সকল নিরপরাধের মুক্তি চাই
বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬ ১০:০৯ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
চব্বিশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে টালমাটাল গোটা দেশ। পতিত সরকারের একতরফা দমন-পীড়ন তারুণ্যের বারুদ নেভাতে পারেনি। বরং গর্জে উঠেছে, চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছে ৫ আগস্ট।
তারুণ্যের স্বপ্ন বাস্তবায়নে ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠন করা হয় অন্তর্বর্তী সরকার। সংস্কার আর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে গিয়ে দমন-পীড়নের অভিনব ধারা তৈরি করে তারা। মব সন্ত্রাসকে 'জাস্টিস' বানিয়ে চাপিয়ে দেয়া হয় শিক্ষক, গণমাধ্যম, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীসহ সর্বস্তরের মানুষের ওপর। ডিপ স্টেস্টের এজেন্ডা বাস্তবায়ন, সীমাহীন অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, মব সন্ত্রাস, টাকা পাচার, প্রশাসনে নিজেদের লোক বসানো, পদায়ন ও রদবদলে প্রকাশ্যে ঘুষ লেনদেনসহ হাজারও কারণে চব্বিশ এখন এক পতিত ধ্রুবতারার নাম। জাতির সাথে, দেশের সাথে প্রতারণা ছিল কী না-তা নিয়ে আলোচনা চলছে জোরেশোরে।
পরিসংখ্যান বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর 'মব সন্ত্রাস' এর মাধ্যমে দেশজুড়ে প্রায় আড়াই হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাড়ে তিন হাজার শিক্ষক হেনস্তার শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে শারীরিক ও মানসিক আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে এ পর্যন্ত ছয়জন শিক্ষক মারা গেছেন। পাঁচ শতাধিক আহত ও অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। সামাজিকভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন ঠিক কতজন-এর কোনও হিসেব নেই।
মানবাধিকার সংস্থা 'অধিকার' এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের গত ১৭ মাসে 'মব সন্ত্রাস' এ ৪৫ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে গত এক বছরেই অর্থাৎ ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে খুন হয়েছেন ৩৩ জন। আর গণপিটুনিতে গত ১৭ মাসে ১৮১ জন নিহত হয়েছেন।
ঢাকাসহ সারা দেশে নির্বিচার পুলিশ হত্যাকাণ্ড নিয়ে কথা বলা নিষেধ। তাই বললাম না। এবার আসি গায়েবি/ভুয়া/সাজানো মামলা দিয়ে বাণিজ্যের বিষয়ে। হয়রানির এক কালো অধ্যায় শুরু হয় ৫ আগস্টের পর। আপনি কোনদিন রাজনীতি করেননি। গান, কবিতা, আঁকাআঁকি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। মনের আনন্দে কী-বোর্ডে সুর তোলেন। আপনি বাসায় আছেন, অথচ আপনার নামে হত্যাচেষ্টা, রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়ে গেছে। পুলিশ এসে ধরে নিয়ে গেলো। আদালতে তোলা মাত্র রিমান্ড মঞ্জুর। এরপর থেকে কারাগারে। অপরাধ কী, আপনার বাবা একসময় মন্ত্রী ছিলেন। পতিত দলের রাজনীতি করতেন। বাবার রাজনীতির বলি হতে হচ্ছে সন্তানকে। এভাবেই চলছে, প্রিয় বাংলাদেশ। আর কতদিন চলবে কে জানে!
জামিন কী হচ্ছে না? হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলছি, সাবের হোসেন চৌধুরীর কথা। সাবেক এই পরিবেশমন্ত্রীকে হত্যা মামলায় রিমান্ডে পাঠানোর পরদিনই সেটিসহ ছয় মামলায় জামিন দেন আদালত। এটা ০৮ অক্টোবর ২০২৪ এর কথা। বিষয়টি নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। কিন্তু নীরবতা ছিল উত্তর। যা বোঝার সবাই বুঝে নিয়েছেন আশা করি। বিস্তারিত আলাপে যাবো না। কারণ, তাকে নিয়ে রাজনীতিতে নতুন সমীকারণের কথা বলা হচ্ছে।
এবার আসি সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর বিষয়ে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় রাজধানীর লালবাগ থানার হত্যাচেষ্টা মামলায় সাবেক স্পিকারকে জামিন দিয়েছেন আদালত। রোববার (১২ এপ্রিল, ২০২৬) আসামি পক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জাকির হোসাইনের আদালত ৫০ হাজার টাকা মুচলেকায় তার জামিন মঞ্জুর করেন।
সবশেষ, কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন যুব মহিলা লীগ নেত্রী শিল্পী বেগম। বুধবার (২২ এপ্রিল, ২০২৬) দুপুর ১২টার দিকে তারা কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে মুক্তি পান। মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে মানবিক বিবেচনায় ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত তার জামিন মঞ্জুর করেছেন।
প্রবীণ রাজনীতিবিদ ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। ঢাকা ও চট্টগ্রামে দায়ের করা ১২টি মামলায় জামিন পাওয়ার পর ১৪ আগস্ট, ২০২৫ বৃহস্পতিবার কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয় সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রীকে। চব্বিশের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২৭ অক্টোবর তাকে ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তার করে।
মোশাররফ হোসেন চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে প্রথম, তৃতীয়, সপ্তম, নবম, দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন। তিনি ১৯৯৭ থেকে ২০০১ পর্যন্ত বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, পরে দশম সংসদে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় পরিচালনা করেছেন। প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ শারীরিক নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত। উন্নত চিকিৎসার জন্য মোশাররফ হোসেনকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য আবেদন করেছেন তার পরিবারের সদস্যরা। ব্যক্তিগতভাবে আমিও মানবিক বাংলাদেশ দেখতে চাই। তাকে বিদেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হোক।
দুটি হত্যা মামলায় কারাবন্দি তৃণমূল বিএনপির চেয়ারপারসন শমসের মবিন চৌধুরী জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। সোমবার (২৪ মার্চ, ২০২৫) ঢাকা কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বের হন তিনি। চব্বিশের ১৭ অক্টোবর সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শমসের মুবিন চৌধুরী গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তার হওয়ার পরদিন তাকে পল্টন থানায় দায়ের করা যুবদল নেতা শামীম মোল্লা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর যাত্রাবাড়ী থানায় দায়ের করা পারভেজ মিয়া হত্যা মামলায়ও গ্রেপ্তার দেখানো হয় প্রবীণ এই রাজনীতিবিদকে।
অন্যদিকে, বীর মুক্তিযোদ্ধা, বিশিষ্ট সমাজ সেবক ও ঢাকা-১৫ আসন থেকে চার বারের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব কামাল আহমেদ মজুমদার, বৃদ্ধ বয়সে অসুস্থ শরীরে দিন কাটছে কারাগার নির্ধারিত হাসপাতালের বিছানায়। যে বয়সে কোরআন শরীফ পাঠ করা আর নাতি-নাতনির সাথে সময় কাটানোর কথা, যে বয়সে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে জেলখানায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তিনি। ক্ষমতায় থাকতেও অনিয়ম, ঘুষ, দুর্নীতির প্রতিবাদ করেছেন সংসদে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছেন। একাত্ম ছিলেন তরুণ প্রজন্মের দাবির আদায়ে। কিন্তু তাতে কি, ছাত্র আন্দোলনে দায়ের করা বেশ কিছু হত্যা মামলায় ২০২৪ বছরের ১৯ অক্টোবর কামাল আহমেদ মজুমদারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর থেকে মামলার জালে আটকে রাখা হয়েছে প্রবীণ এই রাজনীতিবিদকে। অন্যদের জামিন দেওয়া হলেও কামাল আহমেদ মজুমদারের মতো রাজনীতিবিদের বেলায় রাষ্ট্রের ন্যায্যতা দেখিনা। মহামান্য বিচারকদের কাছে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করি আমরা।
যে কথা বলছিলাম, কেবলমাত্র বাবার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সন্তান এখন কারাভোগ করছেন। মোহনা টেলিভিশনে কাজ করার সময় প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান সাবেক মন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদারের ছেলে মোহনা টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহেদ আহমেদ মজুমদারের সঙ্গে মেশার সুযোগ হয়েছে আমার। খুব কাছ থেকে দেখেছি তাকে। রাজনীতির সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেই। আগ্রহও দেখিনি। নিপাট ভদ্রলোক। সুর, তাল, লয়, আঁকাআঁকি নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন সবসময়। সবার সঙ্গে মানবিক আচরণ করা, সৃজনশীল এই মানুষটি এখন কারাগারে। কারণ আগেই বলেছি, বাবার রাজনৈতিক পরিচয়। বাবা রাজনীতি করতে বলে সন্তানকে জেল খাটতে হবে!
সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় জেল আছেন শাহেদ আহমেদ মজুমদার। তার বিরুদ্ধে মামলায় অভিযোগ করা হয়, ২০২৫ সালের গত ১২ সেপ্টেম্বর দুপুরে গুলশানের ফজলে রাব্বী পার্কের পাশে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ব্যানার নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক স্লোগান দেন। তারা গাড়ি ভাঙচুরের চেষ্টা করে জনমনে ভীতির সঞ্চার করেন। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা পালানোর চেষ্টা করেন। সেসময় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার ও তাদের মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়।
মামলা বলা হয়, জব্দ করা মোবাইল ফোনে ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অ্যাপের মাধ্যমে আসামিরা রাষ্ট্রকে ‘অস্থিতিশীল ও অবকাঠামোকে ধ্বংস করতে’ বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে বলে পুলিশ দেখতে পেয়েছে। ২০২৫ সালের গত ১৩ সেপ্টেম্বর গুলশান থানার এসআই মাহাবুব হোসাইন ওই মামলা করেন। এর প্রেক্ষিতে ২৭ সেপ্টেম্বর শাহেদ আহমেদ মজুমদারকে ঢাকার গুলশান এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
মামলা যে ষড়যন্ত্রমূলক তা বিবরণ পড়লে যে কেউ বুঝতে পারবেন। অন্যদিকে, শাহেদ আহমেদ মজুমদার, বাবা কামাল আহমেদ মজুমদারের ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রভাব নামে জ্ঞাত-আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ২ কোটি ৩৯ লাখ ৭৩ হাজার ৭৩৬ অর্জন করেছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনও আরেকটি মামলা করেছেন। দুদকও সঙ্গী হয়েছে তখনকার প্রভাবশালীদের। রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যাশা, অপরাধ করলে তার তদন্ত করা হোক। বিচার করা হোক। তবে অন্যায়ভাবে কাউকে মিথ্যে মামলায় হয়রানি করানো, জেল খাটানো, মানসিক নির্যাতন করা, সামাজিকভাবে হেয় করা, সন্তানকে বাবার আদর থেকে বঞ্চিত করা-এটা কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না।
আইনের ছাত্র হিসেবে, একজন সাংবাদিক হিসেবে মনে করি, শাহেদ আহমেদ মজুমদারকে আইনি প্রক্রিয়ায় জামিন দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাতে তার ছোট্ট সন্তান বাবার আদর পাবে। একজন স্ত্রী তার স্বামীকে পাশে পাবে। অন্যদিকে, মোহনা টেলিভিশনের শত শত কর্মী ফিরে পাবে প্রিয় অভিভাবক। প্রতিহিংসার রাজনীতি আর দেখতে চাই না। চাই না, কোনও নিরপরাধ ব্যক্তি অকারণে মিথ্যে মামলায় আর জেলে খাটুক। আর প্রশাসনকে যারা প্রভাব খাটিয়ে অপব্যবহার করছেন বা করেছেন; তাদের বিচারেও আওতায় নিয়ে আসা দরকার। না হলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, কেবল কথার কথাই থেকে যাবে। বাংলাদেশ হোক সবার প্রত্যাশিত ন্যায় ও সাম্যের বাংলাদেশ।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক।
১৩৪ বার পড়া হয়েছে