সর্বশেষ

মতামত

ময়মনসিংহে ৩৪ কোটি টাকার প্রত্নতত্ত্ব প্রকল্প এবং আমাদের কথা

ইমতিয়াজ আহমেদ
ইমতিয়াজ আহমেদ

বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬ ৫:১৮ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক 'ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রত্নস্থলসমূহের সংস্কার-সংরক্ষণ ও উন্নয়ন' শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে, যার বাস্তবায়ন কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে বলে জানা যায়। এই প্রকল্পটির মাধ্যমে আমরা ময়মনসিংহবাসী এ অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা সংস্কার ও উন্নয়নে আশার প্রদীপ দেখতে পাচ্ছি। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল জুলাই ২০২৪ থেকে জুন ২০২৭ পর্যন্ত, যা অনুমোদিত হয়েছে ২০২৫ সালের মার্চে। এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৩.২৯৯৩ কোটি টাকা।
ইমতিয়াজ আহমেদ

প্রায় ৩৪ কোটি টাকার এই প্রকল্পের মাধ্যমে ০৭টি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার সংস্কার, সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কাজ করা হবে। প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলো হলো— শশীলজ ভবন, মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ি, ময়মনসিংহ জাদুঘর, আলেকজান্ডার ক্যাসেল, জোড় মন্দির, এন এন পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও পাথরের শিব মন্দির। ০৫টি প্রত্নতত্ত্বস্থলে ১০টি প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য করা হবে। প্রত্নতত্ত্বস্থলসমূহ হলো— নেত্রকোণা জেলার রোয়াইলবাড়ি দুর্গ ও বরুজ ডিবি, ময়মনসিংহ জেলার বোকাইনগর কিল্লা ও কেল্লা তাজপুর দুর্গ এবং শেরপুর জেলার গড় জরিপা দুর্গ। এছাড়া ০৭টি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার স্থাপত্য ও ত্রিমাত্রিক ডকুমেন্টেশন তৈরি, আরসিসি সীমানা প্রাচীর, অভ্যন্তরীণ পাথওয়ে, ড্রেনেজ ব্যবস্থা; অফিস ভবন, অফিসার স্টাফ কোয়ার্টার, ক্যাফেটেরিয়া, টয়লেট, গার্ডরুম, স্যুভেনির শপ, টিকেট কাউন্টার, আনসার শেড ইত্যাদি নির্মাণ এবং ল্যান্ডস্ক্যাপিং ও বৃক্ষরোপণ কার্য বাস্তবায়ন করা হবে।

ময়মনসিংহ জেলায় ১১টি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা রয়েছে। যে ০৭টি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা এই প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে, তার সবগুলোই ময়মনসিংহ জেলার সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা। অবশিষ্ট ০৪টি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাও এই প্রকল্পের আওতায় আনা দরকার ছিল বলে আমরা মনে করি। প্রয়োজনে বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ বাড়িয়ে হলেও। ময়মনসিংহ জেলার ১১টি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ছাড়াও শত শত অসংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে। সংরক্ষিত ও অসংরক্ষিত সবগুলোরই চরম ভগ্নদশা! চারদিকে বিবর্ণ চিত্র, খসে খসে পড়ে যাচ্ছে, বিলীন/বেহাত হচ্ছে। এই প্রকল্প গ্রহণের ফলে অন্তত প্রকল্পাধীন ০৭টি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা বিলীন/বেহাত ও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাবে বলে আমরা মনে করি।

প্রশ্ন হলো, এই প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত প্রায় ৩৪ কোটি টাকার কার্যক্রম যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হবে কি? নাকি দায়সারাভাবে কাজ হবে? রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় হবে কি? এসব প্রশ্নের উত্তরের মাঝেই প্রকল্পের সার্থকতা নিহিত। সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী যদি অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হয়, কার্যক্রম যদি যথাযথভাবে হয়, তাহলে ০৭টি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা ধ্বংস ও বিলীন/বেহাতের হাত থেকে রক্ষা পাবে এবং ০৫টি প্রত্নস্থলের ১০টি প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য যথাযথভাবে হবে। অর্থাৎ প্রকল্পটির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সার্থক হবে।

প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার সংস্কারের ক্ষেত্রে তার প্রত্নতাত্ত্বিক আদল হুবহু রেখেই সংস্কার করতে হয়। অর্থাৎ একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার কোনো অংশ সংস্কার করলে তার প্রাচীন আদলটিই নতুন করে দৃশ্যমান করতে হয়। তা না হলে তার প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব হারিয়ে যায়। হারিয়ে যেতে বাধ্য। উদাহরণ হিসেবে ময়মনসিংহ নগরীতে ৯ একর জমির ওপর অবস্থিত শশীলজের প্রসঙ্গ টানা যায়। প্রতিটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার দুটি রূপ থাকে, একটি অভ্যন্তরীণ, অপরটি বাহ্যিক। শশীলজের বাহ্যিক রূপের অন্যতম অংশ তার দীর্ঘ সীমানা প্রাচীর, যার রয়েছে অনন্য স্থাপত্যশিল্প। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক সময়ে সময়ে এর সীমানা প্রাচীর সাধারণ মানে পুনর্নির্মাণ করার ফলে বাহ্যিক প্রত্নতাত্ত্বিক রূপটি দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমানেও এই প্রকল্পের আওতায় সাধারণ মানের নতুন সীমানা প্রাচীর পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছে। ফলে শশীলজের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার গুরুত্ব হারিয়ে যাচ্ছে। সময়ে সময়ে সাধারণ মানের সীমানা প্রাচীর পুনর্নির্মাণ করে যেভাবে দিন দিন শশীলজের বাহ্যিক প্রত্নতাত্ত্বিক রূপ বিলীন করা হচ্ছে, তাতে একজন অচেনা মানুষ প্রথম দর্শনে দেখে মনে করবে যে, এটি একটি সাধারণ বাড়ির সীমানা প্রাচীর। আগামী প্রজন্ম তো জানবেই না যে, শশীলজের কারুকার্যময় প্রত্নতাত্ত্বিক সীমানা প্রাচীর ছিল। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ ব্যয় করে প্রত্নতাত্ত্বিক আদল বিলীনপূর্বক এভাবে সংস্কার করে প্রত্নতাত্ত্বিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হাসিল হবে কি? এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ভাবা একান্ত জরুরি।

ময়মনসিংহে রয়েছে প্রত্নতাত্ত্বিক ভান্ডার। এই ভান্ডারের মধ্যে মাত্র ১১টি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা সংরক্ষিত তালিকার অন্তর্ভুক্ত, যার ০৮টি মুক্তাগাছা উপজেলায় এবং ০৩টি ময়মনসিংহ নগরীতে অবস্থিত। ১১টি সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার মধ্যে ০৭টি এই প্রকল্পের অধীনে সংস্কার, সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা হবে। এই ০৭টি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা যথাযথভাবে সংস্কার, সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা হলে একদিকে যেমন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলো রক্ষা পাবে, অন্যদিকে মানুষের মাঝে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হবে। দেশ-বিদেশের দর্শনার্থীরা ছুটে আসবে। পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটবে। স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে।

এছাড়া যথাযথভাবে ১০টি খননকার্য পরিচালনা করা হলে ময়মনসিংহ অঞ্চলের অজানা ইতিহাস, প্রাচীন সভ্যতা ও স্থাপত্য সম্পর্কে নতুন তথ্য উঠে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব স্থানে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন ও ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া গেলে ময়মনসিংহ অঞ্চলের ইতিহাস গবেষণায় নতুন মাত্রা যোগ করবে।

ময়মনসিংহের ঐতিহাসিক প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলো শুধু স্থাপত্য নয়, এ অঞ্চলের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসেরও নীরব চাক্ষুষ সাক্ষী। এগুলো যথাযথভাবে দৃশ্যমান থাকলে প্রজন্ম জানতে পারবে তার পূর্ব প্রজন্মের ইতিহাস ও এ অঞ্চলের বিকাশের ক্রমধারা। তাই ৩৪ কোটি টাকার বর্তমান প্রকল্পটি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হোক— আমরা ময়মনসিংহবাসী এমনটিই প্রত্যাশা করি।

লেখক : সদস্য সচিব, পুরাকীর্তি সুরক্ষা কমিটি, ময়মনসিংহ অঞ্চল।

১৪৮ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন