"ফিরে যাই ফিরে আসি"
শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৬ ১১:১৩ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
জহির (ছদ্মনাম) ভাইয়ের সাথে প্রথম দেখা হয়েছিল যেন কোথায় আর কখন? কুষ্টিয়াতে? আরও সূক্ষ্মভাবে স্মরণ করলে, এন এস রোডের মাথায় বকচত্বর পাবলিক লাইব্রেরির সামনে এক গুমোট ধোঁয়াচ্ছন্ন চায়ের দোকানে! ধোঁয়ার কারণ? দোকানটাতে কেরোসিনের বদলে খড়ির চুলা; আগুনের সাথে চায়ের স্বাদের দারুণ সম্পর্ক আছে বুঝলে? পরিচয়ের আরও পরে জহির ভাই কবে যেন বলেছিলেন কথাটা।
জহির ভাইকে প্রথম দেখলাম সেই চায়ের দোকানে; তখন বিকেল নাকি সন্ধ্যা? সমস্ত আকাশ নিকষ কালো মেঘে ঢাকা ছিল সেদিন; বৈশাখ নাকি আষাঢ় মাস তখন? চায়ে চুমুক দিতে দিতে জহির ভাই হঠাৎ আকাশের দিকে মুখ তুলে বলেছিলেন, নাকি গেয়েছিলেন? "আজি ঝড় হবে নাকি বৃষ্টি হবে.....;
সেই তখন আমি আর রূমী দৃষ্টি বিনিময় করেছিলাম, কেউ কিছু বলিনি; অথচ আমি ওর জিজ্ঞাসাকে বুঝে নিয়েছিলাম, আর ও বুঝে নিয়েছিল আমার সম্মতিকে! আমি আর রূমী ; আমরা দুজন সেই স্কুল জীবনেই চমৎকার বন্ধু হয়েছিলাম, পারস্পরিক পছন্দের টানে; এসবেরও অনেক আগে থেকেই আমরা প্রচুর বই পড়তাম; যদিও আমাদের জঁরা আলাদা ছিল; আমি ফিকশন আর রূমী দর্শন; আমি বোধ হয় তখন লেখক হতে চেয়েছিলাম, আর রূমী হতে চেয়েছিল জ্ঞানপুরুষ; জ্ঞানী হবার প্রবল নেশা ছিল ওর; আর লেখক হতে গেলেও যেহেতু একটুআধটু জ্ঞানী হতে হয়, সুতরাং আমি এবং আমাদের তখন বন্ধুত্ব না হয়ে উপায় ছিল না। সেসময় আমাদের আরও বন্ধু ছিল এবং আমরাও অনেকের বন্ধু ছিলাম, কিন্তু সবার মধ্যে আমাদের ব্যাপারটা একটু আলাদা ছিল; কিন্তু ওই বয়সের আড্ডাগুলোতে যা হয়, তখনতো আমাদের ভাঙনের বয়স; লিঙ্গ নিরপেক্ষতাকে ভেঙে আমরা তখন ক্রমশ স্বতন্ত্র পুরুষ হয়ে উঠছি; সুতরাং সেই তখন আমাদের, নারীসত্তাকে প্রবলভাবে বোধ করার বয়স; আমরাও বোধ করি, কিন্তু সে বোধের বেশিরভাগটাই জুড়ে থাকে শরীর আর যৌনতা! তবে সে তুলনায় আমাদের দুজনের স্বতন্ত্র আড্ডাগুলো তখন অনেক পরিণত; রূমী আমাকে "দ্যা রেইপ অব ডার্কনেস" বোঝায়; আমরা তখন কথা বলি থিওরি অব ডাইমেনশন নিয়ে; যদিও সেসব আলোচনার তাত্ত্বিক সত্যতা বিচারের কোনো সুযোগই ছিল না; তাছাড়া আমি বিশ্বাস করতাম, অন্তত আমার চাইতে রূমীর জ্ঞানগরিমা বেশি; সেকারণে রূমীর বক্তব্যকে নির্বিচারে বিশ্বাস করা ছাড়া আমার উপায়ও ছিল না।
আমরা তখন স্কুল পাস করে সবে কলেজে ভর্তি হয়েছি; রূমী চলে গেল কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে, আর আমি বহুপথ ঘুরেফিরে অবশেষে পাংশা কলেজে থিতু হলাম; সেই সময়, আমি প্রায়ই বিকেল বেলার ট্রেন ধরে বিনা টিকিটে কুষ্টিয়া চলে যাই! রূমীর মেস তখন পিটিআই রোড; চমৎকার খোলা মাঠের মতো জায়গা; যতদূর মনে পড়ে, ওর মেসের সামনেই অনেকটা জায়গা জুড়ে বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত ছিল