সর্বশেষ

মতামত

ফকল্যান্ডের ক্ষত থেকে ফিফা সেমিফাইনাল: আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ডের অদৃশ্য যুদ্ধরেখা

মনজুর এহসান চৌধুরী
মনজুর এহসান চৌধুরী

বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬ ৫:৪১ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
১৯৮২ সালে দক্ষিণ আটলান্টিকের ছোট্ট দ্বীপপুঞ্জ ফকল্যান্ড–মালভিনাসকে ঘিরে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড যখন সশস্ত্র সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তখন কেউই ভাবেনি এই যুদ্ধের প্রতিধ্বনি দশকের পর দশক ফুটবলের সবুজ মাঠ পর্যন্ত গড়িয়ে যাবে।

মাত্র কয়েক মাসের ওই যুদ্ধে আর্জেন্টিনা সামরিকভাবে পরাজিত হয়, দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ থাকে ইংল্যান্ডের হাতে, আর আর্জেন্টিনার জাতীয় স্মৃতিতে জন্ম নেয় অসমাপ্ত ক্ষোভ, অপমান আর সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের অদম্য দাবি। পরবর্তী বছরগুলোতে কূটনৈতিক দরজা অনেকবার বন্ধ–খোলা হয়েছে, বাণিজ্য, ভিসা, ফিশারি নিয়ে বাস্তববাদী সহযোগিতাও গড়ে উঠেছে, কিন্তু ফকল্যান্ডের মালিকানা প্রশ্নটা আজও দুই দেশের সম্পর্কের গভীরে এক অমীমাংসিত গিঁট হয়ে রয়েছে।

এই গিঁটটাকেই আমরা দেখি ফুটবল মাঠে অদৃশ্য যুদ্ধরেখা হিসেবে। ফকল্যান্ডের মাত্র চার বছর পর, ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে যখন আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড মুখোমুখি হয়, তখন ম্যাচটি শুধু ফুটবল দ্বৈরথ ছিল না; যুদ্ধ–পরাজয়ের পর আর্জেন্টিনার আবেগ, গর্ব আর প্রতিশোধের প্রতীকী মঞ্চ হয়ে ওঠে। দিয়েগো মারাডোনার দুটি গোল—একটি কুখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’, অন্যটি কিংবদন্তি ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’—ইংল্যান্ডের জনমনে আজও অনেকের কাছে বিতর্ক ও অপমানের স্মৃতি, আর আর্জেন্টিনার কাছে জাতীয় গৌরবের চূড়ান্ত আইকন। ২–১ গোলের ওই জয়ে আর্জেন্টিনা এগিয়ে যায় শিরোপার পথে, কিন্তু এর চেয়েও বড় হয়ে ওঠে ফকল্যান্ড–পরবর্তী ফুটবল আখ্যানের সূচনা, যেখানে যুদ্ধের ক্ষত ও ফুটবলের নৈপুণ্য একে অপরের ওপর ছায়া ফেলে।

এরপর ১৯৯৮ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে আবার নকআউটে দেখা হয় দুই দলের। টানটান ২–২ ড্রয়ের পর টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনা জেতে ৪–৩ ব্যবধানে। মাইকেল ওয়েনের ঝলমলে গোল, ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড—সব মিলিয়ে এই ম্যাচটিও দুই দেশের ফুটবল–যুদ্ধকে আরও ঘনীভূত করে। ১৯৮৬ ও ১৯৯৮, দুই বড় নকআউটে শেষ হাসি আর্জেন্টিনার; ফকল্যান্ডের সামরিক পরাজয়ের পর ফুটবল মঞ্চ যেন আর্জেন্টিনাকে বারবার মানসিক প্রতিশোধের সুযোগ দিয়েছে। ২০০২ বিশ্বকাপে এবার পাল্টা গল্প লেখে ইংল্যান্ড—গ্রুপ পর্বে বেকহ্যামের পেনাল্টি গোলে ১–০ জয় পায় তারা; অনেকেই এটাকে ১৯৯৮–এর লাল কার্ডের ব্যক্তিগত প্রতিশোধের মতো করে দেখেছেন। এই পুরো ইতিহাসের ভেতরেও উল্লেখযোগ্য একটি তথ্য হলো, বিশ্বকাপের মঞ্চে সেমিফাইনালে আগে কখনও এই দুই দল মুখোমুখি হয়নি—২০২৬ সালের এই সেমিফাইনালই দুই দেশের প্রথম বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল দ্বৈরথ, যা পুরোনো বৈরিতার বইয়ে এক নতুন অধ্যায় যোগ করছে।

কূটনীতিতে দুই দেশ আজ আনুষ্ঠানিকভাবে “শত্রু রাষ্ট্র” না হলেও, ফকল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব–বিতর্ক, যুদ্ধের স্মৃতি আর প্রজন্মের আবেগ মিলিয়ে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। দ্বীপবাসীর গণভোট, আর্জেন্টিনার পুনরায় আলোচনার দাবি, লন্ডনের কঠোর অবস্থান—সব মিলিয়ে দ্বীপটি আজও রাজনৈতিক উত্তেজনার অক্ষ। সেই অক্ষের ছায়াতেই ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬–এর সেমিফাইনালে আবার মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড, এবং এইবার প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ চার পর্যায়ে। ম্যাচের টিকিটের প্রায় রেকর্ড–দাম, বিশ্লেষকদের অতিরিক্ত আগ্রহ, মিডিয়ার পুরোনো যুদ্ধ–প্রসঙ্গ টেনে আনা—সবই প্রমাণ করে, বুধবারের এই মহারণ কেবল বর্তমান পারফরম্যান্সের লড়াই না, বরং চার দশক পুরোনো ইতিহাসের বইয়ে নতুন অধ্যায় লেখার এক প্রতীকী প্রচেষ্টা। যুদ্ধের কামান এখন নীরব, কিন্তু সেই শব্দ আজও প্রতিধ্বনিত হয় গ্যালারির গর্জনে, স্কোরবোর্ডের সংখ্যায় আর দুই জাতির হৃদয়ের লুকোনো আবেগে, যেখানে ফকল্যান্ডের অদৃশ্য যুদ্ধরেখা ও বিশ্বকাপের দৃশ্যমান সেমিফাইনাল এক সুতোয় গেঁথে যায়।


লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

১৫৬ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন