সর্বশেষ

জাতীয়

মৃত্যুফাঁদে সেপটিক ট্যাংক

সাত বছরে প্রাণ গেল ২৮৪ জনের; বছরে গড়ে মৃত্যু ৪৪

মুন্সী তরিকুল ইসলাম
মুন্সী তরিকুল ইসলাম

বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬ ৯:০১ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
মাত্র একদিনের ব্যবধানে নয়, একই দিনে চট্টগ্রাম নগরে পৃথক দুটি নির্মাণাধীন ভবনের সেপটিক ট্যাংকে নেমে প্রাণ হারিয়েছেন চারজন। গত ২৬ জুন নগরের একটি নির্মাণাধীন ভবনে শাটারিংয়ের কাজ করতে গিয়ে সেপটিক ট্যাংকে মারা যান দুজন।
প্রতীকী ছবি

একই দিন ডাবলমুরিং থানার ধনিয়ালাপাড়া এলাকায় আরেকটি নির্মাণাধীন ভবনের সেপটিক ট্যাংকে নেমে প্রাণ হারান নোয়াখালীর সাকিব ও কোম্পানীগঞ্জের চর এলাহী এলাকার হৃদয় মিয়া। পরপর এসব ঘটনায় সেপটিক ট্যাংকের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বছরের পর বছর ধরে প্রায় একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। কোথাও একজন শ্রমিক অচেতন হয়ে পড়ার পর তাকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ যায় অন্যদের, আবার কোথাও একই পরিবারের একাধিক সদস্য বিষাক্ত গ্যাসের শিকার হন। প্রতিটি ঘটনার পর কয়েক দিনের আলোচনা হয়, ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়, তদন্তের আশ্বাস আসে। তারপর বিষয়টি আবার চাপা পড়ে যায়। নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্টদের আগ্রহ না থাকায় দেশে সেপটিক ট্যাংকে প্রাণহানি বেড়েই চলেছে।

দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে দেশের শহর ও মফস্বলে বহুতল ভবন, আবাসিক প্রকল্প ও বাণিজ্যিক স্থাপনার সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে সেপটিক ট্যাংকের সংখ্যাও। কিন্তু এ সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গড়ে ওঠেনি নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষিত জনবল কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর পরিষ্কার ব্যবস্থা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো সেপটিক ট্যাংকের নির্মাণ, পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এখনো কোনো সমন্বিত জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামো ও মানসম্মত পরিচালনা নির্দেশিকা কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে নগরায়ণের প্রসারের পাশাপাশি দেশের নানা প্রান্তে সেপটিক ট্যাংক নীরবে নতুন ঝুঁকি ও প্রাণহানির উৎসে পরিণত হচ্ছে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের তথ্য এ সংকটের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে। ২০২০ সাল থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত দেশে সেপটিক ট্যাংক ও বর্জ্যাধারক-সংশ্লিষ্ট অন্তত ২৬৮টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৮৪ জন। আহত হয়েছেন আরো ৯৩৫ জন। অর্থাৎ এ সময়ে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় চারজন এ মরণফাঁদে প্রাণ হারিয়েছেন, আর এ সময় পর্যন্ত বছরে গড়ে প্রাণহানি ঘটেছে ৪৪ জনের।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুর্ঘটনার প্রবণতা ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী। ২০২০ সালে ২৩টি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় নয়জনের। পরের বছর ৩০টি ঘটনায় প্রাণহানি অনেকটা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪২ জনে, যা প্রায় সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এরপর ২০২২ সালে ২৩ জন, ২০২৩ সালে ২০, ২০২৪ সালে ২৭ ও ২০২৫ সালে ১৭ জনের মৃত্যু হয়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে—মাত্র পাঁচ মাসেই ৮০টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৬ জন। অর্থাৎ বছর শেষ হওয়ার আগেই চলতি বছর সেপটিক ট্যাংক দুর্ঘটনার দিক থেকে সবচেয়ে ভয়াবহ বছরে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সেপটিক ট্যাংক দুর্ঘটনা-পরবর্তী উদ্ধার অভিযানে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের সাবেক উপপরিচালক (অপারেশন) দেবাশীষ বর্ধন। নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের অধিকাংশ সেপটিক ট্যাংক চরম অস্বাস্থ্যকর। এসব জায়গায় উদ্ধার অভিযান পরিচালনাও অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় ফায়ার ফাইটাররাও অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিশেষ করে পুরোনো এবং দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সেপটিক ট্যাংকগুলো বেশি ভয়ংকর। এগুলো এক ধরনের মৃত্যুকূপে পরিণত হয়। এর মধ্যে শ্রমিকরা নামলেই স্বল্প সময়ের মধ্যে অক্সিজেন সংকটে অচেতন হয়ে যান। দ্রুত সময়ে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারলে অনেক সময় প্রাণহানি রোধ করা যায়। এখন সময় এসেছে সেপটিক ট্যাংক-সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়নের। প্রতিবেশী দেশ ভারতও সেপটিক ট্যাংকে নেমে কাজ করার আইন করে নিষিদ্ধ করেছে। আমাদেরও এমন কিছু করা প্রয়োজন।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে অদৃশ্য ঘাতক লুকিয়ে থাকে। মানববর্জ্য পচনের ফলে সেখানে তৈরি হয় মিথেন, হাইড্রোজেন সালফাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অ্যামোনিয়ার মতো প্রাণঘাতী গ্যাস। এর মধ্যে হাইড্রোজেন সালফাইড কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই একজন সুস্থ মানুষকে অচেতন করে দিতে পারে। আবার ট্যাংকের ভেতরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যু ঘটে। অনেক সময় দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত অন্যরা বুঝতেই পারেন না যে ভেতরে কী ঘটেছে। ফলে একজনকে বাঁচাতে গিয়ে আরেকজন, তারপর আরো একজন ট্যাংকে নেমে পড়েন। এভাবেই একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তের মধ্যে বহু মৃত্যুর ঘটনায় পরিণত হয়।

সেপটিক ট্যাংক ও অস্বাভাবিক মৃত্যু এড়াতে সচেতন করেন বেসরকারি সংস্থা ‘সেফটি অ্যান্ড রাইটস’-এর নির্বাহী পরিচালক সেকেন্দার আলী মিনা। তিনি বলেন, ‘সেপটিক ট্যাংকে মৃত্যুর মূল কারণ অসচেতনতা। শ্রমিকরা যখন ট্যাংক তৈরি ও পরিষ্কার করেন, তারা কেউ নিরাপত্তাসামগ্রী ব্যবহার করেন না। এসব ট্যাংক যখন দীর্ঘদিন ব্যবহৃত হয় তখন সেখানে মিথেন, কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো বিষাক্ত গ্যাস জমে থাকে। ট্যাংকের মুখ খুলতেই সেগুলো বেরিয়ে আসে, যা মৃত্যুর অন্যতম একটি কারণ। এমন বদ্ধ ম্যানহোলেও একই ঘটনা ঘটে। সম্প্রতি কয়েকটি স্থানে সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কার করতে গিয়ে ভেতরে রাসায়নিক গ্যাসে অনেকে মারা গেছেন। এসব দুর্ঘটনা সচেতনতার মাধ্যমে এড়ানো যায়।’

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), যুক্তরাষ্ট্রের কর্মক্ষেত্র নিরাপত্তা সংস্থা (ওএসএইচএ) এবং যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা বিধিমালা অনুযায়ী, সেপটিক ট্যাংকে প্রবেশের আগে অক্সিজেনের মাত্রা এবং মিথেন, হাইড্রোজেন সালফাইড ও কার্বন মনোক্সাইডের উপস্থিতি পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক। পরিবেশ নিরাপদ না হলে কাউকে ট্যাংকে নামানো যায় না। প্রয়োজন হলে কর্মীদের রেসপিরেটর, সেফটি হারনেস, হেলমেট ও সুরক্ষা পোশাক ব্যবহার করতে হয়। একই সঙ্গে ট্যাংকের বাইরে একজন প্রশিক্ষিত পর্যবেক্ষক অবস্থান করেন এবং জরুরি উদ্ধার পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখা হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোনো কর্মী অচেতন হয়ে পড়লে অন্য কাউকে তাৎক্ষণিকভাবে ভেতরে প্রবেশ করতে না দেয়া। কারণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অধিকাংশ বহুমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে উদ্ধার করতে গিয়ে।

সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কারে শ্রমিক ব্যবহার না করতে সরকারের আইন প্রণয়ন জরুরি বলে মনে করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ। তিনি বলেন, ‘এমন দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। কিন্তু কখনো সেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। এখানে সরকারিভাবে ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে এবং নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহ দিতে হবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে এক্ষেত্রে দায়িত্ব নিতে হবে। তারা জনগণকে সেপটিক ট্যাংক, পয়োনিষ্কাশন কূপ ও ম্যানহোল পরিষ্কারের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ ধরনের কাজে কোনো শ্রমিককে কূপে বা ট্যাংকের ভেতরে নামিয়ে ম্যানুয়ালি কাজ করানো যাবে না। এ বিষয়ে কঠোর আইন করতে হবে। ভারতে এ ধরনের ম্যানুয়াল পরিষ্কার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা রয়েছে। বাংলাদেশেও সেপটিক ট্যাংক, ম্যানহোল বা পয়োনিষ্কাশন কূপ পরিষ্কারের কাজ পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে এবং ম্যানুয়াল পদ্ধতিকে অবৈধ ঘোষণা করতে হবে। শুধু সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালালেই হবে না; এ কাজে ব্যবহৃত মেশিন, ভ্যাকুয়াম ট্রাক, গ্যাস ডিটেক্টর, সুরক্ষা সরঞ্জাম ও অন্যান্য প্রযুক্তি সহজলভ্য এবং তুলনামূলক কম খরচে নিশ্চিত করতে হবে। বিভিন্ন পেশাজীবী, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় সংগঠনকে যুক্ত করে ব্যাপক সচেতনতা কার্যক্রমও চালাতে হবে।’

ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ ঘটনায় কোনো ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই শ্রমিকদের ট্যাংকে নামানো হয়। গ্যাসের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয় না, ব্যবহার করা হয় না গ্যাস ডিটেক্টর, রেসপিরেটর, অক্সিজেন সিলিন্ডার বা সেফটি হারনেস। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকরা জানতেও পারেন না যে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তারা প্রাণঘাতী ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন। উদ্বেগের বিষয় হলো দেশে ঠিক কতটি সেপটিক ট্যাংক রয়েছে, তার কোনো কেন্দ্রীয় সরকারি হিসাবও নেই। তবে দ্রুত নগরায়ণ, বহুতল ভবন নির্মাণ, নতুন আবাসিক প্রকল্প ও বাণিজ্যিক স্থাপনার বিস্তারের ফলে গত এক দশকে শহর থেকে মফস্বল—সবখানেই সেপটিক ট্যাংকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু এ সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গড়ে ওঠেনি নিরাপদ ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষিত জনবল কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর পরিষ্কার কার্যক্রম। ফলে নগরায়ণ বিস্তারের পাশাপাশি অদৃশ্যভাবে বেড়েছে ঝুঁকিপূর্ণ সেপটিক ট্যাংকের সংখ্যাও।

সচেতন ও সতর্ক থাকলে এবং সেপটিক ট্যাংকের দুর্ঘটনা ও এর নিরাপত্তায় করণীয় বিষয়ে ধারণা থাকলে এ ধরনের দুর্ঘটনা শতভাগ এড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল। তিনি বলেন, ‘পরিত্যক্ত সেপটিক ট্যাংকে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ থাকে, জমা হয় বিষাক্ত গ্যাস। ফলে সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে নেমে পড়লে মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে। সেজন্য পর্যাপ্ত বাতাস সরবরাহের মাধ্যমে অক্সিজেনের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। জ্বলন্ত হ্যারিকেন নামিয়ে অক্সিজেনশূন্যতা আছে কিনা পরীক্ষা করতে হবে। কূপে নামার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করতে হবে। প্রশিক্ষিত জনবলের ব্যবহার করতে হবে। জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রচারণা বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কিংবা সংশ্লিষ্ট সেবা সংস্থার সহযোগিতা নিতে হবে।’

১২৬ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
জাতীয় নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন