সর্বশেষ

মতামত

কুলফিওয়ালার দর্শন — "দুর্নীতি নাই তো উন্নতি নাই"

লিটন আব্বাস
লিটন আব্বাস

মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬ ৫:৩৫ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
—চার বছর আগে একদিন এক কুলফিওয়ালা আমাকে বলেছিল, "দুর্নীতি নাই তো উন্নতি নাই" যা শুনে গায়ে কাঁটা দেওয়ার পাশাপাশি এক অদ্ভুত আরাম পেয়েছিলাম। কুলফিওয়ালার সেই কথাটি যে জীবনের অমোঘ ধ্রুবপদ হয়ে উঠবে, তা আসলেই সত্যি।

বর্তমান সমাজব্যবস্থায় আমরা উন্নতি বলতে কেবলই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বহুতল ভবন বা দৃশ্যমান অবকাঠামোকে বুঝছি। মানুষের নৈতিক মানদণ্ড, সততা ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশকে আর সফলতার মাপকাঠি ধরা হয় না। একটি রাষ্ট্রে মেধা, পরিশ্রম ও সততার চেয়ে তদবির, ঘুষ ও জালিয়াতি দ্রুত ধনী হওয়ার পথ তৈরি করে, তখন কুলফিওয়ালার এই দর্শনই সমাজের মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।

"দুর্নীতি নাই তো উন্নতি নাই"—যুক্তি ও নৈতিকতার পরিপন্থী এই আপাত-কৌতুকাবহ বাক্যটি এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন মন্তব্য নয়; বরং বাংলাদেশের সমাজবাস্তবতায় এ এক নির্মম 'ধ্রুবপদ' বা প্যারাডক্স হয়ে উঠেছে।

বছরের পর বছর ধরে প্রান্তিক মানুষের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার নির্যাস থেকে উঠে আসা এই বাক্যটির ভেতরে লুকিয়ে আছে গভীর দ্বিমুখী অর্থ। এই একটি বাক্য একই সঙ্গে এ দেশের মনস্তাত্ত্বিক অবক্ষয় এবং সামগ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ঐতিহাসিক ক্ষতকেই নির্দেশ করে।

এই দর্শনের ভেতরে যে অন্তর্নিহিত অর্থ লুকিয়ে আছে, তা মূলত দুটি বিপরীতমুখী বাস্তবতাকে ধারণ করে—স্বাধীনতার উত্তরকাল থেকেই এ দেশে একটি অলিখিত শাসন কায়েম হয়েছে—অবৈধ উপায় অবলম্বন না করলে রাতারাতি অঢেল সম্পদ, বিলাসবহুল গাড়ি, জমি কিংবা সুরম্য পেন্টহাউসের মালিক হওয়া দুষ্কর। ক্ষমতার বলয়ে থেকে জবাবদিহিতাহীন লুণ্ঠনের মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের এই ধারা যুগের পর যুগ ধরে কেবল বিস্তৃতই হয়েছে।

—এর বিপরীত সত্যটি হলো, জাতীয় পর্যায়ে দুর্নীতি বন্ধ না হলে প্রকৃত, টেকসই এবং বৈষম্যহীন উন্নয়ন কোনোদিনই সম্ভব নয়। চুইয়ে পড়া অর্থনীতির নামে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে বিপুল পুঁজি জমে ওঠা কখনোই একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের উন্নয়ন সূচক হতে পারে না।

—একটি বৈষম্যহীন সমাজ এবং দুর্নীতির চিরতরে অবসানের লক্ষ্যে এ দেশের মানুষ ও তরুণ প্রজন্ম ঐতিহাসিক ও রক্তক্ষয়ী 'জুলাই বিপ্লব' সংঘটিত করেছে। কিন্তু বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশেও যখন জেলা, উপজেলা থেকে শুরু করে প্রশাসনিক স্তরের আনাচে-কানাচে সেই পুরোনো দুর্নীতি ও কাঠামোগত বৈষম্যের পুনরাবৃত্তি দেখা যায়, তখন তা নাগরিক মনস্তত্ত্বকে চরমভাবে আহত করে।

জবাবদিহিতা আদায়ের জায়গায় জনগণের যে সোচ্চার ভূমিকা থাকার কথা ছিল, সেখানে কাঠামোগত জড়তা ও দায়িত্বহীনতা এখনো দৃশ্যমান। প্রশ্নপত্রের উত্তর যথোপযুক্ত জায়গায় পেশ করার মতো করে আমূল সংস্কারের দাবি তুলতে ব্যর্থ হলে, ব্যবস্থাটি আবারও সেই পুরোনো বৃত্তেই আবর্তিত হতে বাধ্য।

—উন্নয়নের অবাস্তব কিংবা অতি-উচ্চাকাঙ্ক্ষী মডেলের পেছনে না ছুটে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করে সর্বস্তরে দুর্নীতি প্রতিরোধ করা গেলে বাংলাদেশকে রাতারাতি সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়া বানানো না গেলেও, ভিয়েতনাম ও মালদ্বীপের মতো সুদৃঢ় অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর দাঁড় করানো অনায়াসেই সম্ভব। এর সবচেয়ে বড় রূপান্তরটি ঘটবে শ্রমবাজারে। এ দেশের মানুষকে আর ভাগ্য অন্বেষণে মধ্যপ্রাচ্য বা দূরদেশে গিয়ে প্রান্তিক শ্রমিকের (Migrant Worker) জীবন বেছে নিতে হবে না। উল্টো, একটি দুর্নীতিমুক্ত, আইনের শাসনভিত্তিক ও গতিশীল অর্থনীতির টানে অপেক্ষাকৃত অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মানুষ বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের সন্ধানে আসবে—যা হবে ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে একটি ঐতিহাসিক সমীকরণ পরিবর্তন (Reverse Migration)।

—রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য শত পৃষ্ঠার জটিল রাজনৈতিক ইশতেহারের প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে টেকসই পরিবর্তনের জন্য একটিমাত্র ইশতেহারই যথেষ্ট; "সর্বস্তরে দুর্নীতি বন্ধ করো।"

সংকটের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে কোনো অলৌকিক ফর্মুলার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন কেবল অদম্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রবল প্রাণশক্তি এবং সাহসের সঙ্গে নীতি বাস্তবায়নের দৃঢ়তা। এই তিনের মেলবন্ধন ঘটলে যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠা কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।

লেখক : নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক

১৬১ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন