সর্বশেষ

মতামত

মাদকবিরোধী মৃত্যুদণ্ড আইন: জাতীয় সংকট থেকে মুক্তির লড়াই

মনজুর এহসান চৌধুরী
মনজুর এহসান চৌধুরী

মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬ ৬:২৪ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
বাংলাদেশে আজ সবচেয়ে লাভজনক অবৈধ ব্যবসার নাম মাদক। সর্বনিম্ন থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে মাদকের কারবার ও ব্যবহার এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে সরকারি হিসাবে জনসংখ্যার ৫ শতাংশকে মাদকাসক্ত বলা হলেও বাস্তবে এই সংখ্যা অনেক বেশি। এমন কোনো পরিবার খুঁজে পাওয়া কঠিন, যেখানে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে মাদকের ছোবল পৌঁছেনি। সবচেয়ে ভয়াবহ বাস্তবতা হলো—মাদক সেবনকারীদের অধিকাংশই কিশোর ও তরুণ প্রজন্ম; গ্রাম-গঞ্জে দারিদ্র্য বা বেকারত্বের চেয়েও বড় সংকট এখন মাদক।
মনজুর এহসান চৌধুরী

এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদে ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস হওয়া রাজনৈতিক ও আইনগতভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। নতুন এই আইনে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, সাইবার স্পেস, অনলাইন নেটওয়ার্ক ও ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে মাদক বেচাকেনা, সরবরাহ ও আর্থিক লেনদেনে যুক্তদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র প্রথমবারের মতো পরিষ্কার বার্তা দিল যে মাদক ব্যবসা কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি, শিক্ষা, পরিবার, নৈতিকতা ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিরুদ্ধে পরিচালিত এক নীরব যুদ্ধ।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান মাদক পাচারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ করিডোর তৈরি করেছে। ভারত ও মিয়ানমারের দীর্ঘ সীমান্ত, সমুদ্রপথ ও আকাশপথ ব্যবহার করে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজা থেকে শুরু করে আইস ও নানা ধরনের সিনথেটিক মাদক দেশে প্রবেশ করছে। সীমান্ত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে চার অঞ্চলে ১০৪টি ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট চিহ্নিত হওয়া প্রমাণ করে, সীমান্ত নিরাপত্তার দুর্বলতা এই সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়, স্থানীয় মাস্তান ও প্রশাসনিক দুর্নীতির জাল মাদক ব্যবসাকে উচ্চ মুনাফার শিল্পে পরিণত করেছে, যেখানে বড় অর্থদাতা ও নেটওয়ার্কের কারিগররা অধিকাংশ সময় আইনের বাইরে থেকে যায়, আর ধরা পড়ে শুধু মাঠপর্যায়ের বাহক।

তাই নতুন মৃত্যুদণ্ড আইনকে কেবল কড়া সাজা হিসেবে দেখলে হবে না; এটি হওয়া উচিত প্রশাসন ও রাজনীতিকে জবাবদিহির কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর একটি নৈতিক অঙ্গীকার। আইন পাস করলেই কাজ শেষ নয়—প্রয়োজন দ্রুত বিচার আইন, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, সীমান্তে আধুনিক গোয়েন্দা নজরদারি, বার্মা বর্ডারে কম্বিং অপারেশন, মাদক ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারীদের জাতীয় পর্যায়ে তালিকা প্রণয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা। একই সঙ্গে স্কুল-কলেজের আশপাশ মাদকমুক্ত অঞ্চল ঘোষণা, পরিবার ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং অর্থপাচার ও হুন্ডি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান জরুরি।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও এই কঠোরতার পক্ষে ও বিপক্ষে দু’বিচিত্র চিত্র তুলে ধরে। সিঙ্গাপুরে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি হেরোইন, কোকেন বা গাঁজা পাচারে বাধ্যতামূলক মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে; মাদক সংক্রান্ত অপরাধে ফাঁসি কার্যকরের জন্য দেশটি কুখ্যাত, অথচ সেখানে অ্যালকোহল স্বাভাবিক সামাজিক ও বাণিজ্যিক বাস্তবতার অংশ—বার কালচার ও লাইসেন্সভিত্তিক লিকার বিক্রি পুরোপুরি আলাদা আইন দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। মালয়েশিয়ায়ও বিপজ্জনক মাদক আইনের অধীনে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি ড্রাগ রাখলে বা পাচার করলে মৃত্যুদণ্ড ও বেত্রাঘাতের বিধান আছে, কিন্তু অ্যালকোহল সেখানে বৈধ, লাইসেন্সপ্রাপ্ত বারের মাধ্যমে চলে; ড্রাগ ট্রাফিকিং আর অ্যালকোহলকে আইনগতভাবে তারা দুই ভিন্ন জগৎ হিসেবে দেখে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় অ্যালকোহলও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় থাকলেও মৃত্যুদণ্ডের ফোকাস স্পষ্টভাবে “অ্যালকোহল ব্যতীত অন্যান্য মাদক”–এর ওপর, বিশেষ করে ইয়াবা, হেরোইন, কোকেন ও আইসের মতো ড্রাগ নেটওয়ার্কের ওপর। সেই অর্থে বাংলাদেশও সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার পথেই যাচ্ছে—মাদক পাচার ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অতি কঠোর আইন, আর অ্যালকোহলের জন্য আলাদা নিয়ন্ত্রণ কাঠামো। প্রশ্ন এখন একটাই: এ কঠোর আইন শুধু কাগজে-কলমে থাকবে, নাকি সত্যিই বড় সিন্ডিকেট, সীমান্ত নেটওয়ার্ক এবং প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স বাস্তবায়নে রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক সবাই মিলে সম্মিলিত চাপ তৈরি করতে পারবে? যদি পারে, তবে এই মৃত্যুদণ্ড আইন একদিন সত্যিই মাদকমুক্ত বাংলাদেশের লড়াইয়ের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

১৫১ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন