১৮ বছর পূর্ণ হতেই শিশু পরিবার ছাড়ার নির্দেশ, অনিশ্চয়তায় ৫ শিক্ষার্থী
বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬ ২:০০ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
বাবাকে হারানো, পারিবারিক অক্ষমতা ও নানা প্রতিকূলতার কারণে ছোটবেলায় সরকারি শিশু পরিবারে আশ্রয় পেয়েছিল তারা। সেখানেই থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিল পাঁচ শিক্ষার্থী। কিন্তু ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ায় কুষ্টিয়া সরকারি শিশু পরিবার (বালক) থেকে তাদের চলে যেতে হয়েছে। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে থাকা এসব শিক্ষার্থী এখন আশ্রয় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে।
এক বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর দাদা-দাদির কাছে বড় হয়েছিলেন আকাশ ইসলাম। পরে মা তাকে ছেড়ে চলে গেলে ২০০৭ সালের অক্টোবরে চার বছর বয়সে ফুফা তাকে কুষ্টিয়া সরকারি শিশু পরিবারে (বালক) ভর্তি করে দেন। দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠানটিতে থেকে তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যান। ২০২১ সালে এসএসসি এবং ২০২৩ সালে এইচএসসি পাস করার পর বর্তমানে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে স্নাতক প্রথম বর্ষে পড়ছেন তিনি।
তবে এখন আকাশের সামনে নতুন অনিশ্চয়তা। ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ায় সম্প্রতি তাকে ও আরও চার শিক্ষার্থীকে শিশু পরিবার ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। গত সোমবার (১৩ জুলাই) তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে বিদায় নিতে হয়েছে।
আকাশ ইসলাম বলেন, তার দাদা মারা গেছেন। দাদি জীবিত থাকলেও অসুস্থ। বেশির ভাগ সময় ফুফুর বাড়িতে থাকতে হবে বলে আপাতত সেখানেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পশ্চিম লাহিনীপাড়ার মৃত শহিদুল ইসলামের ছেলে আকাশের চিন্তা এখন পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে।
একই এলাকার আরেক শিক্ষার্থী আকাশ শেখের জীবনও অনেকটা একই রকম। ২০১১ সালে বাবাকে হারানোর পর আর্থিক সংকটের কারণে স্বজনেরা তাকে শিশু পরিবারে রেখে যান। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ২০২১ সালে এসএসসিতে জিপিএ-৪.৮৯ এবং ২০২৩ সালে এইচএসসিতে জিপিএ-৪.০০ পেয়ে বর্তমানে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগে প্রথম বর্ষে পড়ছেন তিনি।
আগামী ২৭ জুলাই তার প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু পরীক্ষার আগে কোথায় থাকবেন এবং কীভাবে পড়াশোনা চালাবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও সেখানেও রয়েছে আর্থিক সংকট। তার মা ও বড় ভাই থাকেন। বড় ভাই ভাঙারি ব্যবসা করে কোনোভাবে সংসার চালান।
শুধু আকাশ ইসলাম ও আকাশ শেখ নন, শিশু পরিবার থেকে বের হয়ে যেতে হয়েছে তুষার আহাম্মেদ, আলফাজ হোসেন ও অভি হাসানকেও। ছোটবেলায় বাবাকে হারানো, পরিবারের আর্থিক দুরবস্থা কিংবা মায়ের অন্যত্র বিয়ে—এসব কারণে তারা শিশু পরিবারে আশ্রয় পেয়েছিলেন।
আলফাজ হোসেন বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি জানান, বাবার মৃত্যুর পর মা অন্যত্র বিয়ে করেন। ২০১২ সালে তাকে শিশু পরিবারে ভর্তি করা হয়। আর্থিক সমস্যার কারণে এক বছর কলেজে ভর্তি হতে পারেননি তিনি। এখন স্থায়ীভাবে থাকার কোনো জায়গা নেই তার।
আলফাজ বলেন, তার মা ভাই-ভাবির সঙ্গে কুষ্টিয়া শহরের হাউজিং এলাকায় সরকারি জায়গায় থাকেন। ভাইয়ের নিজের সংসার চালানোই কঠিন। এ অবস্থায় সেখানে গিয়ে থাকা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
তুষার আহাম্মেদ জানান, সাত বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর তিনি শিশু পরিবারে আশ্রয় পান। আগামী বছর এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন থাকলেও আশ্রয় হারানোর কারণে সেই স্বপ্ন এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
অভি হাসানও জানান, নিরাপদ থাকার ব্যবস্থা না হলে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে যাবে।
শিক্ষার্থীদের দাবি, ১৮ বছর পূর্ণ হলেই একজন এতিম বা অসহায় তরুণ স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে না। পড়াশোনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
কুষ্টিয়া সরকারি শিশু পরিবারের (বালক) দায়িত্বপ্রাপ্ত হল সুপার ও অতিরিক্ত উপ-তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ আলী জানান, নীতিমালা অনুযায়ী ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ায় পাঁচ শিক্ষার্থীকে তাদের পরিবারের কাছে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজনকে প্রতিষ্ঠান থেকে ৩০ হাজার টাকা করে এবং একজনকে ১২ হাজার টাকার শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়েছে।
জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. আব্দুল লতিফ বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী ১৮ বছর পর্যন্ত শিশু পরিবারের দায়িত্ব থাকে। তবে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাইলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে শিক্ষাবৃত্তিসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, পাঁচ শিক্ষার্থীর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তাদের সাময়িক সমস্যা কাটাতে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের বিষয়েও সহযোগিতা করা হবে।
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ-বিন হাসান জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত হয়েছেন। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কীভাবে আরও সহায়তা করা যায়, তা নিয়ে কাজ চলছে।
১১৭ বার পড়া হয়েছে