তিতাসের পাড়ে একাকী ঋষি: অদ্বৈত মল্লবর্মণ ও মরণশীল সভ্যতার অমর আখ্যান
শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬ ২:৩৮ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের আকাশে যখন নাগরিক মধ্যবিত্তের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা কিংবা ড্রয়িংরুমের সূক্ষ্ম আভিজাত্য প্রধান হয়ে উঠেছিল, ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে এক নিঃসঙ্গ পদাতিকের আবির্ভাব ঘটেছিল। তিনি অদ্বৈত মল্লবর্মণ। তাঁর কলম কোনো কৃত্রিম তাত্ত্বিক বিন্যাসে বিশ্বাসী ছিল না; বরং তা ছিল তিতাস নদীর মতোই স্বতঃস্ফূর্ত, মাটির গন্ধে বিভোর এবং এক অবহেলিত জনপদের আত্মিক উচ্চারণে মুখর।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি এমন এক বিরল শিল্পী, যিনি কেবল নিম্নবর্গের মানুষের কথা লেখেননি, বরং নিজেই সেই ইতিহাসের অংশ হয়ে তাঁদের যাপিত জীবনকে মহাকাব্যিক রূপ দিয়েছেন। তাঁর জীবন ও সাহিত্য যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ—যেখানে দুঃখ আছে, বঞ্চনা আছে, কিন্তু শেষমেশ আছে এক শাশ্বত মানবতার জয়গান।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গোকর্ণঘাটের সেই সাধারণ মালো পল্লিতে জন্মানো ছেলেটি যখন বড় হয়ে কলকাতার বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে জায়গা করে নিলেন, তখন তাঁর হৃদয়ের গহীনে তিতাস নদীটি ঠিক আগের মতোই প্রবহমান ছিল। শৈশবে বাবা-মাকে হারিয়ে অনাথ হওয়া, গ্রামের মানুষের অকৃপণ দাক্ষিণ্যে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া—এসবই তাঁর সংবেদনশীল মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। তিতাস তীরবর্তী সেই ধীবর সমাজের সুখ-দুঃখ, তাদের উৎসব-পার্বণ এবং প্রকৃতির সাথে তাদের যে নিরন্তর মিতালি, তা অদ্বৈতের রক্তে মিশে গিয়েছিল। তিনি যখন লেখেন, "তিতাস একটি নদীর নাম। তার কূলজোড়া জল, বুকভরা ঢেউ, প্রাণভরা উচ্ছ্বাস।" তখন বুঝতে কষ্ট হয় না যে, এটি কেবল একটি ভৌগোলিক বর্ণনা নয়, বরং এক জনপদ ও তার আত্মার স্পন্দন। তিতাস এখানে কোনো জড় পটভূমি নয়, সে এক জীবন্ত দেবী, এক মমতাময়ী জননী, যে তার কোল পেতে দিয়েছে একদল ব্রাত্য মানুষের জন্য।
অদ্বৈতের সাহিত্যপাঠে এক অদ্ভুত বিষাদমাখা প্রশান্তি অনুভব করা যায়। তিনি যখন তিতাসের বর্ণনা দেন, তখন প্রকৃতি আর মানুষ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। তাঁর উপন্যাসের পাতায় পাতায় বেজে ওঠে সেই শাশ্বত সুর: "স্বপ্নের ছন্দে সে বহিয়া যায়। ভোরের হাওয়ায় তার তন্দ্রা ভাঙে, দিনের সূর্য তাকে তাতায়, রাতে চাঁদ ও তারারা তাকে নিয়া ঘুম পাড়াইতে বসে, কিন্তু পারে না।" এই যে নদীকে ঘিরে নক্ষত্রলোকের এক নীরব খেলা, এটিই অদ্বৈতের দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি জানতেন, মানুষ মরণশীল, সমাজ পরিবর্তনশীল; কিন্তু প্রকৃতির এই যে অমোঘ চক্র, তা চিরন্তন।
অনেকে অদ্বৈত মল্লবর্মণকে কেবল একজন ‘আঞ্চলিক’ লেখক হিসেবে চিহ্নিত করতে চান। কিন্তু তিতাস নদীর প্রেক্ষাপটে তিনি যে জীবনদর্শন এঁকেছেন, তা তো কাল ও ভূগোলের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। আন্তোনিও গ্রামসি যে ‘সাব-অল্টার্ন’ বা নিম্নবর্গের স্বরের কথা বলেছিলেন, কিংবা গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক যে নীরবতাকে চিহ্নিত করেছিলেন, অদ্বৈত সেই নীরবতাকে এক সুগভীর সংগীতে রূপান্তর করেছেন। তাঁর লেখায় মালোরা কেবল মাছ ধরার মজুর নয়, তারা সংগীতপ্রিয়, উৎসবপ্রিয় এবং আত্মমর্যাদাসম্পন্ন এক গোষ্ঠী। তাদের দারিদ্র্য আছে, কিন্তু তাদের হৃদয়ে কোনো সংকীর্ণতা নেই। নদী যখন কানায় কানায় ভরে ওঠে, তখন তাদের আনন্দও যেন পার ছাপিয়ে যায়। আবার সেই নদী যখন শুকিয়ে যায়, তখন তাদের জীবনের সব সুরও যেন নিভে যায়।
অদ্বৈতের দেখার ভঙ্গিটি ছিল নিবিড়। তিনি দেখেছেন নদী কীভাবে মানুষের সব গোপন বেদনা শুষে নেয়। তাঁর ভাষায়, "কত বুকের কত আগুন, কত চাপা বাতাস তার জলে নিবিয়াছে। কতকাল ধরিয়া এ-সব সে নীরবে দেখিয়াছে, দেখিয়েছে আর বহিয়াছে।" এই যে নদীর নীরব দর্শক হওয়া এবং মানুষের কান্নাকে নিজের স্রোতে মিশিয়ে নেওয়া—এটিই তো মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডির মূল সুর। মালোদের অভাবের সংসারেও যে গান জাগে, যে নৌকাবাইচের উন্মাদনা তৈরি হয়, তা কোনো তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে ধরা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন একাত্মতা। অদ্বৈত সেই সমাজের সন্তান বলেই হয়তো তাঁর গদ্যে কোনো মেদ নেই, আছে হৃদয়ের টান।
বাংলা সাহিত্যে ধীবর জীবনের আর একটি বিখ্যাত আখ্যান মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’। মানিক যখন কুবের-কপিলাদের আঁকেন, তখন তিনি এক নির্মোহ পর্যবেক্ষক। তাঁর লেখায় মার্ক্সীয় শ্রেণিসংগ্রাম ও বস্তুবাদের ছাঁচ স্পষ্ট। কিন্তু অদ্বৈতের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। মানিকের দেখাটি ছিল উপর থেকে দেখা, আর অদ্বৈতের দেখাটি ছিল ভেতর থেকে অনুভব করা। অদ্বৈতের মালোরা কোনো বিশেষ রাজনৈতিক আদর্শের বাহক নয়, তারা তিতাসের সন্তান। তাদের জীবনে ধর্ম, বিশ্বাস, কুসংস্কার আর ভালোবাসা এমনভাবে জট পাকিয়ে থাকে যা বিচ্ছিন্ন করা অসম্ভব। মানিক যেখানে জেলের জীবনের রুক্ষ বাস্তবতাকে বড় করে দেখেছেন, অদ্বৈত সেখানে দেখেছেন তাদের সংস্কৃতির অবক্ষয় ও এক প্রাচীন ঐতিহ্যের বিলুপ্তি। এটিই ‘অবজেক্টিভ রিয়ালিজম’ আর ‘অনটোলজিক্যাল রিয়ালিজম’-এর তফাত।
কলকাতায় সাংবাদিকতা করার সময় অদ্বৈত অনেক আধুনিক চিন্তার সংস্পর্শে এসেছিলেন। কিন্তু শহরের সেই নাগরিক কোলাহল তাঁকে তাঁর শিকড় থেকে এক মুহূর্তের জন্যও বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। তিনি ছিলেন অদ্ভুত এক দ্বৈতসত্তার মানুষ। দিনের বেলা তিনি তীক্ষ্ণধী সাংবাদিক, আর রাতে তিনি তিতাস তীরের সেই অবোধ কিশোর অনন্ত। তাঁর লেখায় এক ধরনের পরিশীলিত গদ্য ও আঞ্চলিক ভাষার যে সহাবস্থান দেখা যায়, তা মিখাইল বাখতিনের ‘বহুস্বরতা’র সার্থক উদাহরণ। মালোদের মুখের ভাষা যখন তাঁর গদ্যে প্রাণ পায়, তখন তা উপভাষা থাকে না, হয়ে ওঠে জীবনেরই এক অকৃত্রিম সংগীত।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন বড় একা। যক্ষ্মার করাল গ্রাস যখন তাঁর শরীরকে ক্ষয় করছিল, তখনো তিনি তিতাসের সেই মরাল গতিকে শব্দের ফ্রেমে বাঁধতে চেয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুচেতনা ছিল অত্যন্ত গভীর। তিনি জানতেন, জীবনের পথ বড় জটিল। তাই তো তিনি লিখেছিলেন, "যে পথ চিনিয়া চলে তার পথ একটি, আর যে দিশাহারা হইয়া চলে তার পথ শত শত।" অদ্বৈত নিজে সেই একটি পথই চিনেছিলেন—তা হলো শিল্পের পথ, শিকড়ের পথ। শত অভাবের মাঝেও তিনি লক্ষ্যভ্রষ্ট হননি। তাঁর ‘সাদা হাওয়া’ বা ‘রাঙামাটি’ উপন্যাস দুটিতেও আমরা তাঁর গভীর মননশীলতার পরিচয় পাই। সেখানেও তিনি মানুষের অস্তিত্বের সংকটের কথা বলেছেন, তবে তা সবসময় মাটির খুব কাছাকাছি থেকে।
আজকের এই যান্ত্রিক সময়ে দাঁড়িয়ে অদ্বৈতের প্রাসঙ্গিকতা হয়তো আরও বেশি। আমরা যখন উন্নয়নের নামে নদীকে হত্যা করি, প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করি, তখন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ আমাদের এক বড় হুঁশিয়ারি দেয়। নদী মরে যাওয়া মানে কেবল একটি জলধারা শুকিয়ে যাওয়া নয়, নদী মরে যাওয়া মানে একটি সংস্কৃতি, একটি জীবনবোধ ও একদল মানুষের স্বপ্নের মৃত্যু। অদ্বৈত যেন বহু আগেই এক ‘ইকোলজিক্যাল ওয়ার্নিং’ দিয়ে গেছেন। উপন্যাসের শেষ দিকে যখন তিতাসের বুকে চর জাগে, যখন মানুষ ঘাস কাটতে যায় সেই ধু-ধু বালুচরে, তখন পাঠকের মনে যে হাহাকার তৈরি হয়, তা আজ বিশ্বব্যাপী পরিবেশগত সংকটেরই প্রতিচ্ছবি।
অদ্বৈতের লেখায় বর্ষার এক বিধ্বংসী অথচ মোহময় রূপ আছে। তিনি লিখেছেন, "অনেক নদী আছে বর্ষার অকুণ্ঠ প্লাবনে ডুবিয়া তারা নিশ্চিহ্ন হইয়া যায়। পারের কোনো হদিস থাকে না, সবদিক একাকার।" এই যে সব একাকার হয়ে যাওয়ার বর্ণনা, এর ভেতরেও এক অদ্ভুত দর্শনের ইঙ্গিত মেলে। প্লাবন যখন আসে, সে তখন ক্ষুদ্র-বৃহৎ ভেদ চেনে না। মানুষের জীবনও তো তেমনি। এক মহাকালের প্লাবনে আমরা সবাই ভেসে চলেছি। অদ্বৈত মল্লবর্মণ সেই প্লাবনের মধ্যে এক স্থির দ্বীপের মতো আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে মানুষের মহিমাকে ধরে রাখতে হয়।
বাসন্তী চরিত্রের কথাই ধরা যাক। সে মালো সমাজের এক অপরাজেয় নারী। তার জীবনের ট্র্যাজেডি যেন তিতাস নদীরই নিয়তি। তার ভেতরে যে প্রেম, যে ত্যাগ আর যে ধ্রুপদী গাম্ভীর্য আছে, তা বিশ্বসাহিত্যের যেকোনো মহান চরিত্রের সমতুল্য। বাসন্তী তিতাসের ধারের সেই মাটিমাখা অস্তিত্বের প্রতীক, যে সব হারিয়েও মাথা নত করে না। অদ্বৈতের নারী চরিত্রগুলো কখনো দুর্বল নয়; তারা সামাজিক শোষণের মুখে দাঁড়িয়েও এক ধরনের অলৌকিক সহ্যশক্তি প্রদর্শন করে। এই যে মানুষের ওপর বিশ্বাস রাখা, এটিই অদ্বৈতের সাহিত্যের মূল শক্তি।
ঋত্বিক কুমার ঘটক যখন এই উপন্যাসটিকে চলচ্চিত্রে রূপ দিলেন, তখন তিতাস যেন এক বৈশ্বিক হাহাকারে পরিণত হলো। ঋত্বিকের সেই দৃশ্যগুলো—যেখানে একটি শিশু তার তৃষ্ণার্ত চোখে নদীর ধুঁকে ধুঁকে মরা দেখে—তা অদ্বৈতের হাহাকারকেই সেলুলয়েডে বন্দি করেছিল। আজ ২০২৬ সালের দাঁড়িয়ে আমরা যখন ভার্চুয়াল জগতের গোলকধাঁধায় নিজেদের হারিয়ে ফেলছি, তখন অদ্বৈতের সেই তিতাস যেন আমাদের কানে কানে বলে যায় যে, মানুষের আসল পরিচয় তার শিকড়ে। শিকড়হীন মানুষ যেমন বাঁচে না, তেমনি নদীহীন সভ্যতাও টিঁকে থাকতে পারে না।
অদ্বৈত মল্লবর্মণের জীবন ছিল বড় সংক্ষিপ্ত, মাত্র ৩৭ বছরের। কিন্তু এই অল্প সময়ে তিনি যা দিয়ে গেছেন, তা কয়েক শতাব্দীর জন্য যথেষ্ট। তিনি ছিলেন এমন এক কারিগর, যিনি জানতেন যে জীবনের আসল কথাগুলো নিরবেই বলতে হয়। তাঁর গদ্যে কোনো অযথা চিৎকার নেই, আছে এক গভীর আর্তি। মার্টিন হাইডেগার যাকে বলেছিলেন ‘মৃত্যুমুখী সত্তা’, অদ্বৈত সেই মৃত্যুকে জয় করেছেন তাঁর শিল্পের মধ্য দিয়ে। তিনি জানতেন তিতাস মরে যাবে, মালোদের জীবন পাল্টে যাবে, কিন্তু সেই স্মৃতিগুলোকে যদি অক্ষরের মায়ায় বেঁধে রাখা যায়, তবেই তা অমরতা পাবে।
অদ্বৈত মল্লবর্মণ কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নন, তিনি অনুভবের বিষয়। তিতাস নদী আজ হয়তো আগের মতো তার কূলজোড়া জল নিয়ে বইছে না। চরের ওপর হয়তো কৃষিকাজ হচ্ছে, বদলে গেছে মালোদের গ্রাম। কিন্তু অদ্বৈতের বইয়ের পৃষ্ঠা খুললেই সেই জলতরঙ্গের শব্দ শোনা যায়। কান পাতলে শোনা যায় মাঝিদের সেই উদাস করা গান। "তিতাস একটি নদীর নাম। তার কূলজোড়া জল, বুকভরা ঢেউ, প্রাণভরা উচ্ছ্বাস।"—এই কথাগুলো যখন পড়ি, তখন মনে হয় নদীটি আসলে লেখকের হৃদয়ে বইছিল। তিনি নিজেই ছিলেন এক প্রবহমান নদী। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য এক অসামান্য ভাষ্যকারকে হারিয়েছে সত্য, কিন্তু তিতাসের সেই অবিনশ্বর স্রোত আজও পাঠকদের মনে দোলা দিয়ে যায়। অদ্বৈতের উত্তরাধিকার আজ আর কেবল একটি জনপদে সীমাবদ্ধ নেই; তা ছড়িয়ে পড়েছে সেই সব মানুষের কাছে, যারা নিজের সত্তাকে খুঁজতে চায় মাটির গভীরতম তলে। শেষ পর্যন্ত তিনি যে প্রশ্নটি রেখে গেছেন তা হলো—আমরা কি সত্যিই আমাদের নদীগুলোকে, আমাদের শিকড়গুলোকে বাঁচাতে পারব? উত্তরটা হয়তো আজও তিতাসের সেই শুকনো বালুচরে দীর্ঘশ্বাস হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। লেখক কি নিজে এর সমাধান জানতেন? সম্ভবত না। কিন্তু তিনি যা অনুভব করেছিলেন, তা আমাদের চেতনার মূলে এক স্থায়ী কম্পন ধরিয়ে দিয়ে গেছেন। তিতাস বইছে, বইবে—হয়তো মানচিত্রের বুকে নয়, কিন্তু মানুষের স্মৃতির সেই শাশ্বত ক্যানভাসে।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।
১২৭ বার পড়া হয়েছে