বোধ হয়! আমরা সন্ধ্যায় সেই শহুরে ধানক্ষেতের ইট বাঁধানো পাকা আইলে বসে থাকতাম, সিগারেট খেতাম, গল্প করতাম, আর এইসব ঘটনার ব্যাকগ্রাউন্ডে রূমীর মটোরোলা ভি থ্রি আই ফোনে প্রেমের গান বাজতো, "ভেজা সন্ধ্যা, অঝোর বৃষ্টি......! আমরা কি তখন প্রেম করতাম? আমি নই; রূমী? রূমী তখন প্রেম করত! তার চেয়েও বেশি করতো ঝগড়া! আমার মনে হয়, প্রেমের চাইতে রূমী ঝগড়াতেই বেশি দক্ষ ছিল; কারণ? যেহেতু ও খুব যুক্তিবাদী ছেলে ছিল এবং সবকিছুরই তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা চাইতো, আর কে না জানে হায়! চিরকাল মেয়েদের সেই ব্যাখ্যাবিমুখ হৃদয়! হয়তো নিজের প্রেমের সেই অসফল অভিজ্ঞতা থেকেই আমাকে প্রেমের ব্যাপারে রূমী নিরুৎসাহিত করতো; বলতো, জ্ঞানী হতে চাইলে প্রেমটেম করিস না; জ্ঞানী আর প্রেমিক একসাথে হওয়া যায় না; নারী হলো জ্ঞাননাশিনী;
সেই সময় জ্ঞানান্বেষণের পাশাপাশি রূমী জ্ঞানী মানুষও অন্বেষণ করতো; জহির ভাই তখন ওর সেই অন্বেষণ পর্যায়েরই আবিষ্কার! পাঠকজীবনের একটা পর্বে প্রবলভাবে হুমায়ুনাচ্ছন্ন হয়েছিলাম! সেই তখন একদিন রূমী জানালো, কুষ্টিয়াতে সে একজন হিমুর সন্ধান পেয়েছে! হিমুর সাথে তার তফাৎ শুধু এই যে, হলুদ পাঞ্জাবি আর খালি পায়ে রাতের বেলা হাঁটাহাঁটির বদলে, সে নাকি সানগ্লাস, টি-শার্ট, জিন্স আর কেডস জুতো পরে দিনের বেলায় হাঁটাহাঁটি করে, আর প্রচুর রং চা খায়; খুব জ্ঞানী মানুষ; একেবারে ভরা কলস; সুতরাং বাজাবাজি কম, অর্থাৎ কথাবার্তা খুব কম বলেন; যত্রতত্র এবং যার তার নিকট তিনি তার জ্ঞানপাত্র উপুড় করেন না; রূমী বহুচেষ্টায় তার সেই জ্ঞানপাত্রের কাছাকাছি হয়েছে, এখন কোনোমতে একবার উপুড় করতে পারলেই হয়!
সেদিন সকাল থেকেই ঝুপঝুপ বৃষ্টি; রূমী ফোন করে জানালো, আজ পূর্ণিমা, জহির ভাই একটা বিশেষ প্ল্যান করেছেন, তোর কথাও বলেছি, চলে আয়; আমি সেই ঝুপঝুপ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে দুপুরের ট্রেনে উঠলাম।
তারপর সেদিন সেই বিকেল আর সন্ধ্যার মুখোমুখি এক বিভ্রান্তিকর সময়ে ধোঁয়াচ্ছন্ন চায়ের দোকানটাতে জহির ভাইয়ের সাথে প্রথম দেখা; আমাকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ শেষে জহির ভাই রূমীকে প্রশস্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, লম্বুটা কি চায়? রূমীও ঠাট্টা করে বললো, সে জ্ঞানী হতে চায়....
জহির ভাই সে ঠাট্টাকে মোটেও পাত্তা দিলেন না; চায়ের কাপে শান্ত চুমুক দিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন— লম্বা মানুষ আর্মির চাকরি করবে, পুলিশের চাকরি করবে, জ্ঞানী হয়ে ওর কাজ কি? আমরা হাসবো কি হাসবো না দ্বিধায় ছিলাম; জহির ভাই নিজেই হেসে সেই দ্বিধাকে উড়িয়ে দিলেন; বললেন ডোন্ট বি স্যাড ইয়ং ম্যান, আসলে নিজে খাটো বলে আমি লম্বা মানুষদের ঈর্ষা করি, তাদের আঘাত করে তৃপ্তি পাই; এই কথা বলতে বলতে জহির ভাই কি তখন সিগারেট ধরিয়েছিলেন?
তারপর সেদিন সেই মনোরম মনোটোনাস গায়ত্রী সন্ধ্যায়— সমস্ত আকাশজুড়ে তখনও মেঘের সন্ত্রাস— মাথার উপর প্রবল বৃষ্টির আশঙ্কা নিয়ে আমরা তিনজন হেঁটে হেঁটে চলে গিয়েছিলাম রেনউইক বাঁধ, তারপর গড়াই নদীর তীর ধরে ধরে আরও বহুদূর... আমরা কোনো গল্প করেছিলাম? ঠিক গল্প নয়, এলোমেলো নানান বিক্ষিপ্ত কথা; প্রবল বাতাসে সেসব কথা আমাদের পরস্পরের কানে পৌঁছানোর আগেই উড়ে যাচ্ছিল; রূমীই বেশি কথা বলছিল বোধ হয়; জহির ভাই তার চমৎকার ভরাট গলায় থেমে থেমে রবীন্দ্রসংগীত গাইছিলেন, নাকি ভূপেন হাজারিকা? "মেঘ থমথম করে, কেউ নেই"..... নদীর বিস্তীর্ণ খোলা বুক থেকে ধেয়ে আসছিল প্রবল হাওয়া; সে হাওয়ার শীতে আমাদের শরীরে কাঁপন ধরেছিল! আমাদের অপেক্ষা ছিল, বৃষ্টি নয়, মেঘ ভেঙে কখন পূর্ণিমার চাঁদ উঠবে! কিন্তু সে রাতে আপসহীন সন্ত্রাস মেঘ অবশেষে চাঁদকে ক্ষমা করেনি এবং অপেক্ষাহীন হয়ে আমরা ফিরে এসেছিলাম; তারপর যতবার কুষ্টিয়াতে গিয়েছি, আমাদের বেপরোয়া আড্ডায় ফল্গুধারার মতো কেটে গিয়েছে একেকটি বিকেল, সন্ধ্যা, রাত, আরও অনেক অনেক গভীর রাত; পিটিআই রোড যেখানে স্টেশন রোডের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে কবরস্থানের দিকে এগিয়ে গেল, সেদিকে খানিকটা গিয়ে ডানদিকে গলির মুখেই ছিল একটা নিশাচর চায়ের দোকান; এখনও কি আছে? না বোধ হয়; দোকানদারকে সেই তখনই ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ বলা যায়; বেশ একটা মেলানকোলিক বিষণ্ণ চেহারা ছিল লোকটার; কেতলি উঁচিয়ে কাপে চা ঢালার সময় হাতটা কেমন নড়বড়ে করত; লোকটাকে দেখে মনে হতো, বহুদিন আগে সে শেষবার হেসেছিল, তারপর আর হাসেনি বহুকাল, কিংবা হাসতো হয়তো, আমরা দেখিনি কোনোদিন; কেবল একদিন কাজের অবসরে আমাদের চলমান গল্পে হয়তো কান রেখেছিল, অনেকটা শুনে অবশেষে জিজ্ঞেস করেছিল, "এসব কি হাদিসের কথা?....আমরা গল্প থামিয়ে তিনজনই সমান আশ্চর্য চোখে তাকিয়েছিলাম ওর দিকে; লোকটা কি মরে গেছে?
মাঝে মাঝে জহির ভাই খুব অফ হয়ে যেতেন; কোনো কথা নেই, একেবারে চুপচাপ; শামুক যেমন খোলসের ভেতর ঢুকে উপরের ঢাকনাটা টেনে দেয়, অনেকটা তাই; আবার কোনো কোনো দিন অনর্গল কথা বলে যেতেন; জীবনানন্দের কবিতার পরম ভক্ত ছিলেন; অজস্র কবিতা মুখস্থ ছিল তার; জহির ভাই নিজে ছিলেন দর্শনের ছাত্র এবং অস্তিত্ববাদ তার প্রিয় বিষয়; জ্যাঁ-পল সার্ত্র নাকি নিৎসে? তর্কটা ছিল প্রবল, অথচ সেটা তার নিজের সাথেই! কারণ, প্রতিপক্ষ হিসেবে আমাদের অবস্থা তখন "তা বটে ঠিক" এর মতোই নস্যি! হেগেলের দ্বন্দ্বনির্ভর ভাববাদের উপর চমৎকার বিশ্লেষণী বক্তব্য দিতেন; এত চমৎকার বোঝাতেন! অথচ শেষ সময়ে স্বেচ্ছায় ছাত্রত্ব ত্যাগ করেছিলেন, ফাইনাল পরীক্ষায় আর বসেননি। একবার অনেকদিন জহির ভাইয়ের কোনো খোঁজ নেই! ফোন অফ! মেস থেকে ঠিকানা নিয়ে আমরা তার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম; বেশ অবস্থাসম্পন্ন কৃষিজীবী পরিবার; গোয়াল ভরা গরু, গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ, আরও অনেক কিছু; বিশাল জায়গা জুড়ে বাড়ি; একান্নবর্তী পরিবার; অনেক মানুষ বাড়িতে; জহির ভাই কিন্তু আমাদের দেখে মোটেও সুখী হলেন না, এবং মনে হলো তিনি ইতিমধ্যেই অসুখী সময় পার করছেন; আমাদের ধারণাই সঠিক হলো— কিছুক্ষণ বাদে জহির ভাই বললেন এসেছো ভালোই হয়েছে; তোমাদের সাথে আজ বিকেলেই ফিরে যাবো; তারপর সবিস্তারে ঘটনা যা জানা গেল, জহির ভাই লেখাপড়া বন্ধ করার ঘোষণা দিয়ে বাড়িতে ইউরোপ গমনের টাকা দাবি করেছেন! কিন্তু তার দাবিকে নিদারুণভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, এবং পড়ালেখা বন্ধের জন্য বাড়ি থেকে সবরকম টাকাপয়সা দেওয়াও বন্ধ করে দিয়েছে! এমতাবস্থায় কিছুদিন আগেই নিদারুণ আর্থিক সংকটে জহির ভাই ক্ষেতে ঘাস খাওয়ারত অবস্থায় তার মায়ের মাদী ছাগলটাকে হাঁটে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করেছেন! সন্ধ্যায় ছাগল খুঁজে না পেলে ঘটনা জানাজানি হয়; মা খুব কান্নাকাটি করেছেন; ছাগলটা মায়ের খুব ভালোবাসার, যাকে বলে পয়মন্ত ছিল; অনেকগুলো বাচ্চা দিয়েছে; আবারও নাকি শীঘ্রই দিতো; মা তার ছাগল হারানোর শোক এখনও সামলে উঠতে পারেননি; বাড়িতে জহির ভাইয়ের দুদিন যাবৎ খাবারদাবার বন্ধ! গ্রামাঞ্চলে কোনো খাবার হোটেল না থাকায় অগত্যা তিনি পাউরুটি খেয়ে দিনাতিপাত করছেন। জহির ভাই আমাদেরকেও দোকানে নিয়ে গিয়ে পাউরুটি খাওয়ালেন; বললেন, খাবার হিসেবে পাউরুটি বেশ চমৎকার, কার্বোহাইড্রেট এবং সুগারের দারুণ ব্যালান্স, খাবার পর ফুয়েল হিসেবে শরীরকে দীর্ঘসময় শক্তি জোগায়, যেটা ভাত খেয়ে পাওয়া নাকি সম্ভব নয়! পাউরুটি খাবার বিশেষ পদ্ধতিও শেখালেন, পাউরুটি মুখে নিয়ে কিছুক্ষণ চিবিয়ে ময়েশ্চার করার পর সামান্য এক চুমুক পানি, ব্যাস.... অ্যান্ড রিপিট দ্যাট প্রসেস আনটিল ফিনিশ; পাউরুটি খেয়ে সেই বিকেলেই আমরা জহির ভাইকে নিয়ে ফিরে এলাম।
কলেজ পাঠ চুকিয়ে আমি ঢাকায় চলে আসার পর জীবনের পালাবদলে আমাদের যোগাযোগ ভেঙে পড়ে! বহুদিন, তারপর বহুবছর আমরা যোগাযোগহীন! এমনই হয়! জীবনের নাট্যমঞ্চে কোনো চরিত্রের সাথে আমাদের ঠিক কতখানি ভূমিকা, সেটাও নির্দিষ্ট এবং পূর্বনির্ধারিত! শেষ হলে জীবনই তার প্রস্থান ঘটায় এবং আবার নতুন চরিত্রের আগমন। বহুবছর পর এবার ঈদের ছুটিতে একটা বিশেষ প্রয়োজনে কুষ্টিয়াতে গিয়েছিলাম; ফেরার সময় ট্রেনে উঠবো; হঠাৎ দূর থেকে দেখি জহির ভাই ট্রেন থেকে নামছেন; তার কোলে তিন-চার বছর বয়সী ফুটফুটে একটা বাচ্চা, হাত ধরে আছে আট-নয় বছর বয়সী আরেকটি ছেলে; পেছনেই বোরকা পরিহিত একজন নারী; অনুমান করতে পারি, সে জহির ভাইয়ের স্ত্রী; বয়সের তুলনায় আরও বেশি বয়স্ক লাগছিল জহির ভাইকে; দাড়ি রেখেছেন, বেশ একটু মোটা হয়েছেন মনে হলো; হিসেব করে দেখলাম, সময়ের ব্যবধানটাও কম নয়; প্রায় উনিশ বছর! ট্রেন থেকে নেমে একটু ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে বড় ছেলেটাকে কেন যেন ধমকাচ্ছেন, আর এক হাতে ব্যাগপত্র সামলাচ্ছেন! একবার ইচ্ছে হলো ছুটে যাই! জহির ভাই আমাকে দেখে অবশ্যই চিনতে পারবেন না, তারপর প্রচণ্ড অবাক হবেন নিশ্চয়ই; চেনার পর কি বলবেন..? আমিই বা কি বলবো! যাবো?
কিন্তু কোথাও একটা অপরিচয়ের সংকোচ আমাকে আড়ষ্ট করে ফেলে!
বাইরে থেকে মানুষটা হয়তো সেই একই; কিন্তু যে জহির ভাই আমার তারুণ্যকে বোহেমিয়ান মণ্ডিত করেছিলেন, যিনি বলেছিলেন, সেভেন ইয়ারস ইন তিব্বতের মতো তিনিও জীবনের দশটি বছর অন্নপূর্ণায় ট্রাইব জীবন কাটাবেন, জীবনকে ব্যয়ের উপর নিজের স্বাধীন এবং সম্পূর্ণ অধিকার বজায় রাখতে নারী, বিবাহ তথা সংসার নামক সোনার শিকলের ধারেকাছে যাবেন না.....
আমি শেষবারের মতো খুব ভালো করে লক্ষ্য করলাম, জহির ভাইয়ের হাতে সত্যিই কোনো শিকল পড়ানো আছে কিনা! তখন দুই হাতে দুটি ব্যাগ শক্ত করে ধরে জহির ভাই খুব জোরে হাঁক ছেড়ে রিকশা ডাকছেন, পেছনে দাঁড়িয়ে তার সংসারের শস্যক্ষেত আর ফলিত ফসলেরা...
ছেড়ে যাওয়ার চূড়ান্ত হুইসেল বেজে উঠলো; আমি ট্রেনে উঠে পড়ি; আমার মনে পড়লো সেই কবেকার কথা! জহির ভাই বলেছিলেন, জ্ঞানের একটা রিভার্স ইফেক্ট আছে বুঝলে? নিজের অর্জিত জ্ঞানই মানুষকে দূরারোগ্য অসুখের মতো আক্রান্ত করতে পারে; জীবনবোধকে জেনেও জীবনে প্রয়োগ করতে না পারার অস্বস্তিবোধ মানুষকে সারাটি জীবন অসুখের মতোই তাড়া করে! যে সুখ পেলাম না, তার জন্য বড়জোর আকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে, অভাব নয়; কিন্তু যে সুখ পেয়েছি, তাকে হারিয়ে ফেলার অভাব আমাদের চিরকালীন এবং সেইজনিত অসুখের যন্ত্রণাও অশেষ; নির্বোধদের সুবিধা হলো, তাদের এই অসুখে ভুগতে হয় না!
আজ জহির ভাইয়ের মুখোমুখি দাঁড়ালে হয়তো আমিও তার অসুখটাকে দেখে ফেলতাম; আর অবচেতনেই তিনি হয়তো প্রাণপণে লুকোতে চাইতেন তার সেই অসুখ, যে অসুখের পরিচয় একদিন তিনিই আমাকে দিয়েছিলেন!
লেখক : কবি ও শিক্ষক
(লেখাটি লেখকের ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে)
১২১ বার পড়া হয়েছে