একদিন তার নিজের মৃত্যুর খবরই সহকর্মীদের লিখতে হয়। যে কলম অন্যের কান্নাকে ভাষা দিত, সেই কলমের মানুষটির জন্য একদিন অগণিত চোখ অশ্রুসিক্ত ঝাপসা হয়ে আসে। যে কণ্ঠ ফোনের ওপাশে পরিচিত ছিল, যে মানুষটি সংবাদকক্ষের ব্যস্ততায় সহযোদ্ধাদের পাশে থাকত, কোনও একদিন হয়তো তার নামের পাশেও লিখতে হয়— ‘নিহত’ শব্দটি! সহকর্মী বা অন্য স্বজনদের জন্য এটা নির্মম বাস্তবতার এক বেদনাবিধুর অধ্যায়!
এ এক এমন সংবাদ, যা লেখা যায়; কিন্তু মেনে নেওয়া কষ্টকর।

দেবাশীষ চিকিৎসার জন্য অসুস্থ স্ত্রী আফসানা শারমীনকে নিয়ে গত ৩ আগস্ট ভারতে গিয়েছিল। সঙ্গে ছিল ৩ বছরের ছোট্ট শিশুপুত্র আর শ্বশুর৷ বেঙ্গালুরুতে টানা ১৩ দিনের চিকিৎসা শেষে ১৮ আগস্ট তারা কলকাতায় ফিরেছিল দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিয়ে। হয়তো ব্যাগে ছিল প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস, হয়তো স্ত্রী-সন্তানের জন্য কেনা ছোটখাটো উপহার, হয়তো বাড়িতে রেখে যাওয়া আট বছরের কন্যা মাহিমার জন্য জামা আর চকলেট। তারপর একটি রাত। একটি হোটেল। একটি আগুন। আর তারপর— সব শেষ।

কত অদ্ভুত, কত নিষ্ঠুর এই অপ্রত্যাশিত ‘শেষ’!

কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ার হরিবাসর এলাকায় নিজের বাড়িটিতে এখন আর চারজন মানুষ ফিরবে না। ফিরবে না দেবাশীষ। ফিরবে না আফসানা। ফিরবে না ছোট্ট স্বর্ণশীষ। ফিরবেন না শ্বশুর আকরাম হোসেনও।
কিন্তু একটি শিশু অপেক্ষা করবে। আট বছরের মাহিমা দত্ত হয়তো এখনও পুরোপুরি বুঝতে পারেনি মৃত্যুর অর্থ। সে হয়তো জানে, বাবা-মা তার জন্য জামা আর চকলেট কিনেছে। সে হয়তো মনে মনে অপেক্ষা করছে—কখন দরজায় কড়া নাড়বে বাবা, কখন মা তাকে জড়িয়ে ধরবে, কখন ছোট ভাইটি তার পাশে এসে বসবে।
কী করে তাকে বোঝানো যায়—কিছু অপেক্ষার কোনো শেষ নেই? কী করে বলা যায়—যে বাবা-মায়ের ফেরার পথের দিকে সে তাকিয়ে আছে, তারা আর কোনোদিন সেই দরজা দিয়ে ঢুকবে না?

এই একটি শিশুর মুখের দিকে তাকালেই পৃথিবীর সব শব্দ যেন থেমে যায়।

‘আহারে নিভে গেল জীবন প্রদীপ’—এই দীর্ঘশ্বাসের চেয়ে বড় কোনো শোকবাক্য হয়তো নেই।
আর আমার ব্যক্তিগত শোকের জায়গাটি আরও গভীরে প্রোথিত। দেবাশীষ ছিল আমার অকালপ্রয়াত একমাত্র ছোটভাই রাকিব রিকোর বাল্যবন্ধু। ঐতিহ্যবাহী মোহিনী মোহন বিদ্যাপীঠের সহপাঠী৷ শৈশবের যে বন্ধুত্ব সময়ের দূরত্বেও মুছে যায় না, দেবাশীষ ছিল সেই স্মৃতিরই একজন জীবন্ত বাহক। রিকো নেই। বহু বছর ধরে তার অনুপস্থিতির সঙ্গে মৃতবৎ জীবনে বসবাস করছি আমরা, মানে আমি আর আম্মা। আব্বা তো রিকোর শোকে ওর চলে যাওয়ার মাত্র দুই বছরের মাথায় নিজেও অনন্তে পাড়ি দিলেন৷ প্রতি বছর আগস্ট এলে সেই পুরোনো শোক আরও তীব্রতর হয়ে ফিরে আসে। ৩০ আগস্ট রিকোর মৃত্যুবার্ষিকী।

আর এবার সেই আগস্টেই, ১৯ আগস্ট, রিকোর বন্ধু দেবাশীষও চলে গেল মেঘের ওপারে।
কী অদ্ভুত নিয়তি!

একই আগস্ট— এই আগস্টে; ১৯৭৫ সালে সপরিবারে নির্মমভাবে মারা গিয়েছিলেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান৷

নিজের একমাত্র সহোদরের শোক এখনও কাটিয়ে উঠতে পারিনি গত ছয় বছরেও৷ আজ চলে গেল খুবই আদরের; স্নেহের আরেক ছোটভাই দেবাশীষ৷ স্ত্রী-সন্তান-শ্বশুরসহ পাড়ি জমালো অনন্তে! আগস্টের শোক ক্রমশ ভারী হচ্ছে! কেবল একটি কথাই মনে আসছে— জীবন ও মৃত্যু কত কাছাকাছি থাকে! যেভাবে বাতাসে লুকিয়ে থাকে ঝড়৷ দেবাশীষের এই মর্মান্তিক প্রস্থান বহুদিন অব্দি দীর্ঘশ্বাস হয়ে; দগদগে ক্ষত হয়ে ছেয়ে থাকবে পরিবার-স্বজন ও সহযোদ্ধাদের মনে।

জানি না, মৃত্যুর ওপারে বন্ধুত্বের কোনো পৃথিবী আছে কি না। জানি না, রিকো আর দেবাশীষ কোথাও আবার পাশাপাশি দাঁড়িয়ে খোশগল্পে মেতে উঠবে কি না। কিন্তু একজন বড়ভাই হিসেবে আমার শোকের গভীরে আজ একটি অদ্ভুত কল্পনা বারবার ফিরে আসে— হয়তো বহুদিন পর দুই বাল্যবন্ধুর দেখা হয়েছে। হয়তো রিকো অবাক হয়ে বলেছে, ‘দেবা, তুই এখানে?’এই কল্পনাটুকুই হয়তো এই অসহনীয় শোকের মধ্যে এক বিন্দু সান্ত্বনা। চোখের কোন ভিজে উঠছে বারংবার৷

দেবাশীষের মৃত্যু শুধু তার পরিবারের চারটি জীবনকে কেড়ে নেয়নি; কুষ্টিয়ার সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার পরিমণ্ডল থেকে খসে পড়লো একটি নক্ষত্র৷ চিরমৌনতায় ডুব দিল একটি সাহসী কণ্ঠস্বর। একটি কলম থেমে গেল৷ মাটি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গল্প বলার জন্য যে মানুষটি ছুটে বেড়াত, তার নিজের জীবনের আখ্যান রয়ে গেল অসমাপ্ত।

সাংবাদিকেরা অন্যের বিপদের খবর করতে গিয়ে নিজের ক্লান্তি ভুলে যায়। পরিবারকে সময় দেওয়ার বদলে তারা ছুটে যায় ঘটনাস্থলে। রাত গভীর হলে সংবাদ পাঠায়। কখনও ক্ষমতাবানের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করে, কখনও নিঃস্ব মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তার না-বলা কথাটুকু তুলে ধরে। সেই সাংবাদিক যখন নিজেই মৃত্যুর সংবাদ হয়ে যায়, তখন সংবাদকক্ষের কীবোর্ডও যেন শোক করতে থাকে।

দেবাশীষ, তুমি হয়তো আর কোনোদিন সংবাদকক্ষে ফিরবে না। তোমার ফোন আর বাজবে না। কোনো ঘটনার খবর পেয়ে তুমি আর ছুটে যাবে না। কোনো অন্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে আর প্রশ্ন করবে না। তোমার লেখা কোনো নতুন প্রতিবেদন আর প্রকাশিত হবে না।
কিন্তু একজন সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকের মৃত্যু তার প্রশ্নের ধার, তার সততা আর অদম্যতার গল্পের যবনিকা টানতে পারে না।

তোমার কলম থেমেছে, কিন্তু তোমার রেখে যাওয়া সাহসের গল্প থামবে না। তোমার সহকর্মীরা তোমাকে মনে রাখবে। কুষ্টিয়ার মানুষ তোমায় মনে রাখবে। তোমার বন্ধুরা মনে রাখবে। আর একজন বড়ভাই হিসেবে আমি তোমাকে মনে রাখব—আমার হারিয়ে যাওয়া ছোটভাই রাকিব রিকোর বাল্যবন্ধু হিসেবে; একসঙ্গে বেড়ে ওঠা এক প্রজন্মের স্মৃতির অংশ হিসেবে; এবং একজন সাহসী সংবাদযোদ্ধা হিসেবে, যে অসময়ে, নির্মমভাবে, ঘাতক আগুনের লেলিহান শিখায় হারিয়ে গেল।

তোমার ছোট্ট মেয়ে মাহিমা একদিন বড় হবে। হয়তো সে একদিন বুঝবে তার বাবা কেমন মানুষ ছিলেন। হয়তো পুরোনো সংবাদপত্রের পাতা খুলে সে দেখবে—তার বাবা শুধু তার বাবা ছিলেন না; তিনি ছিলেন মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, আনন্দ-বেদনার গল্প বলা একজন সাংবাদিক।
সেদিন হয়তো মাহিমা বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে বলবে—
‘I am proud of you, Dad.’

এর চেয়ে বড় কোনো পরিচয় একজন মানুষের আর কী-ই বা হতে পারে?

দেবাশীষ, তোমার জন্য আজ কোনো এলিজি বা এপিটাফ লিখতে বসি নি। লিখছি হৃদয়ের গহীন থেকে উৎসারিত শোকগাঁথা। আগস্টের আগুন তোমার জীবন কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু তোমার স্মৃতি কেড়ে নিতে পারবে না। রিকোর চলে যাওয়ার শোকের সঙ্গে তোমার চলে যাওয়ার বেদনা আজ আমার হৃদয়ের একই ঘরে এসে বসেছে। একজন ছিল আমার ছোটভাই। আরেকজন ছিল তার বাল্যবন্ধু। দুজনেই আজ নেই। শুধু আগস্ট আছে। এক দীর্ঘ, বিষণ্ন আগস্ট— যে আগস্টের বাতাসে এখন বন্ধুর জন্য বন্ধুর ডাক শুনি, ভাইয়ের জন্য ভাইয়ের কান্না শুনি; আর দূরে কোথাও, অদৃশ্য কোনো আকাশের নিচে, হয়তো দুই পুরোনো বন্ধু আবার পাশাপাশি হাঁটছে। দেবাশীষ, তোমার এই অসময়ে চলে যাওয়ার কাছে আমাদের সব শব্দ পরাজিত।

শুধু এটুকু বলতে পার—
যেখানেই থাকো, ভালো থেকো, ভাই আমার।
রিকোর কাছে পৌঁছে তাকে বলো—
তার জন্য আম্মু এখনও খাবার টেবিলে প্লেট সাজিয়ে রাত জেগে বসে থাকে৷ জানালায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে পথের দিকে একপানে চেয়ে আদরের সন্তানের ঘরে ফেরার প্রতীক্ষায় থাকে ৷

তাকে বলো— ভাইয়ার জীবনের সকল আনন্দ আর স্বর্ণালী আলোটুকু সে সাথে করে নিয়ে গ্যাছে৷ এখনও প্রতি রাতে ভাইয়ার মাথার বালিশ ভিজে যায়, খেতে বসলে সবার অগোচরে খাবারের থালায় নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ে অশ্রুধারা৷ প্রায়শই মাঝরাতে হঠাৎ চিৎকার করে ডুকরে কেঁদে ওঠে নিঃসঙ্গ ভাইটি তার৷ নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে৷
আমার সোনাভাইটাকে বলো— ভাইয়া তাকে খুব খুব খুউব মিস করে!

বিদায়, সাহসী সংবাদযোদ্ধা।
বিদায়, প্রিয় দেবাশীষ।
তোমার কলম থেমেছে ঠিকই— কিন্তু তোমার স্মৃতি অমলিন থাকবে বহু হৃদয়ে৷ তোমার কথন ও চর্চা সরব থাকবে কুষ্টিয়া শহরের পথে-ঘাটে, প্রতিটি ধূলিকণায়!

লেখকঃ সাংবাদিক, কলামিস্ট ও কবি।
(লেখাটি লেখকের ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে)

১৩৯ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
ফেবু লিখন নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন