গ্যাস সংকট
স্থবির শিল্প খাত, উৎপাদন ব্যাহত; বিকল্প জ্বালানির ব্যয়ে বাড়ছে চাপ
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬ ৫:০৫ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
দেশজুড়ে দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকট নতুন করে আরও তীব্র হয়েছে মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে। ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানা, সিএনজি ফিলিং স্টেশন এবং আবাসিক গ্রাহকদের ওপর। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় শিল্প উদ্যোক্তারা বাড়তি ব্যয়ে ডিজেল ও এলপিজির মতো বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করছেন। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আরও কারখানা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
দেশের শিল্প খাত বর্তমানে তীব্র গ্যাস সংকটের মুখোমুখি। জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলো প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপ পাচ্ছে না। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
জ্বালানি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, কক্সবাজারের মহেশখালীতে স্থাপিত দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এলএনজি থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। আগে এলএনজি থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে তা ৫০ কোটি ঘনফুটেরও নিচে নেমে এসেছে। ফলে দেশের মোট দৈনিক গ্যাস সরবরাহ কমে প্রায় ২১৫ কোটি ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে, যেখানে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট।
পেট্রোবাংলা বর্তমানে মোট চাহিদার মাত্র ৫৬ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে। এর ফলে শিল্প, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, সিএনজি স্টেশন এবং আবাসিক গ্রাহক—সব খাতেই সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।
গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ, ভালুকাসহ দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসচাপ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কমে গেছে। অধিকাংশ শিল্পকারখানার জন্য যেখানে ১০ থেকে ১৫ পিএসআই গ্যাসচাপ প্রয়োজন, সেখানে অনেক এলাকায় মাত্র ১ থেকে ৩ পিএসআই গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। কিছু সময় চাপ একেবারেই শূন্যে নেমে যাচ্ছে।
এর ফলে অনেক ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। যেসব কারখানা চালু রয়েছে, সেগুলোরও উৎপাদন সক্ষমতা ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
অনেক উদ্যোক্তা ডিজেলচালিত জেনারেটর কিংবা এলপিজি ব্যবহার করে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে এতে প্রতিদিন অতিরিক্ত বিপুল ব্যয় যুক্ত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এভাবে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন তারা।
পোশাক ও বস্ত্র খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস সংকটের কারণে ডাইং, ফিনিশিং ও আয়রনের মতো গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। এতে নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
শিল্পমালিকদের আশঙ্কা, সময়মতো রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন না হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা নতুন ক্রয়াদেশ স্থগিত, বাতিল কিংবা মূল্য কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে দেশের রপ্তানি আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
শিল্প খাতের সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, তীব্র গ্যাস সংকটসহ বিভিন্ন কারণে ইতোমধ্যে শতাধিক স্পিনিং মিল উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের ডাইং শিল্পেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। আগে অনেক প্রতিষ্ঠান সিএনজি স্টেশন থেকে সিলিন্ডারে গ্যাস এনে উৎপাদন চালিয়ে গেলেও বর্তমানে সেই সুযোগও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে অনেক কারখানায় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডাইং প্রক্রিয়া মাঝপথে বন্ধ হলে পুরো উৎপাদিত কাপড় নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে অল্প সময়ের মধ্যেই আরও অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপ না থাকায় অনেক স্টেশন দিনের বড় একটি সময় বন্ধ রাখতে হচ্ছে। যেসব স্টেশন চালু রয়েছে, সেগুলোতেও দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে যানবাহনের চালকদের।
স্টেশন পরিচালনায় প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপের তুলনায় অনেক কম চাপ পাওয়া যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে গ্যাস বিক্রি সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক গ্রাহকেরাও তীব্র গ্যাস সংকটে ভুগছেন। দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবার এলপিজি, ইন্ডাকশন কুকার অথবা বৈদ্যুতিক চুলার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অনেকেই আবার গভীর রাতে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লে তখন পরদিনের রান্না সেরে রাখছেন।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করা না গেলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান, রপ্তানি এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
১২৭ বার পড়া হয়েছে