সর্বশেষ

সারাদেশ

কচুরিপানা ও আবর্জনায় ভরাট চালনা লেক: স্বাস্থ্যঝুঁকিতে দাকোপবাসী

দিলীপ বর্মণ, খুলনা
দিলীপ বর্মণ, খুলনা

রবিবার, ১০ মে, ২০২৬ ১:০৪ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
খুলনার দাকোপ উপজেলার চালনা পৌরসভার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত মিঠা পানির ঐতিহ্যবাহী লেকটি দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় কচুরিপানা ও আবর্জনায় প্রায় ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।

এতে একদিকে যেমন মিঠা পানির সংকট তীব্র হচ্ছে, অন্যদিকে দূষিত পানির দুর্গন্ধে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। একইসঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বেড়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

দাকোপ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুদীপ বালা জানান, দূষিত পানি ব্যবহার করলে চর্মরোগ হতে পারে। এ পানি পান করলে ডায়রিয়া, আমাশয় ও টাইফয়েডের মতো রোগ দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি এ পানিতে জন্ম নেওয়া মশা ম্যালেরিয়া ছড়াতে পারে। তিনি বলেন, এসব রোগ প্রতিরোধে সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং কোনোভাবেই এই পানি ব্যবহার করা উচিত নয়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলা সদর ও পৌরসভার গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক এলাকার মাঝখানে থাকা লেকটি পুরোপুরি কচুরিপানায় ঢেকে গেছে। অনেক স্থানে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ জমেছে। দুই পাড়ের অধিকাংশ অংশ ভেঙে গিয়ে লেকটি তার সৌন্দর্য হারিয়েছে। স্থানীয়রা বসতবাড়ির নালা সংযুক্ত করায় এটি এখন কার্যত একটি বর্জ্যভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।

চালনার শ্রীশ্রী রাধা গোবিন্দ মন্দিরের সভাপতি অতীন মন্ডল বলেন, মিঠা পানির সংকট নিরসনে লেকটির সংস্কার জরুরি। একসময় এর পশ্চিম পাশে গরুর হাট বসত, যা এখন নষ্ট হয়ে গেছে। চারপাশে বসার বেঞ্চ ও সৌন্দর্যবর্ধন করা হলে এটি পৌরসভা ও উপজেলাবাসীর জন্য একটি দৃষ্টিনন্দন বিনোদনকেন্দ্র হতে পারে।

সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক সাংবাদিক শুভ্র শচীন বলেন, সমুদ্র উপকূলবর্তী তিনটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নিয়ে গঠিত দাকোপ উপজেলা চারদিকে ঢাকী, পশুর, শিবসা ও কাজীবাছা নদী দ্বারা বেষ্টিত। এখানে পানি থাকলেও তা নিরাপদ নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লবণাক্ততা ক্রমাগত বাড়ছে, ফলে সারাবছর বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, উপজেলার বেশিরভাগ মানুষ পুকুর ও টিউবওয়েলের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে পৌরসভার ৫, ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা গোসল, রান্না ও গৃহস্থালির কাজে এই লেকের পানির ওপর নির্ভর করতেন। কিন্তু প্রায় দুই দশক সংস্কার না হওয়ায় এখন তা ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা চেয়ারম্যানরা লেকটি ইজারা দিতেন। বর্তমানে সেই প্রক্রিয়া বন্ধ রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেনি।

দাকোপ উপজেলা নাগরিক পরিষদের সভাপতি ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা অ্যাডভোকেট মহানন্দ সরকার বলেন, ষাটের দশকে চালনা বন্দরের পশুর নদীর শাখা খালের দক্ষিণ পাশে বাঁধ দিয়ে লবণাক্ত পানি প্রবেশ বন্ধ করা হয়। পরে এটিকে চালনা লেক নাম দেওয়া হয়। ১৯৭৮ সালে ৭৫০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৮৫ মিটার প্রস্থে পুনর্খননের মাধ্যমে এটি মিঠা পানির আধার হিসেবে গড়ে ওঠে।

তিনি আরও বলেন, কয়েক বছর আগেই লেকের পানি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে গেছে। এখন এটি কচুরিপানা ও ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হচ্ছে। দুর্গন্ধ ও মশা-মাছির উপদ্রবে এলাকাবাসী চরম দুর্ভোগে আছেন। বহুবার লিখিতভাবে বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করা হলেও কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

চালনা বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গৌতম সাহা বলেন, লেকটি দূষিত হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার মানুষ চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন। তিনি বলেন, মিঠা পানির প্রয়োজনে দ্রুত লেকটি সংস্কার করা জরুরি।

স্থানীয় বাসিন্দা সনৎ কুমার হুই বাচ্চু বলেন, আগে চৈত্র-বৈশাখে পুকুর শুকিয়ে গেলে এই লেকই ছিল প্রধান ভরসা। এখন তা সম্পূর্ণ ব্যবহার অনুপযোগী। একসময় এখানে নৌকাবাইচ, সাঁতার প্রতিযোগিতা হতো এবং হাজারো মানুষ উপভোগ করত। এসব ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন রয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও চালনা পৌরসভার প্রশাসক মো. বোরহান উদ্দিন মিঠু বলেন, ঐতিহ্যবাহী এই লেকটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের সম্পত্তি হওয়ায় কিছু আইনি জটিলতা রয়েছে। ইতোমধ্যে বোর্ডে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহির মাজহার বলেন, চিঠি পাওয়া গেছে। আপাতত কচুরিপানা অপসারণের বিষয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আমীর এজাজ খান বলেন, দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর করতে চালনা লেকের কচুরিপানা পরিষ্কার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে লেকের পানি ব্যবহারযোগ্য করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
 

১২১ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
সারাদেশ নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন