বিপন্ন জলসীমানায়—চট্টগ্রাম, সিলেট ও উত্তরবঙ্গ
মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬ ৭:০৭ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
আকাশে মেঘের ঘনঘটা দেখা দিলেই দেশের তিনটি অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের বুকে অজানা এক আতঙ্ক ভর করে। দক্ষিণ-পূর্বের পাহাড়-বেষ্টিত চট্টগ্রাম, উত্তর-পূর্বের হাওর-বেষ্টিত সিলেট ও উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ তিস্তা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা এর প্রত্যক্ষ উদাহরণ।
বাংলাদেশে বর্ষা কোনো আশীর্বাদ নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী বিভীষিকার নাম! প্রকৃতির নিয়ম মেনে বৃষ্টি হওয়া কিংবা পাহাড়ি ঢল আসা স্বাভাবিক ঘটনা। সেই স্বাভাবিকতা প্রতি বছর লাখ-লাখ মানুষের সাজানো সংসার ও শেষ সম্বলটুকু কেড়ে নিলে তাকে কেবল 'প্রাকৃতিক দুর্যোগ' বলে সান্ত্বনা খোঁজার পথ বন্ধ হয়ে যায়। এবারের বন্যায়, পহাড়ি ঢলে চ্ট্রগ্রাম ও সিলেট এই অঞ্চলগুলোতে ৫১ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে! পানিবন্দি হয়েছেন ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জনেরও বেশি মানুষ যারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। দেশজুড়ে চলমান রেকর্ডভাঙা বৃষ্টিপাতে সামগ্রিক ভূখণ্ডের এক-তৃতীয়াংশ তলিয়ে যাওয়ার তীব্র আশঙ্কায় কাঁপছে অববাহিকার জনপদ। ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও অবকাঠামো ভেঙেচুড়ে বিলীন হয়েছে নদীগর্ভে।
এই অন্তহীন কান্নার নেপথ্যে রয়েছে ভূ-রাজনীতি, পরিবেশবিধ্বংসী উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির ভয়ানক যোগসূত্র। এই সংকটের কারণগুলোকে বিশ্লেষণ করলে তিনটি স্পষ্ট দেয়াল দৃশ্যমান হয়—আন্তর্জাতিক উজান-রাজনীতি, দেশের ভেতরের ভুল উন্নয়ন দর্শন ও মেগা দুর্নীতির মহোৎসব।
বাংলাদেশ একটি ভাটির দেশ। চট্টগ্রাম, সিলেট কিংবা উত্তরবঙ্গের বুক চিরে প্রবাহিত নদীগুলোর সিংহভাগের উৎপত্তি ভারতের মেঘালয়, আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম কিংবা হিমালয়ের পাহাড়ে। ওইসব অঞ্চলে অতিভারী বৃষ্টিপাত হলে অভিকর্ষের নিয়মে সেই বিপুল জলরাশি সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। পাহাড়ি ঢলের সেই প্রলয়ংকরী গর্জন ডালপালা মেলে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে নিমিষেই। ভেসে যায় লাখ লাখ হেক্টর জমির সোনালী ফসল, তলিয়ে যায় কৃষকের গোয়ালভরা গবাদিপশু ও আজীবনের সঞ্চয়ে গড়া মাথা গোঁজার ঠাঁই।
উজানের দেশ হিসেবে ভারত আন্তর্জাতিক নদী আইনকে তোয়াক্কা না করে এককভাবে নদীশাসন শুরু করায় সংকট ঘনীভূত হয়। অভিন্ন ৫৪টি নদীর ওপর অসংখ্য ড্যাম, ব্যারেজ ও স্লইসগেট নির্মাণ করা হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে পানি আটকে রেখে বাংলাদেশের নদীগুলোকে মরুভূমি বানানো হয়। বর্ষা মৌসুমে ভারতের নিজস্ব বাঁধের ওপর চাপ বাড়লে কোনো আগাম সতর্কবার্তা ছাড়াই হঠাৎ গেটগুলো খুলে দেওয়া হয়। সিলেটের সুরমা-কুশিয়ারা, চট্টগ্রামের সাঙ্গু-মাতামুহুরীর কিংবা উত্তরবঙ্গের রংপুর বিভাগের তিস্তা, দুধকুমার ও ধরলার আকস্মিক রুদ্রমূর্তি উজানের এই অসম ও একতরফা পানি ব্যবস্থাপনার সরাসরি ফল।
ডাল-ভাত খেয়ে রাতে ঘুমাতে যাওয়া কৃষক ভোরের আলো ফোটার আগেই দেখেন উঠোনে পানি থৈ থৈ করছে, গোয়ালের গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগী ভেসে যাচ্ছে বানের জলে। একটি কার্যকর ও তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদান ব্যবস্থা আজ পর্যন্ত দুই দেশের কূটনৈতিক টেবিলে আলোর মুখ দেখেনি।
— ভারত পানি ছেড়ে দেবে—এটি একটি ভৌগোলিক বাস্তবতা। সেই পানি ধারণ করার জন্য দেশের নদী ও খালগুলোকে প্রস্তুত রাখার দায়িত্ব ছিল অভ্যন্তরীণ কর্তৃপক্ষের।
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প পাস হয়েছিল। সরকারি নথিপত্রে ও লাল ফিতার ফাইলের কাগজে খতিয়ান দেখানো হয়েছে—প্রকল্পের ৯০ শতাংশেরও বেশি কাজ শেষ! বর্ষা আসতেই পুরো চট্টগ্রাম শহর আটলান্টিক মহাসাগরের ক্ষুদ্র সংস্করণ হয়ে যায়। ভেতরের খবর নিলে দেখা যায়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন প্রকল্পের অধীনস্থ ২১টি স্লইসগেটের সিংহভাগ সম্পন্ন দাবি করা হলেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খালের মুখের রেগুলেটর ও পাম্প হাউজের কাজ পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। কাগজে-কলমে মেগা প্রকল্পের অবকাঠামো দৃশ্যমান হলেও মাঠপর্যায়ে তার সুফল এখনো অদৃশ্য।
প্রতি বছর সুরমা, কুশিয়ারা কিংবা খোয়াই নদী খননের নামে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ পায় পানি উন্নয়ন বোর্ড। বাস্তবে ড্রেজিংয়ের নামে এক চক্রাকার নাটক চলে। নদীর তলদেশ থেকে বালু তুলে তা নদীর পাড়েই স্তূপ করে রাখা হয়। প্রথম বৃষ্টির তোড়ে সেই বালু ধুয়ে পুনরায় নদীতে গিয়ে পড়ে। এই প্রক্রিয়া নদী বাঁচানোর উদ্দেশ্যে নয়, দুর্নীতিবাজ ঠিকাদার, আমলা ও অসৎ প্রকৌশলীদের পকেট ভরার মোক্ষম হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বাঁধ সংস্কারের নামে নামমাত্র কাজ করে বর্ষার ঠিক আগে তড়িঘড়ি করে বিল তুলে নেওয়ার যে সংস্কৃতি চালু আছে, বাঁধের ভাঙন তারই ফসল। কাগজের কলমে টেকসই বাঁধ হলেও বাস্তবে তা বালির বাঁধের মতোই নড়বড়ে। সিলেটের হাওরাঞ্চলে কিংবা উত্তরবঙ্গের চরাঞ্চলে পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ বন্ধ করে অপরিকল্পিতভাবে বড় বড় পাকা সড়ক ও পকেট বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। পানি নামার প্রাকৃতিক পথ বা ‘ফ্লাডপ্লেন’ অবরুদ্ধ করে দেওয়ায় বন্যা স্থায়ী রূপ নেয়। প্রকৃতির নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তৈরি করা এই অবকাঠামোগুলো মূলত দুর্নীতির মাধ্যমেই পরিবেশগত ছাড়পত্র পেয়ে যায়।
নদী খনন ও বাঁধ নিয়ন্ত্রণের নামে কাগজের রিপোর্টে প্রতি বছর সাফল্যের খতিয়ান দেখানো হলেও দুর্নীতির পানি না কমলে দেশের মানুষের চোখের পানি কোনোদিনও কমবে না। দুর্যোগ আসবেই, দুর্যোগকে পুঁজি করে যারা ত্রাণ ও পুনর্বাসনের বাজেট হরিলুট করে, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।
—সাময়িক চাল-ডাল বিতরণ কিংবা ভাঙা বাঁধে বালির বস্তার জোড়াতালি দেওয়া কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। স্থায়ী সমাধানের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ জরুরি। মেগা প্রজেক্টের নামে লুটপাট বন্ধ করতে হবে। চট্টগ্রামের স্লইসগেট প্রকল্পের মতো যে কাজগুলো কাগজে দেখানো হয়েছে কিন্তু বাস্তবে তাঅসম্পূর্ণ ও অকার্যকর রয়ে গেছে, সেগুলোর জন্য দায়ীদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে।
—ভারতের সাথে আন্তর্জাতিক নদী-কূটনীতিতে আরও জোরালো, যৌক্তিক ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। উত্তরবঙ্গ ও সিলেটের নদীগুলোতে আকস্মিক পানি ছাড়ার আগাম তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
পাহাড় কাটা ও জলাশয় দখলকারীদের বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। হাওরাঞ্চল ও চরাঞ্চলের সড়কগুলোতে পর্যাপ্ত কালভার্ট ও ওয়াটারপাস রাখা প্রয়োজন যেন পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত না হয়।
প্রকৃতিকে অবহেলা করে ও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়ে যে উন্নয়ন করা হচ্ছে, তা আসলে উন্নয়নের নামে একেকটি মৃত্যুর ফাঁদ। চট্টগ্রাম, সিলেট ও উত্তরবঙ্গের বানভাসি মানুষের হাহাকার সেই রূঢ় সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
লেখক : নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক।
১৮১ বার পড়া হয়েছে