চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ও প্রবাসীদের ঘুমহীন রাত: স্বদেশচেতনা
সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬ ৭:৪৫ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথে রাজনৈতিক গতিধারা নতুন মোড় নেয়। সেই মুহূর্তগুলো কেবল একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ হয়ে থাকে না। বরং সেটা দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সকল মানুষের সমগ্র জাতিসত্তার চেতনাকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। ইতিহাসের প্রতিটি বড় গণআন্দোলন, গণজাগরণ কিংবা রাষ্ট্ররূপান্তরের প্রক্রিয়ায় দেখা গিয়েছে যে, দেশের ভৌগোলিক সীমানার বাইরে অবস্থান করেও প্রবাসীরা নানাভাবে সেই পরিবর্তনের অংশ হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশের চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান তেমনই একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ, যা দেশের সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বের নানা প্রান্তে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মনোজগতে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থান করেও তাঁরা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র বিনির্মাণের প্রশ্নে প্রত্যক্ষ অংশীদারের মতোই উদ্বিগ্ন, উৎকণ্ঠিত ও সক্রিয় ছিলেন।
আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রবাসীদের জীবনের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, জীবন-বাস্তবতায় তাঁরা দেশান্তরিত হলেও স্বদেশ তাঁদের চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে। মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে দেশ ছাড়তে পারে, কিন্তু মনোজগতে দেশ কখনোই প্রবাসীদেরকে ছেড়ে যায় না। জন্মভূমির মাটি ও মানুষ, শৈশবের স্মৃতি, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ও ইতিহাসের সঙ্গে আত্মপরিচয়ের যে গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তা স্বদেশ থেকে ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় না। সমাজবিজ্ঞানীরা একে ‘প্রবাসী পরিচয়’ (ডায়াসপোরিক আইডেন্টিটি)-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। শারীরিকভাবে প্রবাসীরা হয়তো স্বদেশের বাইরে অন্য কোন দেশে অবস্থান করে, কিন্তু তাঁদের যাপীত-জীবনের স্মৃতি, আবেগ-অনুভূতি ও আত্মপরিচয়ের একটি বড় অংশ স্থায়ীভাবে সংযুক্ত থাকে প্রিয় জন্মভূমির সঙ্গে।
প্রবাসীদের কাছে বাংলাদেশ কেবল একটি রাষ্ট্র নয়; এটি তাঁদের আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁদের চিন্তাচেতনা, আবেগ-অনুভূতি, ইচ্ছে-আকাঙ্ক্ষা-স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বড় একটি অংশ জুড়েই থাকে প্রিয় স্বদেশ। বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে যখন তাঁরা বাংলা ভাষায় কথা বলেন, সন্তানের কাছে বাংলাদেশের গল্প বলেন, জাতীয় দিবসগুলো পালন করেন কিংবা দেশের খবর অনুসরণ করেন, তখন প্রকৃতপক্ষে তাঁরা তাঁদের অস্তিত্বের একটি অংশকে দৈনন্দিন জীবন-চর্যায় বাঁচিয়ে রাখেন। নাড়ির এই অদৃশ্য সংযোগই প্রবাসীদের স্বদেশচেতনাকে জীবন্ত রাখে। তাই দেশের সংকট তাঁদের হৃদয়কে নাড়া দেয়, আর জাতীয় অর্জন তাঁদের গর্বিত করে। দেশের মানুষ যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তখন প্রবাসীরাও মানসিকভাবে সেই সংগ্রামের অংশ হয়ে ওঠেন। ঐতিহাসিক সত্যের অংশ হিসেবে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময়ও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।
স্বদেশচেতনার পাশাপাশি প্রবাসীদের উদ্বেগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো দেশে রেখে আসা আপনজনদের কল্যাণ-চিন্তা ও স্বদেশের প্রতি গভীর টান। পৃথিবীর যেখানেই তাঁরা থাকুন না কেন, তাঁদের ধ্যানজ্ঞান জুড়ে থাকে বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং ফেলে আসা জীবনের অসংখ্য দূর-অতীত ও নিকট-অতীতের স্মৃতি। দূরদেশে অবস্থান করলেও প্রতিদিন তাঁদের মন পড়ে থাকে দেশের খোঁজখবরে। কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা সামাজিক সংকট দেখা দিলে প্রথমেই তাঁদের মনে প্রশ্ন জাগে, ‘আমার আপনজনেরা কেমন আছে’? চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় এই উদ্বেগ বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছিল। দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত, সহিংসতা, দমন-পীড়ন এবং অনিশ্চয়তার খবর তাঁদের উৎকণ্ঠিত করে তুলেছিল। উদ্বেগ ও উৎকন্ঠায় অনেকেই রাত জেগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ করেছেন, ফোনে পরিবারের খোঁজ নিয়েছেন, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং তাদের নিরাপত্তার সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রেখেছেন। কেউ বারবার একই নম্বরে ফোন করেছেন, কেউ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পরিচিতজনদের খুঁজেছেন, কেউ আবার সামান্য একটি বার্তার অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছেন। প্রবাসীদের এই মানসিক অবস্থাকে কেবল রাজনৈতিক উদ্বেগ বলে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে; এটি ছিল স্বজন, স্বজাতি এবং স্বদেশের প্রতি গভীর আবেগ, দায়িত্ববোধ ও মানবিক সংযোগের বহিঃপ্রকাশ।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের দিনগুলোতে প্রবাসীদের জন্য সবচেয়ে বিভীষিকাময় মুহূর্ত ছিল যখন স্বৈরাচারী সরকার বাংলাদেশে ইন্টারনেট সংযোগ কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিল। আধুনিক বিশ্বে ইন্টারনেট কেবল একটি প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা কিংবা উপযোগিতা নয়; এটি প্রবাসী মানুষের জন্য স্বদেশের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান সেতুবন্ধন। প্রতিদিনের ফোনকল, ভিডিও আলাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা কিংবা সংবাদপত্রের অনলাইন সংস্করণ প্রভৃতি সবকিছু মিলিয়েই নানা মাধ্যমে প্রবাসীরা তাঁদের দেশকে কাছে অনুভব করেন। সেই সেতুবন্ধন যখন হঠাৎ ভেঙে পড়ে, তখন দূরত্বের বাস্তবতা নির্মমভাবে সামনে এসে দাঁড়ায়, নিজেদেরকে ভাবতে হয় ভিন গ্রহের বাসিন্দা। ১৯ জুলাই ২০১৪- এর সেই যোগাযোগ-বিচ্ছিন্নতার মুহূর্তে অসংখ্য প্রবাসীর কাছে মনে হয়েছিল যেন বাংলাদেশ হঠাৎ করেই পৃথিবীর মানচিত্র থেকে আড়াল হয়ে গেছে। আমার মতো অনেকের চেতনায় বাংলাদেশ যেন এ দুনিয়া হতে
হারিয়ে গিয়েছিল। সময় কাটাতে হয়েছিল দুর্যোগকালীন উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা নিয়ে। দেশে কী ঘটছে, কারা নিরাপদ আছে, কারা বিপদের মধ্যে আছে, কিভাবে তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করা যেতে পারে এসব কোনো কিছুই আর নিশ্চিতভাবে জানার উপায় ছিল না।
রাষ্ট্র যখন তথ্যপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ বন্ধ করে দেয়, তখন মানুষের কল্পনা ও আশঙ্কা বাস্তবতার চেয়েও দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, তথ্যের অভাব প্রায়ই মানুষের উদ্বেগ ও উৎকন্ঠাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। কারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ভয় পায় সেই অজানাকে, যার সম্পর্কে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য ও ধারণা পাওয়া যায় না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাসরত অসংখ্য বাংলাদেশির কাছে সেই দিনগুলো ছিল অসহায়ত্ব, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবং মানসিক যন্ত্রণার এক দীর্ঘ অধ্যায়। অনেক প্রবাসী রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটিয়েছেন। কর্মস্থলে থেকেও কাজে মনোযোগ দিতে পারেননি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে বসেও মন পড়ে ছিল বাংলাদেশের অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে। দেশে বাবা-মা, ভাই-বোন, সন্তান-সন্তুতি, আত্মীয়স্বজন কিংবা বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো সুযোগ না থাকায় তাঁদের প্রতিটি মুহূর্ত কাটছিল অনিশ্চয়তার মধ্যে। কোনো অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলে মনে হতো হয়তো দেশের কারও খবর পাওয়া যাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সামান্য কোনো তথ্যের সন্ধানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিয়েছেন অনেকে। কিন্তু তথ্যের চেয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, ভয়তাড়িত অস্থিরতা এবং অনিশ্চয়তার ভারই তখন ছিল বেশি।
আমি নিজেও সত্যিকার অর্থে সেই জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোতে কোনো কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারিনি। প্রবাসজীবনের ব্যস্ততা, পেশাগত দায়িত্ব কিংবা ব্যক্তিগত কাজ সবকিছুই যেন অর্থহীন মনে হচ্ছিল। সারাক্ষণ মনে হতো, দেশে কী হচ্ছে? আমাদের আত্মীয়-স্বজনরা কেমন আছে? পরিচিতজনদের কেউ বিপদে পড়েছে কি না? নানাভাবে মানুষের সাথে যুক্ত থাকার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বহু প্রবাসী আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন বাংলাদেশের সর্বশেষ সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানার জন্য। কেউ তাঁদের পরিবারের খোঁজ জানতে চেয়েছেন, কেউ বন্ধুদের খবর জানতে চেয়েছেন, আবার কেউ কেবল নিশ্চিত হতে চেয়েছেন যে তাঁদের প্রিয় মানুষগুলো এখনো নিরাপদ আছেন। সেই ফোনকল, বার্তা এবং উদ্বেগভরা
প্রশ্নগুলো আজও স্মৃতিতে স্পষ্ট হয়ে আছে। সেই সময় প্রবাসীদের অভিজ্ঞতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁদের সম্মিলিত মানসিক যন্ত্রণা। একজনের উৎকণ্ঠা আরেকজনের উদ্বেগকে স্পর্শ করছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্রবাসী গ্রুপ, কমিউনিটি ফোরাম এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের নেটওয়ার্কগুলো তখন পরিণত হয়েছিল উদ্বিগ্ন মানুষের অনানুষ্ঠানিক সহায়তা ব্যবস্থায়। কেউ সামান্য কোনো তথ্য পেলেই অন্যদের জানাতেন, কেউ সম্ভাব্য যোগাযোগের পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করতেন, কেউ আবার শুধু মানসিক সমর্থন দেওয়ার জন্য অন্যদের পাশে দাঁড়াতেন। এই সম্মিলিত উদ্বেগ ও পারস্পরিক সংযোগই প্রমাণ করে যে, প্রবাসী সম্প্রদায় কেবল বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের সমষ্টি নয়; বরং একটি বিস্তৃত মানবিক ও আবেগিক নেটওয়ার্ক, যার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে স্বদেশচেতনা।
প্রবাসীদের জীবনে হয়তো অনেক স্মৃতি আসে-যায়, কিন্তু দেশের সঙ্গে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার জুলাইয়ের সেই মুহূর্তগুলো তাঁরা কোনোদিন ভুলতে পারবেন না। তখন ভৌগোলিক দূরত্ব যেন হঠাৎ করেই বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল। প্রবাসীরা নতুন করে উপলব্ধি করেছিলেন যে, দূরে থাকলেও তাঁদের হৃদয়, চিন্তা এবং অস্তিত্বের একটি বড় অংশ বাংলাদেশের সঙ্গেই বাঁধা। স্বদেশের সংকট তখন তাঁদের ব্যক্তিগত সংকটে পরিণত হয়েছিল। সেই ঘুমহীন রাতগুলো, উদ্বেগ-উৎকন্ঠায় কাটানো দীর্ঘ প্রহরগুলো এবং একটি ফোনকলের অপেক্ষায় থাকা অসংখ্য মানুষের মুখ আজ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসের এক নীরব কিন্তু গভীর মানবিক দলিল হয়ে আছে। প্রবাসীদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতা। দেশের লাখো পরিবার প্রবাসীদের উপার্জনের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। পরিবার-পরিজনের শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, ব্যবসা কিংবা দৈনন্দিন জীবনের ব্যয় নির্বাহে প্রবাসীদের অবদান অপরিসীম। তাঁরা কেবল অর্থ পাঠান না; দেশের সুখ-দুঃখ, উন্নয়ন ও সংকটের অর্থনৈতিক দায়ভারও বহন করেন। ফলে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তাঁদের জন্য কেবল একটি সংবাদ নয়; বরং তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীরা দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছেন। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স শুধু
পরিবারের জীবনমান উন্নত করে না; জাতীয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। ফলে প্রবাসীরা যখন দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হন, তখন সেই উদ্বেগের সঙ্গে অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকে। তাঁরা জানেন, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন কেবল দেশের মানুষের জন্যই নয়; তাঁদের নিজেদের পরিবার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপরে তুলে ধরা এই তিনটি বাস্তবতা তথা স্বদেশচেতনা, আপনজনের প্রতি আবেগগত বন্ধন এবং অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতা- চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় প্রবাসীদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। ফলে তাঁরা কেবল উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাননি; বরং নানাপন্থায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণও করেছেন এই নাগরিক অধিকার আদায়ের প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সংগ্রামে। ভৌগোলিক দূরত্ব তাঁদের শারীরিক উপস্থিতিকে সীমিত করতে পেরেছিল, কিন্তু তাঁদের চিন্তাভাবনা, গণদাবীর পক্ষে অবস্থান এবং স্বৈরাচারী সরকার বিরোধী কর্মতৎপরতাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে দূর থেকে পরিস্থিতিকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ তাঁদেরকে আন্দোলনের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠন এবং বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে কাজে লাগানোর বিশেষ সক্ষমতা দিয়েছে। ফলে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নাগরিকদের আন্দোলন ছিল না; এটি ধীরে ধীরে একটি বৈশ্বিক বাংলাদেশি চেতনারও বহিঃপ্রকাশে পরিণত হয়েছিল, যার সক্রিয় অংশীদার ছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরা।
গণঅভ্যুত্থানে প্রবাসীদের সবচেয়ে দৃশ্যমান ভূমিকা ছিল তথ্য ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় তথ্য কেবল সংবাদ নয়; এটি ক্ষমতা, প্রতিরোধ এবং জনমত গঠনের অন্যতম
গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, যখন কোনো রাষ্ট্র তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, তখন বিকল্প তথ্যব্যবস্থা সামাজিক প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যখন তথ্যপ্রবাহ নানা সীমাবদ্ধতা, বিভ্রান্তি এবং নিয়ন্ত্রণের মুখে পড়ছিল, তখন প্রবাসীরা বিকল্প তথ্যপ্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ওয়েবিনার, লাইভ আলোচনা, ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তাঁরা দেশের পরিস্থিতি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাওয়া খণ্ডিত তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা, ভিডিওচিত্র, আলোকচিত্র এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগসমূহ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রচারে অনেক প্রবাসী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একই সঙ্গে দেশের ভেতরের আন্দোলনকারী, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মধ্যে একটি কার্যকর যোগাযোগ-সেতু তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই, অনুবাদ, সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মহলে প্রচারের দায়িত্ব পালন করেন। ফলে দেশের অভ্যন্তরে যে কণ্ঠস্বর কখনো কখনো সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল, তা প্রবাসীদের মাধ্যমে বৈশ্বিক পরিসরে পৌঁছানোর সুযোগ পায়। প্রবাসীরা কেবল তথ্যের গ্রহীতা ছিলেন না; বরং তাঁরা তথ্য-নিয়ন্ত্রণ ও তথ্য-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তথ্যসংগ্রাম তথা ‘ইনফরমেশন অ্যাক্টিভিজম’-এর সক্রিয় অংশে পরিণত হয়েছিলেন। একবিংশ শতাব্দীর প্রতিবাদ-প্রতিরোধের আন্দোলন-সংগ্রামে তথ্যপ্রবাহের গুরুত্ব বিবেচনা করলে এই ভূমিকার
তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
প্রবাসীদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল অর্থনৈতিক সহযোগিতা। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী, আহত ব্যক্তি, নিহতদের পরিবার এবং সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে বহু প্রবাসী ব্যক্তি ও সংগঠন আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছেন। বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা নিজ নিজ উদ্যোগে তহবিল সংগ্রহ করেছেন, সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন এবং সংকটাপন্ন পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন। মানবিক সহায়তার এই প্রবণতা কেবল রাজনৈতিক অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ ছিল না; বরং এটি ছিল জাতীয় সংহতি এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের একটি শক্তিশালী প্রকাশ। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের মধ্যে রেমিট্যান্স প্রবাহ সাময়িকভাবে স্থগিত বা সীমিত করার আহ্বানও দেখা যায়, যা সরকারের প্রতি এক ধরনের প্রতীকী এবং অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। প্রবাসীদের একটি অংশ মনে করেছিল যে, রাষ্ট্র যদি নাগরিকদের ন্যায্য অধিকার, নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তাঁদের অবস্থান প্রকাশের অধিকার রয়েছে। এই উদ্যোগের ব্যাপ্তি ও কার্যকারিতা নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও এটি ঐক্য ও সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করেছিল। এটি প্রমাণ করে যে প্রবাসীরা দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের প্রভাব প্রয়োগের সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং প্রয়োজনে অর্থনৈতিক শক্তিকেও নাগরিক অবস্থানের অংশ হিসেবে ব্যবহার করতে প্রস্তুত ছিলেন।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে প্রবাসীদের ভূমিকার একটি বিশেষ দিক ছিল তাঁদের কূটনৈতিক তৎপরতা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একে অনেক সময় ‘নাগরিক কূটনীতি’ (সিটিজেন ডিপ্লোমেসি) বলা হয়, যেখানে সাধারণ নাগরিকরাই আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরার দায়িত্ব পালন করেন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা ঠিক সেই ভূমিকাই পালন করেছিলেন। তাঁরা স্থানীয় সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, মানবাধিকার সংগঠন, সাংবাদিক, গবেষক, শিক্ষাবিদ এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিফিং দেন, বিবৃতি প্রদান করেন, তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। অনেক দেশে স্মারকলিপি প্রদান, চিঠি প্রেরণ, গোলটেবিল আলোচনা আয়োজন, সংবাদ সম্মেলন এবং প্রতিনিধি বৈঠকের মাধ্যমে তাঁরা বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সচেতনতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখেন। বৈশ্বিক যোগাযোগ ও নেটওয়ার্ক ব্যবহারের এই সক্ষমতা আধুনিক প্রবাসী সম্প্রদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে সামনে এসেছে। রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কূটনীতির বাইরে থেকেও তাঁরা একটি গুরুত্বপূর্ণ অনানুষ্ঠানিক কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়েছেন। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, বিশ্বের বিভিন্ন শহরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রতিবাদ সমাবেশ, মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, আলোচনা সভা এবং সংহতি কর্মসূচির আয়োজন করেন। লন্ডন, নিউইয়র্ক, টরন্টো, সিডনি, বার্লিন, প্যারিস, রোম, স্টকহোমসহ বিশ্বের নানা শহরে অনুষ্ঠিত এসব কর্মসূচি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও জনমতের দৃষ্টি আকর্ষণে সহায়ক হয়েছিল।
অনেক ক্ষেত্রে এসব কর্মসূচিতে শুধু বাংলাদেশিরাই নয়, বরং স্থানীয় মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ এবং বিভিন্ন দেশের নাগরিকেরাও অংশগ্রহণ করেছিলেন। ফলে বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ একটি জাতীয় ইস্যুর গণ্ডি অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। বিদেশের মাটিতে এই সংহতি প্রকাশ দেশের আন্দোলনকারীদের জন্য নৈতিক শক্তির উৎস হয়ে ওঠে। এটি তাঁদের এই বার্তা দেয় যে, তাঁরা একা নন; বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কোটি বাংলাদেশি তাঁদের সংগ্রামের পাশে রয়েছে। সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাসে নৈতিক সমর্থনের গুরুত্ব কখনোই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ আন্দোলনের কঠিন সময়ে মানুষ কেবল সাংগঠনিক বা আর্থিক সহায়তাই খোঁজে না; তারা জানতে চায়, তাদের কণ্ঠস্বর অন্যরাও শুনছে এবং তাদের সংগ্রাম বৃহত্তর মানবিক ও নৈতিক সমর্থন লাভ করছে। প্রবাসীদের সংহতির এই কর্মসূচিগুলো সেই সময় আন্দোলনকারীদেরকে শক্তি যুগিয়েছিল।
প্রবাসীদের এই ভূমিকা অবশ্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ও প্রবাসীরা আন্তর্জাতিক জনমত গঠন, অর্থনৈতিক সহায়তা এবং কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। লন্ডন, নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন শহরে তখনকার প্রবাসী বাংলাদেশিরা যে জনমত-সংগ্রাম পরিচালনা করেছিলেন, তা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি স্বীকৃত অধ্যায়। ইতিহাসের সেই ধারাবাহিকতারই আধুনিক রূপ আমরা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে প্রত্যক্ষ করেছি। পার্থক্য শুধু এই যে, আজকের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে প্রবাসীদের প্রভাব বিস্তারের পরিধি, গতি এবং কার্যকারিতা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। চব্বিশের অভিজ্ঞতা আমাদের নতুন করে উপলব্ধি করিয়েছে যে প্রবাসীদের ভূমিকা কেবল রেমিট্যান্স পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের উন্নয়ন-আলোচনায় প্রবাসীদের অবদানকে প্রায়শই অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো, তাঁরা দেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাঁরা রাষ্ট্রকে কেবল একটি সরকার বা রাজনৈতিক দলের সমার্থক হিসেবে দেখেন না; বরং একটি বৃহত্তর জাতীয় চুক্তি, নাগরিক অধিকার এবং সম্মিলিত ভবিষ্যতের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করেন। তাই রাষ্ট্র যখন সংকটে পড়ে, তখন তাঁদের উদ্বেগও নাগরিক দায়িত্ববোধের স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ হয়ে ওঠে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। এই পরিবর্তনের সময়ে দেশের মানুষের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিরাও উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, প্রত্যাশা এবং আশার এক অনন্য অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। তাঁরা দূরে থেকেও দেশের জন্য ভেবেছেন, কথা বলেছেন, সংগঠিত হয়েছেন এবং নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাঁদের অনেকেই হয়তো আন্দোলনের ময়দানে উপস্থিত ছিলেন না, কিন্তু তাঁদের কণ্ঠ, তাঁদের শ্রম, তাঁদের যোগাযোগ, তাঁদের অর্থনৈতিক সহায়তা এবং তাঁদের অবিচল স্বদেশপ্রেম এই গণঅভ্যুত্থানের বিস্তৃত সামাজিক শক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল। সেই অর্থে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান শুধু বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার ভেতরের মানুষের গল্প নয়; এটি বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কোটি প্রবাসী বাংলাদেশির হৃদস্পন্দনেরও ইতিহাস। গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন সময়ে প্রবাসীদের এই সম্পৃক্ততাকে কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি ছিল মূলত স্বদেশপ্রেম, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি উন্নত, গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। মানুষ সাধারণত সেই বিষয় নিয়েই উদ্বিগ্ন হয়, যার সঙ্গে তার আবেগ, পরিচয় এবং ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় প্রবাসীদের অস্থিরতা, উৎকণ্ঠা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রমাণ করেছে যে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এখনও তাঁদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁরা ভৌগোলিকভাবে দূরে অবস্থান করলেও নিজেদেরকে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং নৈতিক ভবিষ্যৎ থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন মনে করেননি। সমাজবিজ্ঞানীরা প্রায়ই বলেন, আধুনিক বিশ্বে জাতিসত্তার ধারণা কেবল একটি ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা বিস্তৃত হয় সীমান্ত অতিক্রম করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মানুষের চেতনা, অভিজ্ঞতা এবং সম্পর্কের মধ্য দিয়ে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একইভাবে সত্য। আজকের বাংলাদেশ শুধু বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে বসবাসরত মানুষের নয়; এটি একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষের, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় বসবাসরত পেশাজীবীদের, বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের এবং পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কোটি প্রবাসী বাংলাদেশিরও। তাঁদের প্রত্যেকের জীবন, স্বপ্ন এবং পরিচয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ফলে দেশের সংকট, সংগ্রাম কিংবা অর্জন তাঁদের ব্যক্তিগত অনুভূতির অংশে পরিণত হওয়াই স্বাভাবিক। প্রবাসীরা কেবল অর্থনৈতিক অবদানের উৎস নন; তাঁরা একই সঙ্গে জাতীয় জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং রাজনৈতিক শক্তি। দেশ ও দশের কল্যাণে তাঁদের ভূমিকা বহুমাত্রিক। তাঁরা আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে ভূমিকা রাখতে পারেন, মানবাধিকার প্রশ্নে বৈশ্বিক সংহতি সৃষ্টি করতে পারেন, তথ্যপ্রবাহের বিকল্প পথ নির্মাণ করতে পারেন, কূটনৈতিক যোগাযোগকে প্রভাবিত করতে পারেন এবং সংকটকালে দেশের মানুষের পাশে মানবিক সহায়তা নিয়ে দাঁড়াতে পারেন। অর্থাৎ তাঁরা শুধু অর্থনীতির অংশ নন; তাঁরা জাতীয় জীবনেরও সক্রিয় অংশীদার। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে প্রবাসীদের এই সক্রিয় অংগ্রহণের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো দেশের অভ্যন্তরে
বসবাসকারী নাগরিক এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে আরও শক্তিশালী, প্রাতিষ্ঠানিক এবং টেকসই সেতুবন্ধন গড়ে তোলা প্রয়োজন। কারণ একটি জাতির শক্তি কেবল তার ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা তার মানুষের জ্ঞান, শ্রম, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা, ভালোবাসা এবং দায়বদ্ধতার মধ্যেও নিহিত থাকে। যে রাষ্ট্র তার প্রবাসীদের কেবল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের উৎস হিসেবে দেখে, সে রাষ্ট্র তাদের প্রকৃত সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে না। তাই আমাদের প্রয়োজন এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা যেখানে প্রবাসীদেরকে দেশের উন্নয়ন, গণতন্ত্র, শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি, নীতিনির্ধারণ এবং রাষ্ট্রগঠনের বৃহত্তর অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা কখনো কেবল ভৌগোলিক উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে না। দেশের জন্য উদ্বিগ্ন হতে, দেশের জন্য কাঁদতে, দেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতে কিংবা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে দেশের মাটিতে উপস্থিত থাকা সবসময় প্রয়োজন হয় না। অনেক সময় হাজার হাজার মাইল দূরে বসে থাকা একজন মানুষও স্বদেশের প্রতি এমন দায়বদ্ধতা অনুভব করতে পারেন, যা তাঁকে নীরব দর্শক হয়ে থাকতে দেয় না। বর্তমানে নানা জনের হাতে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস লেখা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও লেখা হবে ছাত্র-জনতার প্রতিবাদ-প্রতিরোধে উত্তাল রাজপথের বীরত্বগাথা, তরুণদের আত্মত্যাগ, মানুষের সাহস, প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধের ইতিহাস দিয়ে; কিন্তু সেই ইতিহাসের আরেকটি অনুচ্চারিত অধ্যায় হিসেবেও রয়ে যাবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসীদের অশ্রুসিক্ত উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার বেদনাবিদ্ধ সময়ের গল্প, ঘুমহীন রাতের অভিজ্ঞতা এবং স্বদেশের জন্য নিরন্তর প্রার্থনার স্মৃতি। ইতিহাসের আনুষ্ঠানিক দলিলে হয়তো তাঁদের নাম খুব বেশি লেখা থাকবে না, কিন্তু তাঁদের উদ্বেগ, অপেক্ষা এবং সক্রিয় সম্পৃক্ততা ছিল এই বৃহত্তর গণজাগরণের নীরব শক্তিগুলোর একটি। রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রবাসীদের এই অভিজ্ঞতাগুলো হয়তো পরিসংখ্যান হয়ে ওঠবে না, কিন্তু জাতির সমষ্টিগত স্মৃতিতে এগুলো গভীর মানবিক সাক্ষ্য হিসেবে বেঁচে থাকবে।
একদিন যখন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস পাঠ করবে, তখন তারা রাজপথের সংগ্রামের পাশাপাশি হয়তো এই নীরব অধ্যায়ের কথাও জানবে। শুনবে সেইসব প্রবাসী মানুষের কথা, যারা দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোর প্রতিটি মুহূর্তে বাংলাদেশের সঙ্গেই ছিলেন। তাঁরা উদ্বেগ ও উৎকন্ঠায় নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন, তথ্যের জন্য অপেক্ষা করেছেন, আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে কাজ করেছেন, মানবিক সহায়তা পাঠিয়েছেন, প্রতিবাদ কর্মসূচি আয়োজন করেছেন এবং নিজেদের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। কারণ তাঁরা দেশ থেকে বহুদূরে ছিলেন, কিন্তু বিচ্ছিন্ন ছিলেন না। তাঁদের ঠিকানা ছিল ভিন্ন দেশে, কিন্তু তাঁদের হৃদয়ের ঠিকানা ছিল বাংলাদেশ। তাঁদের শরীর অবস্থান করছিল পৃথিবীর অন্যান্য দেশের বিভিন্ন নগরে, কিন্তু তাঁদের চিন্তা, উদ্বেগ, প্রার্থনা এবং স্বপ্নের একটি বড় অংশ তখনও বাংলাদেশের রাজপথ,
বিশ্ববিদ্যালয়, শহর, গ্রাম এবং সংগ্রামী মানুষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিল। তাই চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে প্রবাসীদের অবদান কেবল একটি পরিশিষ্ট নয়; বরং এটি সেই বৃহত্তর জাতীয় সংগ্রামের কাহিনিরই অংশ, যেখানে দেশের ভেতর ও বাইরের বাংলাদেশিরা মিলিতভাবে অন্যায়, বৈষম্য ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিল। আর সেই কারণেই বলা যায় চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান কেবল বাংলাদেশের মাটিতে সংঘটিত একটি রাজনৈতিক আন্দোলন নয়; বরং এটি ছিল সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিদের হৃদয়ে একযোগে ধ্বনিত হওয়া স্বদেশচেতনার এক ঐতিহাসিক জাগরণ।
লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।
১২৪ বার পড়া হয়েছে