ময়মনসিংহের চরাঞ্চল হাসপাতালে ২ দশকেও চালু হয়নি পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা
রবিবার, ১০ মে, ২০২৬ ১১:৪৯ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
মৌলিক চাহিদার অন্যতম চিকিৎসাসেবা। দেশে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নের নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ এখনো কমেনি। হাসপাতাল থাকলেও চিকিৎসক সংকট, অব্যবস্থাপনা ও জনবল ঘাটতির কারণে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন লাখো মানুষ।
ময়মনসিংহের চরাঞ্চলের একটি সরকারি হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে ভয়াবহ এক চিত্র। রোগীরা ভিড় জমালেও নেই চিকিৎসক। হাসপাতালের কলাপসিবল গেটের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে রোগীরা নিজেদের সমস্যার কথা বলছেন, আর হাসপাতালের কর্মচারীরা সেই অনুযায়ী ওষুধ বিতরণ করছেন। যেন রোগীরাই নিজের চিকিৎসক।
ময়মনসিংহ শহর থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ‘চরাঞ্চল ২০ শয্যা হাসপাতাল’-এ সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালটিতে কোনো চিকিৎসকের উপস্থিতি নেই। অথচ চরাঞ্চলের লাখো মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসাস্থল হওয়ার কথা ছিল এই হাসপাতালটির। বর্তমানে এটি স্থানীয়দের কাছে যেন এক অবহেলিত প্রতিষ্ঠান।
২০০৬ সালে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার পরানগঞ্জ বাজারসংলগ্ন এলাকায় স্থানীয়দের দান করা তিন একর জমিতে হাসপাতালটি নির্মাণ করা হয়। দ্বিতল এই ভবনে নারীদের জন্য ১২টি ও পুরুষদের জন্য ৮টি শয্যার ব্যবস্থা থাকার কথা। চিকিৎসক ও কর্মচারীদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে চারটি আবাসিক ভবনও। কিন্তু প্রায় দুই দশক পেরিয়ে গেলেও হাসপাতালটিতে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা চালু হয়নি। বর্তমানে বহির্বিভাগে সীমিত আকারে কিছু ওষুধ বিতরণ ছাড়া কার্যত কোনো চিকিৎসাসেবা নেই।
হাসপাতালে দেখা যায়, রোগীরা গেটের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে নাম লিখছেন। ওয়ার্ডবয় মো. হাসিম উদ্দিন খাতায় নাম তোলার পর রোগীরা পাশের জানালায় গিয়ে নিজেরাই বলছেন তাঁদের কী ওষুধ প্রয়োজন। এরপর মাস্টার রোলে কর্মরত আয়া শাহিনা আক্তার রোগীদের চাহিদা অনুযায়ী ওষুধ তুলে দিচ্ছেন। অথচ নিয়ম অনুযায়ী চিকিৎসক রোগী পরীক্ষা করে ব্যবস্থাপত্র দেবেন এবং সেই প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ফার্মাসিস্ট ওষুধ বিতরণ করবেন।
ছাতিয়ানতলা গ্রামের লাইলী আক্তার বলেন, “ডাক্তার দেখাইনি। ওষুধ দিতে বলছি, ওষুধ দিয়ে দিয়েছে।”
ওষুধ নিয়ে ফেরার পথে নারগিস আক্তার বলেন, “সকাল ৯টায় আইছি। লোকজন দেরিতে আসে। বড় ডাক্তার আইতে দেখি না। আমরা যা চাই, তাই দিয়ে দেয়।”
হাসপাতালে আসা আম্বিয়া খাতুন বলেন, “পেটব্যথার কথা বলছি, ওষুধ দিছে। এখানে ঠিকমতো চিকিৎসা হয় না, শহরে যেতে হয়।”
বোররচর গ্রামের কোহিনূর আক্তার বলেন, “এখানে কোনো চিকিৎসা নাই। শুধু জ্বর, পেট খারাপ আর গ্যাসের কয়েকটা ওষুধ দেয়। বুক ধড়ফড় করলে সেই চিকিৎসা নাই। ডাক্তারও নাই। টাকা না থাকায় ময়মনসিংহ যেতে পারি না। এখানে ডাক্তার থাকলে অনেক উপকার হতো।”
ছাতিয়ানতলা গ্রামের বাসিন্দা জান্নাত আক্তারও একই অভিযোগ করে বলেন, “ডাক্তার দেখাইছি না। ওষুধ দিতে বলছি, ওষুধ দিছে।”
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বিতরণকে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ কামরুজ্জামান খান বলেন, “নিয়ম অনুযায়ী চিকিৎসক রোগ নির্ণয় করবেন এবং সেই অনুযায়ী চিকিৎসা দেবেন। চিকিৎসক ছাড়া ওষুধ দেওয়া জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। এতে রোগী সঠিক ওষুধ নাও পেতে পারেন কিংবা পূর্ণ ডোজ সম্পন্ন না হওয়ার ঝুঁকি থাকে।”
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, পাঁচজন চিকিৎসকের পদ থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র দুজন। তাঁদের মধ্যে আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) নবারুন বিশ্বাস ও জুনিয়র কনসালট্যান্ট আজিম উদ্দিন (হীরা)-কে হাসপাতালে পাওয়া যায়নি। কর্মচারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, একজন অসুস্থ এবং অন্যজন জরুরি কাজে বাইরে গেছেন।
এ ছাড়া প্রায় দুই বছর আগে গাইনি চিকিৎসক নিবেদিতা রায় (দোলা) সংযুক্তিতে অন্যত্র চলে যাওয়ার পর থেকে প্রসূতি সেবা বন্ধ রয়েছে। অন্য দুই চিকিৎসকের একজন ছয় মাস আগে এবং আরেকজন দুই মাস আগে বদলি হয়ে গেছেন।
হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, অবকাঠামো থাকলেও তার ব্যবহার নেই। দ্বিতীয় তলার নারী ও পুরুষ ওয়ার্ড, নার্স স্টেশন ও অপারেশন থিয়েটার ধুলাবালিতে ঢেকে আছে। অপারেশন থিয়েটারে নেই কোনো টেবিল, যন্ত্রপাতি পড়ে আছে বাক্সবন্দী অবস্থায়। অনেক সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে গেছে বলেও জানান সংশ্লিষ্টরা।
হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট মিন্টু চন্দ্র দে ২০২০ সাল থেকে এখানে কর্মরত। তিনি বলেন, “প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ রোগী আসে। রোগীরা লাইনে দাঁড়িয়ে সমস্যার কথা বলেন, আমরা ওষুধ দিয়ে দিই। খুব কম রোগী প্রেসক্রিপশন নিয়ে আসে। যদিও রোগীর কথামতো ওষুধ দেওয়ার নিয়ম নেই, কিন্তু আমি যোগদানের পর থেকেই এভাবেই চলছে।”
অন্তর্বিভাগ চালু না থাকায় নার্সদেরও কার্যত কোনো কাজ নেই। পাঁচজন নার্সের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন তিনজন। নার্স চন্দনা রানী দত্ত বলেন, “অন্তর্বিভাগ চালু থাকলে রোগী ভর্তি, ইনজেকশন দেওয়া—অনেক কাজ থাকত। এখন শুধু মাঝে মাঝে স্বাস্থ্য শিক্ষা দিই, রক্তচাপ মাপি।”
নবনিযুক্ত নার্স সাইফুর রহমান বলেন, “চাকরিতে ভালো কাজ করার স্বপ্ন ছিল, কিন্তু এখানে সে সুযোগ নেই।”
হাসপাতালের পেছনে থাকা দুটি একতলা ও দুটি দ্বিতল আবাসিক ভবন এখন প্রায় পরিত্যক্ত। জানালার কাচ ভাঙা, ভেতরের আসবাব নষ্ট, এমনকি ভবনের ভেতরেও জন্মেছে গাছপালা। পুরো এলাকা যেন এক ভুতুড়ে পরিবেশে পরিণত হয়েছে।
হাসপাতালের নার্স নুসরাত জাহান বলেন, “আমার বাড়ি গৌরীপুরে। চাকরির কারণে পরিবার নিয়ে এখানে ভাড়া বাসায় থাকি। কোয়ার্টারগুলো ব্যবহারযোগ্য হলে সেখানে থাকা যেত।”
স্থানীয় শিক্ষক আলী আজগর বলেন, “এলাকাবাসী বিনা মূল্যে জমি দিয়ে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অথচ চিকিৎসার অভাবে প্রসূতি নারী রাস্তায় সন্তান প্রসব করে, আহত রোগী পথে মারা যায়। এখন শুধু কিছু ওষুধ দেওয়া হয়, ডাক্তার রোগী দেখে না—এভাবে হাসপাতাল চলে না।”
ময়মনসিংহের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ফয়সল আহমেদ বলেন, “হাসপাতালটিতে পৌঁছাতে গাড়িতে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় লাগে। চরাঞ্চলের মানুষের সেবার জন্য এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা জরুরি। জনবল কাঠামো অনুমোদনের বিষয়টি বর্তমানে মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। অনুমোদন পেলে দ্রুত অন্তর্বিভাগ চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
রোগীদের চাহিদা অনুযায়ী ওষুধ বিতরণের বিষয়ে তিনি বলেন, “এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। আমি মনে করি এটি অপরাধের মতো বিষয়। উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা হবে।”
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ বলেন, গত ৩০ মার্চ তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে হাসপাতালটি দ্রুত চালুর অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, “ইনশাআল্লাহ, খুব দ্রুতই হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে।”
১২৫ বার পড়া হয়েছে